প্রিয়া সাহার নেপথ্যেও লোকদের খুঁজতে হবে

  • ২০-Jul-২০১৯ ১০:১৬ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

শান্তি সহ্য হলো না! কারা তারা? বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের প্রশংসায় যখন বিশ্ব পঞ্চমুখ, ঠিক সেই মুহূর্তে কারা তৈরি করল এই প্রিয়া সাহাকে! বাংলাদেশের সাধারণ একজন নারী বিশ্বের সব থেকে প্রভাবশালী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত পৌঁছা সাধারণ কথা নয়। উদ্ভট শুকনো রাজনীতির একটা গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে সম্পূর্ণ ঘটনাজুড়ে। কী সেই লোভ, কতটুকু তার পরিধি যা হাসিলের জন্য দেশের গায়ে মিথ্যের কালিমা লেপনে সামান্যও বুক কাঁপেনি এই নারীর? ভাবিয়ে তোলে আমাদের। 

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট রানা দাস গুপ্ত অসুস্থ থাকায় গত মঙ্গলবার রাতে সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহা সংগঠনের প্রতিনিধি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন বলে শোনা যায়। এরপর গত বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াইট হাউজে দেখা করেন তিনি। যেখানে ১৬টি দেশের ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার ২৭ ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সেখানে ট্রাম্পকে প্রিয়া সাহা বলেন, ‘আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি।

এখানে প্রায় ৩৭ মিলিয়ন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নিখোঁজ হয়ে গেছে।’ ট্রাম্পের কাছে সাহায্য চেয়ে প্রিয়া বলেন, ‘এখনো সেখানে ১৮ মিলিয়ন সংখ্যালঘু মানুষ রয়েছে। আমার অনুরোধ, দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা আমাদের দেশ ছাড়তে চাই না।’ এতসব মিথ্যাচারের পর ওই নারীকে নিজের আখের গোছানোর দিকে মনোযোগী হতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘আমি আমার বাড়ি হারিয়েছি। তারা আমার বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। তারা আমার জমি কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু কোনো বিচার হয়নি।’ এ সময় ট্রাম্প জানতে চান, ‘কারা জমি দখল করেছে? কারা বাড়ি দখল করেছে?’ জবাবে ওই নারী বলেন, ‘মুসলিম মৌলবাদী গ্রুপ এগুলো করছে। তারা সব সময় রাজনৈতিক ছত্রছায়া পায়।’ এতসব কথার মাঝে প্রশ্ন থেকেই যায়, দেশে যদি এমন সমস্যা থেকেই থাকে, তবে সংখ্যালঘুদের একটি সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েও তিনি তার বিচার দেশের মাটিতে না চেয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে তুলে ধরতে গেলেন কেন? এই অভিযোগ তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে খুব সহজেই করতে পারতেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ পাওয়া থেকে বাংলাদেশি হয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পাওয়াটা নিশ্চয় কঠিন কিছু নয়। দেশের উচ্চপদস্থ লোকদের সঙ্গে প্রিয়া সাহার ছবি আছে। অন্তত তাদের সহযোগিতায়ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে খুব সহজে যাওয়া যেত বলে আমাদের বিশ্বাস।

অভিযোগ সত্য হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিশ্চয় ব্যবস্থা নিতেন। কারণ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার সংখ্যালঘুদের কোমল দৃষ্টিতে দেখে আসছেন। সরকারি চাকরিতে কোটাসহ এদেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি সহানুভূতি রয়েছেই। ধর্মীয় রীতিনীতি পালনে সরকার সব সময় আমলে নিয়ে অতিরিক্ত সুরক্ষা প্রদান করে থাকেন। প্রিয়া সাহার স্বামী মালয় সাহাও বাংলাদেশে সরকারি সর্বোচ্চ একটি প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রশ্নে তার মেধা নিশ্চয় অবমূল্যায়িত হতো। গুম-খুন প্রায় সব দেশেই ঘটে থাকে, কিন্তু এদেশে ধর্মীয় প্রতিহিংসায় গুম-খুনের ঘটনা দেখা যায় না। আর জমি ও বাড়ি দখলের ঘটনা মুসলমানদের ক্ষেত্রেও ঘটছে। এর অর্থ এই  প্রিয়া সাহা দেশের বিরুদ্ধে একজন আন্তর্জাতিক মিথ্যুক ও ষড়যন্ত্রকারী। 

উদ্ভট মস্তিষ্কের রাষ্ট্রদ্রোহীর বিষয়ে জানতে গিয়ে উঠে আসে ইতিহাস। বর্তমানে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক পদে থাকা এই নারী ‘শারি’ নামে একটি এনজিওর নির্বাহী পরিচালক। সে একবছর আগেও মহিলা ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ছিল। কিন্তু বিভ্রান্তিমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে ওই পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিদেশি থেকে ফান্ড সংগ্রহ করার জন্য বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার নাটকের ঘটনাও রয়েছে তার ঝুলিতে। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আছে বলে সুবিধা আদায়ও করেছেন বলে অনেকে জানিয়েছেন। মৃত নগেন্দ্র নাথ বিশ্বাসের মেয়ে প্রিয়া সাহার দাদাবাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার চরবানিয়ারী গ্রামে। শ্বশুরবাড়ি বৃহত্তর যশোরে। তার দুই মেয়ে প্রজ্ঞা পারমিতা সাহা ও ঐশ্বর্য লক্ষ্মী সাহা যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশুনা করেন। এছাড়া প্রিয়া সাহা ‘দলিত কণ্ঠ’ নামের একটি পত্রিকার প্রকাশক-সম্পাদকও।

সব মিলিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে প্রিয়া সাহার বক্তব্য একটি সংঘবদ্ধচক্রের কাজ বলেই অনুমিত হচ্ছে। এই বক্তব্য শুধু দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœই করেনি, নিচু করেছে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশকে। লালসবুজের এই ভূমিতে সম্প্রীতিকে ভাঙতে চেষ্টাকারী চক্রকে খুঁজে বের করতে কালক্ষেপণ কোনভাবেই কাম্য নয়। যদিও তার দেওয়া বক্তব্য ছড়িয়ে পরার পরপরই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ‘তিনি (প্রিয়া সাহা) কেন এটা করলেন তা খতিয়ে দেখা হবে। তার অভিযোগগুলোও সরকার শুনবে এবং খতিয়ে দেখবে।’ গতকাল শনিবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের উদ্দেশ্যেই প্রিয়া সাহা এই ধরনের বানোয়াট ও কল্পিত অভিযোগ করেছেন।’ আর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘দেশবিরোধী বক্তব্যের জন্য তার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।’ তবে এক প্রিয়া সাহার বিষয়ে সরকারকে আরও সতর্ক থাকতে হবে। এক প্রিয়া সাহাকে নিয়ে ভাবলে চলবে না, প্রিয়া সাহা চরিত্রের নেপথ্যের ছায়াশক্তিকেও খুঁজতে হবে। 

Ads
Ads