ব্যাক ফর গুড: বাংলাদেশি শ্রমিকরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় 

  • ১৯-Jul-২০১৯ ১১:৫৪ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

‘ব্যাক ফর গুড’। অবৈধ অভিবাসীদের ফেরাতে মালয়েশিয়া সরকারের পাঁচ মাসব্যাপী এই কর্মসূচি নিয়ে পজেটিভ নেগেটিভ অনেক কথা বলা যেতে পারে। তবে সেদেশে অবৈধতার সিল নিয়ে বসবাসরত বাংলাদেশিরা মাত্র ১৪ হাজার ৩৬২ টাকায় দেশে ফিরতে পারবেন, স্বজনের সংস্পর্শে আসতে পারবেন মোটাদাগে এটাকে ‘ভালোর জন্য ফেরা’ বলতেই পারি। বহু বছর ধরে সেদেশে বৈধভাবে গিয়ে ভিসার মেয়াদ বাড়াতে না পেরে, কিংবা দালালের খপ্পরে পড়ে গিয়ে অবৈধভাবে বসবাস করতে গিয়ে যে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন বাংলাদেশিরা, তা একটি মানবিক ইতিহাস। তবে দেশে ফেরার পর এসব বাংলাদেশির ভবিষ্যৎ কী কথা বলবে, কী হবে তাদের পথচলা সেটা ভাবনার বিষয় বৈকি!

মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অবৈধ বাংলাদেশিদের কোনো ধরনের হয়রানি ও জেল জরিমানা ছাড়া নিজ দেশে ফেরাতে দেশটির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে হাইকমিশন আলোচনা চালিয়ে আসছিল। সেই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশে মালয়েশিয়া সরকার ‘ব্যাক ফর গুড’ কর্মসূচি নিয়েছে বলে জানা যায়। ‘ব্যাক ফর গুড’র আওতায় আগস্টের প্রথম দিন থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীরা মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশনে পাসপোর্ট বা ট্রাভেল ডকুমেন্ট এবং প্লেন টিকিটসহ আবেদন করতে পারবেন। আবেদনপত্রের সঙ্গে মালয়েশিয়া সরকারকে ফি হিসেবে ৭০০ রিংগিত (১৪ হাজার ৩০০ টাকা) জমা দেওয়ার এক দিনের মধ্যেই মালয়েশিয়া সরকার অনুমতিপত্র দেবে। সেই অনুমতিপত্র পাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই  দেশে ফিরবেন অবৈধ বাংলাদেশিরা।

আগে মালয়েশিয়া সরকারকে তিন হাজার ১০০ রিংগিত দিতে হতো এবং অনুমতিপত্র পেতে সময় লাগতো দুই সপ্তাহ। স্বজনের সংস্পর্শে ফিরে আসার আগাম দৃশ্য আমাদের মনকে আন্দোলিত করে তোলে। কিন্তু ভাবিয়ে তোলে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। দালালের খপ্পরে পড়ে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে যারা সেদেশে গিয়েছে, তাদেরকে আমরা উৎসাহিত করতে পারি না। কিন্তু যারা বৈধভাবে গিয়েও ভিসার মেয়াদ বাড়াতে না পেরে অবৈধতার তালিকায় পড়ে গেল, তাদের কী হবে? কোম্পানির সাথে তাদের দেনা পাওনা থাকাটাই স্বাভাবিক। এমন এক পরিস্থিতিতে ব্যাক ফর গুড কর্মসূচির আওতায় বলা হয়েছে, নিজ দেশে ফেরার আগে অবৈধ অভিবাসীদের সঙ্গে কোনো কোম্পানির দেনা-পাওনা থাকলে তা মীমাংসার দায়িত্ব নেবে না মালয়েশিয়া সরকার। কর্মীদের তাদের নিজ উদ্যোগেই কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করে দেনা-পাওনা মেটাতে হবে। এতে কোম্পানিগুলো সুযোগ পেয়ে গেল, আর কোম্পানির কাছে পাওনা থাকলে তা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা শ্রমিকের জন্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। 

২০১৪ সালে ‘থ্রি প্লাস ওয়ান’ কর্মসূচির আওতায় গত বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত মালয়েশিয়া থেকে ৮ লাখ ৪০ হাজার অবৈধ অভিবাসী নিজ দেশে ফিরেছেন। এর আওতায় হাজার হাজার বাংলাদেশি দেশে ফিরে বেকার হয়ে পড়েন। ভেবে দেখার বিষয় হলো, কেন এমনটা ঘটছে? সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে ২০১৮-র সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায় নতুন কর্মী নিয়োগ বন্ধ হয়ে গেলে লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হারায় আমরা। সেসময় সরকারি খরচের অতিরিক্ত ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের কর্মী পাঠানোর ব্যাপারে অন্তর্র্বর্তীকালীন প্রক্রিয়া চালু করতে দুই দেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) একাধিকবার বৈঠক করলেও শ্রমবাজার চালুর আলো ফোটেনি। বাজার চালু করতে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ১৪ মে কুয়ালালামপুরে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক করেন। কিন্তু তাতেও খুব ভালো কোনো ফলাফল আসেনি।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নতুন করে কোনো বাংলাদেশি কর্মীকে ভিসা দেয়নি মালয়েশিয়া। তবে এর আগে ভিসা পাওয়া কর্মীরা সেপ্টেম্বরের পরও মালয়েশিয়া গেছেন। সব মিলিয়ে ২০১৮ সালে মালয়েশিয়ায় গেছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার ৯২৭ জন। ২০১৭ সালের প্রথম তিন মাসে কর্মী গেছেন ৩৮ হাজার ৮৬৫ জন। এ বছরের প্রথম তিন মাসে গেছেন মাত্র ৫৫ জন। অথচ গত বছর প্রতি মাসে গড়ে কর্মী গেছেন প্রায় ১৫ হাজার। এ হিসাবে বাজার চালু থাকলে গত ৮ মাসে নতুন করে এক লাখের বেশি কর্মী চাকরি পেতেন বলে মনে করেন শ্রমবাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৭-০৮ সালে চার লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন। দশ বছরের বেশি ভিসা দেওয়া হবে না এমন সিদ্ধান্তের পর এদের অনেকেই সেদেশে এখন অবৈধ। এদিকে মালেয়িশায় বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ায় ২০০৯ সালে সেদেশে বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজারটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০১২ সালের নভেম্বরে দুই দেশের মধ্যে জিটুজি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় বেসরকারি জনশক্তি রফতানিকারকদের যুক্ত করে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিটুজি প্লাস চুক্তি হয়।

এই দায় বাংলাদেশের শুধু একার না, অবৈধতার প্রশ্নে দায় সেদেশেরও। এক্ষেত্রে অভিবাসন নিয়ে কাজ করা সংগঠন রামরুর একজন পরিচালক মেরিনা সুলতানা যে মন্তব্য করেছিলেন তা যথার্থই। তিনি বলেছেন, ‘বরং দুই তরফে থাকা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই শ্রম বাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’ কিন্তু দায় এড়িয়ে গিয়ে মালয়েশিয়া সরকার কম টাকায় দেশে ফেরার সুযোগ করে দিয়েছেন, আপাতদৃষ্টিতে এটাকে ভালোই বলা যেতে পারে। তবে বাংলাদেশি শ্রমিকরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে এখনই যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

Ads
Ads