গ্লোবাল টিভি’র সিইও হিসেবে যোগ দিলেন নওয়াজীশ আলী

  • ১৮-Jul-২০১৯ ০৩:৩১ অপরাহ্ন
Ads

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল গ্লোবাল টিভি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে যোগ দিয়েছেন খ্যাতিমান গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব নওয়াজীশ আলী খান। নতুন এ চ্যানেলটি শিগগিরই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর অধীনে সম্প্রচারে আসছে। এর কার্যক্রম পরিচালনায় রয়েছে গ্লোব মাল্টিমিডিয়া লিমিটেড।

নওয়াজীশ আলী খানের জন্ম ১৯৪২ সালের ২ অক্টোবর বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার লোহালিয়া গ্রামে। তিনি কর্মজীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ব্যয় করেছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে সৃজনশীল কর্মের মধ্য দিয়ে। ১৯৭২ সালের ৪ অক্টোবর তিনি যোগ দেন টেলিভিশনটিতে। সেখানে ২৮ বছর কাটিয়ে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে অবসরে যান। এরপর যোগ দেন স্বনামধন্য একুশে টেলিভিশনে হেড অব প্রোগ্রাম হিসেবে। ২০০২ সালে একুশে টিভি বন্ধ হয়ে গেলে এটিএন বাংলায় প্রোগ্রামের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শৈল্পিক ও প্রতিভাবান এই মানুষটি কর্মজীবন শুরু করেন পাকিস্তান টেলিভিশনের জমানায়, সেই ১৯৬৭ সালে করাচিতে পাকিস্তান টেলিভিশন কর্পোরেশনে। মুক্তিযুদ্ধের পর পরই ১৯৭২ সালে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আফগানিস্তান ও ভারত হয়ে নওয়াজীশ আলী খান বাংলাদেশ আসেন এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে যোগদান করেন।

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে নওয়াজীশ আলী খান টেলিভিশনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-সিক্ত বাঙালির মনন তৈরিতে ভূমিকা পালন করে চলেছেন তিনি। প্রযোজনা করেছেন ‘জননী’, ‘গাছ মানুষ’, ‘কবি’র মত টেলিফিল্ম। তার প্রযোজনায় নির্মিত ‘বহুব্রীহি’, ও ‘অয়োময়’-এর কথা তো না বললেই নয়। তিনিই প্রয়াত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদকে লেখালেখির পাশাপাশি নাটক ও সিনেমা বানাতে উৎসাহিত করেন।

‘তুই রাজাকার’- আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের জনপ্রিয় এ শব্দটি তাঁর নির্মিত বহুব্রীহি নাটকের টিয়া পাখির মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন মানুষের মুখে মুখে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মানুষ নওয়াজীশ আলী খান এখনো বাংলাদেশের তথা বাঙালি সংস্কৃতির অগ্রগতিতে অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছেন।

মেধাবী এ টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব বিটিভি পর্বে অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বা আন্তঃদেশীয় টেলিভিশন তৎপরতায় অংশ নিয়েছেন, কখনও নেতৃত্ব দিয়েছেন। যোগ দিয়েছেন একাধিক আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সম্মেলনে। বিটিভি’র ‘স্বায়ত্ব শাসন’ অর্জনে তার ছিল বিশেষ ইতিবাচক ভূমিকা।

নওয়াজীশ আলীর হাত ধরেই আশি-নব্বইয়ের দশকে বিটিভি হলিউডের সিনেমা নিয়ে আসে। শুধু তাই নয়, নব্বইয়ের দশকে সিনবাদ, হারকিউলিস, এক্স ফাইলস, টিপু সুলতান, আকবর দ্য গ্রেট কিংবা আলিফ লায়লার মত সিরিজ বাংলা ডাবিং নিয়ে আসেন তিনি।

মেধাবী, সৃষ্টিশীল ও জননন্দিত নির্মাতা হিসেবে নওয়াজীশ আলী খান সুপরিচিত। তাঁর আরেক বিখ্যাত কাজ ‘বর্ণালী’। এই গানের অনুষ্ঠানের জন্য তিনি ১৯৭৬ সালে সেরা প্রযোজকের পুরস্কার পান। ‘জলশা’নামক জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠানে তিনি প্রথম জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলোকে নিয়ে আসেন। ঈদের বিশেষ ‘আনন্দমেলা’ অনুষ্ঠানে উপস্থাপনার সুযোগ করে দেন আনিসুল হক, আবেদ খান, ড. সানজিদা আক্তার, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও জুয়েল আইচদের মতো ব্যক্তিত্বদের।

তিনিই প্রথমবারের মত সাফ গেমস বিটিভিতে দেখার ব্যবস্থা করে দেন, যার মূল পরিকল্পনায় ছিলেন মুস্তফা মনোয়ার।

দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বেশ কিছু প্রিয় মুখ পরিচিতি পেয়েছেন তার অনুষ্ঠান ও নাটকের মাধ্যমে। নাট্যকার হিসেবে নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদকে আবিষ্কার করেন নওয়াজীশ আলী খান। এক সাথে বেশ কিছু কাজও করেছেন। এর মধ্যে আছে হুমায়ূন আহমেদের প্রথম নাটক ‘প্রথম প্রহর’।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের উপস্থাপনায় বিটিভির ‘সপ্তপর্ণা’ কিংবা ফজলে লোহানীর ‘যদি কিছু মনে না করেন’– এর প্রযোজনায় নওয়াজীশ আলী খান ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন এবং আইডিয়াও শেয়ার করেছেন। এর সুবাদে ১৯৭৫ সালে সেরা প্রযোজকের জাতীয় পুরস্কার পান তিনি।

দেশের বাইরেও তিনি সম্মানিত হয়েছেন। তার ‘জননী’জাতিসংঘের মেরিট সার্টিফিকেট পায়। কোরিয়ান ব্রডকাস্টিং নেটওয়ার্ক ‘বর্ণালী’ অনুষ্ঠানের ‘কাজের গান’ এপিসোডকে মেরিট সার্টিফিকেট দিয়ে সম্মানিত করে। বিটিভিতে তার নির্মিত ‘সালামত দাতাং’ নাটকে তিনি অভিনয়ে নিয়ে আসেন প্রয়াত মেয়র আনিসুল হককে।

নওয়াজীশ আলী খান প্রেক্ষাপট পুরস্কার (১৯৮৮), বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সোসাইটি পুরস্কার (১৯৯৫), শের-ই-বাংলা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯২), ঢাকা ইয়ুথ ফাউন্ডেশন পুরস্কার (১৯৯৫), কালধ্বনি স্বাধীনতা স্বর্ণপদক (১৯৯৫), নিপা স্বর্ণপদক (২০০০), ন্যাশনাল পার্সোনালিটি পুরস্কার (১৯৯৫), টেনাসিনাস পুরস্কার (১৯৯৬), টিডিএফ আজীবন সম্মাননা পুরস্কার (২০০৪), এ-ওয়ান টেলিমিডিয়া অ্যান্ড সিল্ক লাইন ইন্ডিপেন্ডেন্স পুরস্কার (২০০৫), একটেল নাট্যসভা পুরস্কার, বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ স্মৃতি পুরস্কার (২০০৫), মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত স্মৃতি পুরস্কার (২০০৮) ও বিজয় বার্তা সম্মাননা পুরস্কার (২০১৭), ধরিএী বাংলাদেশ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ এর জাতীয় সম্নাননা পুরস্কার, শেরে বাংলা পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৭ সালে ‘টেলিভিশন কর্মজীবনের গৌরবময় ৫০ বছর’ পূর্তি উপলক্ষ্যে এটিএন বাংলার পক্ষ থেকে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

নওয়াজীশ আলী খানের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের ওপর ‘টেলিভিশনে অর্ধশতাব্দী’নামের একটি সংকলন গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। এতে ১৯৬৭ সাল থেকে অদ্যবধি নিরবচ্ছিন্ন টেলিভিশন কর্মজীবনে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে নিবন্ধ লিখেছেন অভিনেতা, সঙ্গীতশিল্পী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদসহ সুধিসমাজের শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি।

নওয়াজীশ আলী খান স্কুল জীবন থেকে সঙ্গীত, আবৃত্তি, সাহিত্য, রচনা, বিতর্ক, নাট্যাভিনয়ের সাথে জড়িত ছিলেন।

গ্লোবাল টিভি বাংলাদেশকে নতুন মাত্রা যোগ করবেন জানিয়ে নওয়াজীশ আলী খান বলেন, টেলিভিশন বর্তমান বিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয় গণমাধ্যম। আশা করি তথ্যগত ও তত্ত্বগত আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর সম্প্রচার এবং নতুন ধারার অনুষ্ঠান ও সংবাদ নিয়ে দর্শকদের কাছে জায়গা করে নেবে গ্লোবাল টিভি। এজন্য সবার সহযোগিতা এবং দোয়া কামনা করছি।

Ads
Ads