জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আমরা দৃষ্টান্ত 

  • ১১-Jul-২০১৯ ০৯:৫৯ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বর্ষাভেজা কদম ফুল এখন শুকনো গ্রীষ্মে কিংবা শরতের শুরুতেও ফুটতে দেখা যায়। শেফালিরা বিদায় নিতে শুরু করেছে যেন। প্রাণবৈচিত্র্যেও পড়েছে কার যেন প্রভাব। প্রচ- তাপদাহ, অস্বাভাবিক শৈত্যপ্রবাহ ভাবিয়ে তুলেছে জনমন। এতসব ভেবেও কি আমরা ঠিকমতো চলছি? কালো ধোঁয়া তৈরি করছি, পাহাড়-গাছ কেটে পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছি। দেড় ডিগ্রির মধ্যে রাখার কথা থাকলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এর কয়েকগুণ হারে বেড়েই চলছে। কার্বন নিঃসরণ কমাতে বিজ্ঞানীদের দেওয়া তাগিদের পরও কে শোনে কার কথা! ফলে সাগর-মহাসাগর উত্তপ্ত হচ্ছে, লোনাজল উপকূলে ঢুকে পড়ছে। জলবায়ু প্রতিশোধ নিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে এমন এক পরিস্থিতিতে প্রায় তিন দশক আগে ১৯৯২ সালে জাতিসংঘ ‘জলবায়ু সনদ’ ঘোষণা করলেও কে কে মানছে তা? আন্তঃদেশীয় পরিস্থিতির এমন এক সময়ে পরিবেশের প্রতি অত্যাচারে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ঘনঘন আঘাত হানছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা দেশে। জলবায়ুর অভিঘাতে জাতীয় আয়ের দু-তিন শতাংশ ফি বছর তলিয়ে যাচ্ছে।

জলবায়ু উদ্বাস্তুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। এরই মাঝে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার জলবায়ুর সংকট মোকাবিলায় যে যুদ্ধ করেছে তা প্রশংসার দাবিদার। আর সেই প্রশংসা করেছেন খোদ বান কি মুন। গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশনের (জিসিএ) চেয়ারম্যান ও জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন গত বুধবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ‘সেরা শিক্ষক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবরে নেদারল্যান্ডসে জিসিএর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও তিনি বাংলাদেশকে রোল মডেল হিসেবে আখ্যা দেন। জলবায়ু অভিযোজনবিষয়ক ঢাকা সম্মেলনে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য বাংলাদেশে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন কেন্দ্র স্থাপনেরও প্রস্তাব দিয়েছেন জিসিএর এই চেয়ারম্যান। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি পরিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে’ বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের বিস্তৃতি এবং এর প্রভাব প্রশমনে নিজেদের সক্রিয় উদ্যোগ সম্পর্কে আরও সচেতন হতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমান বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-উদ্ভাবন ও অর্থায়নের যুগে জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় আমাদের অনেক সুযোগ রয়েছে, যা সবাই সহজে কাজে লাগাতে পারি। তথাপি আমি বলতে চাই, অভিযোজনের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেজন্য সুষ্ঠু প্রশমনব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অভিযোজন প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। 

এসডিজির ১৭টি অভীষ্টের ১৩ নম্বর লক্ষ্য হলো জলবায়ু। পরিবেশ ও আবহাওয়াবিদদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি দেড় ডিগ্রির মধ্যে রাখতে হবে। কিন্তু কমা তো দূরের কথা, দিনদিন বেড়েই চলেছে উষ্ণতা। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ (এসডিজি) অর্জনে সামনে রয়েছে মাত্র এগারো বছর। প্রশ্ন হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন কেমন হবে? কীভাবে স্বাভাবিক উন্নয়ন থেকে এটি ভিন্ন? জাতিসংঘ কিয়োটো প্রটোকলের যুগ্ম-বাস্তবায়ন সুপারভাইজরি কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান ও পরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে অভিযোজন এখনো সঠিকভাবে পরিমাপ করা কঠিন। অভিযোজন বিজ্ঞান এ পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অভিযোজনের তিনটি পর্যায় চিহ্নিত করেছে। প্রথম পর্যায়টি হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রতিকূল প্রভাবগুলো মূল্যায়ন করা এবং যাচাই করা। কিন্তু এমনটা আমরা করি না বলেই প্রভাবগুলো আরও ঝুঁকির সম্মুখীন করে তুলছে। আমাদের নিজেদের আরও ঝুঁকির সম্মুখীন করার প্রয়াস বন্ধ করতে হবে। ‘অভিযোজনের দ্বিতীয় পর্যায়ে আমরা এখন রয়েছি এবং রূপান্তরমূলক অভিযোজন নামক তৃতীয় পর্যায়টি এখনো কিছুটা তাত্ত্বিক পর্যায়ে রয়েছে।’

স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সাইক্লোন সেন্টার স্থাপন করেছিলেন। বহুমুখী সাইক্লোন সেন্টারগুলোতে শুধু মানুষ নয়, পশুপাখিদেরও নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা ছিল। এরপর আবারও তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০১৫ সালে বাংলাদেশও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার পথ-নকশা তৈরি হয়। খুব দ্রুততার সঙ্গে অভিযোজনের দ্বিতীয় পর্যায়ে আমাদের অবস্থান। এ পর্যায়ে সেতু, ফ্লাইওভার, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামগত উন্নয়নের কাজ চলছে বলেই আমরা মনে করি। ইতোমধ্যে উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোতে লবণাক্ততা বাড়ায় ধান চাষের সমস্যা সমাধানে কৃষি গবেষকরা লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে এমন ধানের বীজ উদ্ভাবন করেছেন। অনেক কৃষক ধানের বদলে চিংড়ি অথবা সামুদ্রিক মাছ চাষ করছেন। খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই কৃষি উন্নয়ন নিশ্চিত করে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য একনিষ্ঠভাবে কাজ করে চলেছে বর্তমান সরকার। যদিও সত্যিকারের রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জনের জন্য একদশক বা তারও বেশি সময় লাগবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাই খাত পর্যায়ে আটকে না থেকে জাতীয় পর্যায়ে রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জনের চিন্তা-ভাবনা ও পরিকল্পনা করতে হবে। 

২০০৮ সালে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (বিসিসিএসএপি) গ্রহণ করা হয়। ২০০৯ সালে তা সংশোধিত হয়। বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম দেশ যে এটি করেছে। ২০৩০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনসহিষ্ণু দেশ হয়ে উঠতে আমরা সক্ষম হব বলে আস্থা রাখি। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় এভাবেই বিশ্বের দরবারে আমরা রোল মডেল হয়ে থাকব। তবে আন্তঃদেশগুলোকেও সচেতনতার সঙ্গে সমন্বিত প্রচষ্টায় সচেষ্ট থাকতে হবে।

Ads
Ads