এমপি পুত্রের টাকায় কেনা গৌরীপুর ছাত্রলীগের বিতর্কিত কমিটি বাতিল হচ্ছে

  • ১১-Jul-২০১৯ ০৯:২৭ অপরাহ্ন
Ads

:: উৎপল দাস ::

ময়মনসিংহ-৩ আসনের এমপি নাজিম উদ্দিন আহমেদের পুত্র তানজির আহমেদ রাজিবের টাকায় কেনা গৌরীপুর উপজেলা ও পৌর ছাত্রলীগের কমিটি বাতিল করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের নেতা এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি  রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। কয়েক মাস আগে থেকেই কোনো উপজেলা ও পৌর ইউনিটের কমিটি ঘোষণা করার আগে লিখিতভাবে কেন্দ্রের দুই শীর্ষ নেতার পরামর্শ নেয়ার নির্দেশনা থাকলেও ময়মনসিংহ জেলা কমিটির মেয়াদোর্ত্তীণ ও বিবাহিত সভাপতি রকিবুল ইসলাম রকিব এবং সাধারণ সম্পাদক বিবাহিত সাধারণ সম্পাদক সরকার মো. সব্যসাচী গৌরীপুর  উপজেলা ও পৌর ইউনিটের কমিটি ঘোষণা করে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী  ছাত্রলীগ করার সব ধরণের যোগ্যতা হারানো, অবৈধ কমিটি নিয়ে নিজেরা যখন দায়িত্ব ছেড়ে চলে যেতে পারলেই বাঁচেন সেই অবস্থার মধ্যেই নিজেদের আখের গোছাতে গৌরীপুর উপজেলা ও পৌর ছাত্রলীগের কমিটিতে  বিতর্কিত ৪ জনকে নেতা বানিয়েছেন গত ৯ জুলাই। নিজেদের স্বাক্ষর করার কোনো ধরণের বৈধতা না থাকার পরও রকিবুল ইসলাম রকিব এবং সরকার মো. সব্যসাচী কিভাবে এই কমিটি অনুমোদন করেছেন তা নিয়ে উল্টো চাপের মুখে রয়েছেন তারা। 

অবৈধ জেলা কমিটির স্বাক্ষরে গৌরীপুর উপজেলা ও পৌর কমিটির কোনো বৈধতা নেই বলে নিশ্চিত করেছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। তিনি বলেছেন, কেন্দ্রকে না জানিয়ে কমিটি ঘোষণার কোনো এখতিয়ার নেই জেলা কমিটির। আর ময়মনসিংহ জেলা কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে বহু আগেই। এছাড়া দুইজন শীর্ষ  নেতাই বিবাহিত এবং অবৈধ। তারা কিভাবে এমন কাজ করলো সেটাই এখন তদন্ত করা হচ্ছে।  কোনো ধরণের আর্থিক লেনদেন অথবা বিতর্কিতদের ঠাঁই দিয়ে কেন কমিটি করা হলো সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হতে মাত্র ২ দিন লাগবে। এরপর এই  উপজেলা ও পৌরসভা কমিটি নয়, জেলা কমিটির নতুন সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হবে বলে জানান ছাত্রলীগের মানবিক নেতা হিসাবে ইতিমধ্যেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা গোলাম রাব্বানী। তিনি আরো বলেন, শেখ হাসিনার ছাত্রলীগে কোনো বিতর্কিত কেউ থাকতে পারবে না। এর আগেও ঝিনাইদাহের কালীগঞ্জ উপজেলা কমিটি ঘোষণার পর তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়ার পর সেটি বাতিল করা হয়েছে। গৌরীপুরের অভিযোগগুলো মাত্র শুনেছি। তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়া স্বাপেক্ষে অবশ্যই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

ভোরের পাতার পক্ষ থেকে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ দুই নেতার মধ্যে একজনকে ভুল বুঝিয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি তনাজিবুল শিমুল বিতর্কিত এই কমিটি দু’টির অনুমোদন করিয়েছেন অবৈধ জেলা কমিটির দুই বিবাহিত নেতাকে দিয়ে। এক্ষেত্রে বৃহত্তর ময়মনসিংহ রাজনীতির ত্যাগী নেতা এমপি নাজিম উদ্দিনের ছোট ছেলে যার বিরুদ্ধে মাদকাসক্তির অভিযোগ রয়েছে তার মাধ্যমে কয়েক লাখ টাকার লেনদেনও করিয়েছে। মঙ্গলবার রাতে (৯ জুলাই) জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রকিবুল ইসলাম রকিব ও সাধারণ সম্পাদক সরকার সব্যসাচী জেলা ছাত্রলীগের প্যাডে স্বাক্ষরিত গৌরীপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসাবে মুক্তাদির শাহীন ও সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ সুলতান এবং পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি হলেন আল হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেনকে অনুমোদন দেন। 

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এমপি পুত্রের টাকার ভাগ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রকিব এবং সাধারণ সম্পাদক সব্যসাচী ছাড়াও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের স-সভাপতি তানজিবুল হক শিমুল মিলে খেয়েছেন। কিন্তু ভাগের টাকা ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতা পাননি। কেননা শেখ হাসিনার মনোনীত ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতা কমিটি বিক্রি করে টাকা আয় করেন না। 

এমনকি,  আল মুক্তাদির শাহিন উপজেলা ছাত্রলীগের বিতর্কিত কমিটির সভাপতি হয়েছেন। তার  জন্ম তারিখ ০১/০৮/১৯৮৯। সে হিসাবে ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বয়স নেই সভাপতি নয়, কোনো সদস্য হওয়ারও। এছাড়া সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ সুলতান জনি বিবাহিত। আপন মামাতো বোনকে বিয়ে করেছেন বলে জানা গেছে। ছাত্রলীগে বিবাহিত কেউ থাকার নিয়ম নেই। 

পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি হয়েছেন আল হোসাইন কালাচান হত্যা মামলার আসামি এবং তার পরিবারের সবাই বিএনপি-জামাতের রাজনীতির সাথে জড়িত বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন পৌর সভার ভোটারও নন। তার বাড়ি  পৌরসভার বাইরে অবস্থিত। তবে তিনি এমপি পুত্র রাজিবকে নিয়মিত মাদক সরবরাহ করেন বলে জানা গেছে।

এদিকে, ছাত্রলীগের এমন বিতর্কিত কমিটি হওয়ায় পুরো গৌরীপুরের আদর্শিক আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতারা বিক্ষুদ্ধ। শুধু এমপি পুত্র রাজিবের ইচ্ছেতেই তার কাছ থেকে টাকা খেয়ে এমন কমিটি দিয়েছে। এ কমিটি বাতিল করে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাসহ ছাত্রলীগের সভাপতি শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর কাছে। 

এদিকে, ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত  আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত দুইজন নেতাই ভোরের পাতার এ প্রতিবেদককে  বিভিন্ন সময় বলেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও ছাত্রলীগের সর্বোচ্চ অভিভাবক শেখ হাসিনা আমাদের একটি পবিত্র দায়িত্ব দিয়েছেন। দুই একটি ভুল ত্রুটি থাকতেই পারে। কিন্তু ৪ জনের মধ্যে ৪ জনই যখন বিতর্কিত তখন এ কমিটি  বহাল রাখার কোনো সুযোগ নেই। জেলা, উপজেলা, পৌরসভা কেন; ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায়েও যেন কোনো বিতর্কিত মামলার আসামি, বিবাহিত, বয়সোর্ত্তীণ এবং মাদক ব্যবসায়ী নেতা না হতে পারে সেদিকে আরো বেশি সজাগ দৃষ্টি রাখার নির্দেশ শোভন রাব্বানীকে দেয়া হবে। 

এসব অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের অবৈধ  এবং বিবাহিত সভাপতি রকিবুল ইসলাম রকিবকে গত ২ দিন ধরে বিভিন্ন সময় ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। এমনকি তার ফেসবুকে ওয়ালে বিতর্কিত এই কমিটির বিতর্কিতদের বিষয়ে জানতে চেয়ে কমেন্ট করা হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। 

ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সরকার মো. সব্যসাচীকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, এমপি নিজাম উদ্দিনের ছেলের রাজীব ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে কমিটি করার আগে। আর এমপি মহোদয় সম্মানিত ব্যাক্তি। তার প্রতি সম্মান জানিয়ে এই দুটি কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এখন যে চার জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে, তা তদন্ত করা হচ্ছে। প্রমাণ পাওয়া সাপেক্ষ অবশ্যই কমিটি বিলুপ্ত করা হবে। সেটা খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যেই করা হবে। আর নিজের বিয়ের বিষয়ে সব্যসাচী বুক ফুলিয়ে বলেন, নেতা হওয়ার সময় আমি বিবাহিত ছিলাম না। আমি গোপনে বিয়ে করি নাই। সবাইকে জানিয়েই বিয়ে করেছি। অর্থ লেনদেনের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে গৌরীপুর কমিটিতে বিতর্কিত রয়েছে স্বীকার করে সব্যসাচী বলেন, যেসব অভিযোগ পদপ্রাপ্ত নেতাদের বিরুদ্ধে উঠেছে সেগুলো প্রমাণ হলে কোনোভাবেই তাদের ছাত্রলীগ করতে দেয়া হবে না। ভবিষ্যতে যেন কোনোদিন ছাত্রলীগ না করতে পারে, সেই ব্যবস্থা অর্থাৎ স্থায়ী বহিষ্কার করা হবে বলেও জানান ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের অবৈধ ও বিবাহিত সাধারণ সম্পাদক সরকার মো. সব্যসাচী। 

Ads
Ads