কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যর্থতায় সুইস ব্যাংকে বেড়েছে বাংলাদেশিদের টাকা

  • ২৮-Jun-২০১৯ ০২:৫৪ অপরাহ্ন
Ads

:: অর্থনৈতিক প্রতিবেদক ::

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যর্থতায়  ২০১৮ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারির অভাবে এবং দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর মানুষের আস্থা কমে যাওয়াতেই এমন অবস্থা হয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।  এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৯ শতাংশ বা ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বেড়ে গেছে।

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) গত বৃহস্পতিবার ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড-২০১৮’ বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখান থেকে বাংলাদেশিদের অর্থ জমার এ তথ্য পাওয়া গেছে।

সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬২ কোটি সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৫ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা।

তবে ২০১৭ সালে ছিল ৪৮ কোটি ১৩ লাখ সুইস ফ্রাঁ বা ৪ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। বাংলাদেশি মুদ্রায় গতকাল এক সুইস ফ্রাঁর বিনিময়মূল্য ছিল ৮৬ টাকা ৪৩ পয়সা।

২০১৬ সালের তুলনায় অবশ্য ২০১৭ সালে সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশিদের অর্থ জমার পরিমাণ কমে গিয়েছিল।

সাধারণত সুইস ব্যাংক অর্থের উৎস গোপন রাখে। এসএনবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের বছরেও সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ বেড়েছিল। যেমন ২০১৩ সালে বিভিন্ন সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা রাখা অর্থের পরিমাণ ছিল ৩৭ কোটি ১৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫১ কোটি সুইস ফ্রাঁ বা ৪ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা।

জানতে চাইলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, নির্বাচনের বছরে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়ে যায়। তারই কিছুটা প্রমাণ সুইজারল্যান্ডের তথ্য থেকে পাওয়া গেছে।’

আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে আমরা দেখেছি, গত বছর আমদানি ব্যয় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। ধারণা করা যায়, তার একটি অংশ পাচার হয়ে সুইজারল্যান্ডে গিয়ে জমা হয়েছে।’

বাংলাদেশ থেকে অর্থ জমার পরিমাণ বাড়লেও ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিকের জমার পরিমাণ কমেছে।

সুইস ব্যাংকে ভারতীয়দের অর্থ জমার পরিমাণ কমার কারণ হিসেবে জানা গেছে, ভারত সরকারের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের এ-সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। ভারত সরকার সে দেশের অনেক অর্থ পাচারকারীর তথ্য সাম্প্রতিক সময়ে সুইজারল্যান্ড থেকে সংগ্রহ করেছে। তবে বাংলাদেশের বেলায় তেমনি ঘটেনি।

আইন অনুযায়ী দেশ থেকে অর্থ পাচারের বিষয়টি তদারক করে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। জানতে চাইলে সংস্থাটির প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, ‘সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে যত অর্থ জমা হয়েছে, তার সবই দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের হিসাবে প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশিদের যে অর্থ জমার তথ্য দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থও রয়েছে। তাই জমা হওয়া অর্থের পুরোটাই যে অবৈধ বা পাচার হয়ে গেছে, তা বলা যাবে না। দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে কারা অর্থ জমা করেছে, আমরা নানাভাবে সেই তথ্য জানার চেষ্টা করেও জানতে পারিনি।’

আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান আরও বলেন, ‘তথ্য জানতে হলে ব্যক্তির পুরো পরিচয় ধরে তথ্য চাইতে হয়। এ জন্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ভারত কী প্রক্রিয়ায় সুইজারল্যান্ড থেকে তথ্য নিয়েছে, তা আমরা খতিয়ে দেখছি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক সফল গর্ভনর আতিয়র রহমান বলেন, বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার হয়েছে একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় আমাদের নেই। তবে দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর মানুষ আস্থা হারিয়েছে বলেই বিদেশের ব্যাংকগুলোতে টাকা রাখতে শুরু করেছে। এমনকি এ আস্থাহীনতার কারণেই বিদেশী ব্যাংকের দিকে ঝুঁকছে এ দেশীয়রা। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের  উচিত ছিল বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে কঠোর নজরদারিতে রাখার পাশাপাশি ব্যবসা উন্নয়নে সুযোগ দেয়া। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেক্ষেত্রে সফল হতে পারে নি। ফলে মানুষজন এখন দেশীয় ব্যাংকের চেয়ে সুইস ব্যাংককেই নিরাপদ মনে করছে। 

সিপিডির সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আরো বেশি উদ্যোগী এবং কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলেই বিদেশের ব্যাংকে টাকা জমানোর প্রবণতা কমবে। তবে সুইস ব্যাংকে টাকা রাখা অন্যায় কিছু না। যদি সেই টাকাকা বৈধ টাকা হয়। কিন্তু সুইস ব্যাংকে টাকা রাখার কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। এই টাকাগুলো দেশীয় বেসরাকরি ব্যাংকগুলোতে থাকলে দেশের অনেক উন্নয়নে কাজে লাগতে পারতো।

এক্ষেত্রে ব্যাংকিংখাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক মোটেও সফল হতে পারেনি। কেন পারেনি, সেটাও তাদের খুঁজে বের করতে হবে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোতে পরিবারতন্ত্রের প্রভাব কমিয়ে আনতে হবে এবং এ খাতে দুর্নীতি কমাতেই হবে। সেক্ষেত্রে ভালো কাজ করে সকল ব্যাংক দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করতে না পারলে সুইস ব্যাংক কেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই টাকা রাখবে বাংলাদেশিরা। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত এখনই ব্যবস্থা নিয়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে পারিবারিক প্রভাব, দুর্নীতি কমিয়ে আনা। সেটা করতে পারলে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতেই টাকা রাখবে মানুষ। যে টাকা দিয়ে দেশের উন্নয়নও হবে।

Ads
Ads