বাঘ হত্যা ও চোরাচালানকারী এমপি জগলুলের বিরুদ্ধে মামলা চলমান!

  • ২৩-Jun-২০১৯ ০৯:১৩ অপরাহ্ন
Ads

:: উৎপল দাস ::

শুধু নারীলোভী, ধর্ষক, সরকারি প্রকল্পের অর্থ লুটেরা, জামায়াত-বিএনপির পৃষ্ঠপোষকই নন সরকারদলীয় এমপি এস এম জগলুল হায়দার। তার বিরুদ্ধে রয়েছে সুন্দরনের বাঘ হত্যা ও চোরাচালানের মতো ঘোরতর অপরাধের অভিযোগ। ইন্টারপোলের তালিকাভুক্ত ৩২ জন প্রভাবশালী ও রাজনীতিদের তালিকায় জগলুল হায়দার রয়েছেন উপরে সারিতেই। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রচার করেছিলেন যে, মহামান্য হাইকোর্ট থেকে বাঘ হত্যা মামলায় তার নাম কাটিয়ে অব্যাহতি নিয়েছেন। কিন্তু বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। মামলাটি এখনো চলমান। মিথ্যা তথ্য দিয়ে তিনি এমপিও হয়েছিলেন বলে অভিযোগ ভোরের পাতার কাছে এসেছে। কেননা নির্বাচনের হলফনামায় ভুয়া আয়কর সনদ (ট্যাক্স আইডেনটিফিকেশন নম্বর) দেয়ার অভিযোগের প্রমাণপত্রও ভোরের পাতা হাতে রয়েছে। এমপি জগলুলের বিরুদ্ধে নানা অপকর্ম, দুর্নীতি, নারী কেলেংকারী, তার পরিবারের অবৈধ সম্পদ, ভুমি দখলের অভিযোগ নিয়ে ভোরের পাতার ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে ৫ম পর্ব। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোল বাংলাদেশ সরকারের কাছে সুন্দরবনের বাঘ হত্যা এবং ক্ষুদ্র অস্ত্রের সরবরাহ নিয়ে দুটি প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপরের বছর দেশের একটি শীর্ষ স্থানীয় দৈনিকে ইন্টারপোলের রিপোর্টের বরাত দিয়ে এমপি জগলুল হায়দারসহ আরো ৩১ জনের নাম উল্লেখ করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়। 

৩১ জুলাই ২০১৬ ইন্টারপোলের দেওয়া প্রতিবেদন অনুসারে সুন্দরবনের বাঘ হত্যা ও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা সরকারের কাছে জানতে চেয়েছিল মহামান্য হাইকোর্ট।

ইন্টারপোলের এবং একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি জে এন দেব চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন। 

২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে স্বরাষ্ট্রসচিব, বন ও পরিবেশসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও খুলনা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি), কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক, খুলনার জেলা প্রশাসক, খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে হবে।

সংশ্লিষ্ট এসব কর্মকর্তাদের সকলের প্রতিবেদনেই বাঘ হত্যা ও চোরাচালানে এমপি জগলুল হায়দারের নাম উপরের সারিতেই রয়েছে। এ সংক্রান্ত সকল প্রতিবেদন ভোরের পাতার হাতে এসেছে। এ বিষয়ে ২০১৬ সালের ২৯ আগস্ট পুলিশ সদর দপ্তরের তৎকালীন আইন কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার বিশ্বাস স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনেও দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সুপারিশ করেছেন। 

তবে সুচুতুর এমপি জগলুল হায়দার হাইকোর্ট থেকে নিজের নাম কাটানোর অনেক চেষ্টা করেছেন, সাময়িকভাবে সফল হলেও তার মামলাটি আবারো পুনরুজ্জিবিত হয়েছে। এমনকি বাঘ হত্যায় জড়িত বাংলাদেশি প্রভাবশালীদের নামে করা ইন্টারপোলের তালিকায় এখনো জগলুল হায়দারের নাম রয়েছে। সরকার দলীয় এমপি হওয়ার কারণে তিনি বিষয়টি যেন গণমাধ্যমে না আসে, সে কারণে সারাদিনই নিজ এলাকার মানুষের কাছে বলে বেড়াচ্ছেন, আমি বাঘ হত্যা করি নাই। কিন্তু পুলিশের আন্তজার্তিক সর্বোচ্চ সংস্থা ইন্টারপোলের তালিকায় এখনো তার নাম থাকায় মামলাতেও তার নামটি রয়েছে এবং তদন্তও চলছে বলে নিশ্চিত করেছে ঢাকাস্থ ইন্টারপোলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। 

তিনি ভোরের পাতাকে বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের কারণেই এমপি জগলুলকে আসামি করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে এখনো তদন্ত চলছে। তিনি দোষ না করে থাকলে ইন্টারপোলই তাকে নিদোর্ষ বলে জানিয়ে দিতো। এখনো পর্যন্ত যেহেতু ইন্টারপোলের পক্ষ থেকে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হননি, তাই এমপি জগলুল এখনো একজন বাঘ হত্যাকারী এবং চোরাচালানকারী হিসাবেই স্বীকৃত। প্রয়োজনে তার বিচারের বিষয়টি আন্তজার্তিক আদালতে যাবে। 

এমপি জগলুলের বাঘ হত্যায় সম্পৃক্ততা বিষয়ে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা ভোরের পাতাকে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোনো ক্ষমা দেখাতে রাজি নন। দেশের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যার সময়ে নিজ দলের এমপিকে অপরাধের কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমপি জগলুলের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত যতগুলো অভিযোগ পাওয়া গেছে তার মধ্যে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। এছাড়া বাঘ হত্যা ও চোরাচালান খুবই গর্হিত কাজ। দু'টি বিষয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। অবশ্যই খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংসদীয় কমিটির সভায় তা উত্থাপন করা হবে। 

এসব অভিযোগের বিষয়ে জগলুল হায়দারকে ফোন করলেও তিনি এ প্রতিবেদকের ফোন ধরেননি। তবে একাদশ নির্বাচনের আগে অন্য একটি অনলাইন পোর্টালের সাংবাদিক এ বিষয়ে তার কাছে বাঘ হত্যার বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে নিজেকে সেভ করার জন্য ভোরের পাতার এ প্রতিবেদকের কাছে পরামর্শ চান। তখন এমপি জগলুল হায়দারকে সংশ্লিষ্ট পত্রিকার মালিক যিনি নিজেও একজন সংসদ সদস্য তাকে ফোন করে বিষয়টি সমঝোতা করার পরামর্শ দেন এ প্রতিবেদক। এরপর বিষয়টি নিয়ে আর কোনো নিউজ প্রকাশ হয়নি ওই অনলাইনে। তবে জগলুল হায়দার এ প্রতিবেদকে অনেক সময়ই কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, তিনি হরিণের মাংস খেতে পছন্দ করেন। একদিন তার বাসায় হরিণের মাংস খাওয়ার দাওয়াত দিয়েছিলেন এমপি জগলুল হায়দার। কিন্তু এ প্রতিবেদক, তার দাওয়াত গ্রহণ করেননি, কারণ হরিণ হত্যা করা অন্যায় সেটা এমপি জগলুলকে জানিয়ে তা বিনয়ের সাথে প্রত্যাখান করেন। 

Ads
Ads