সংসদে তিন'শ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ, তালিকায় নেই শীর্ষরা!

  • ২৩-Jun-২০১৯ ০২:৪৫ অপরাহ্ন
Ads

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

থাকেন শতকোটি টাকার আলিশান বাড়িতে, চড়েন কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়িতে। নিজ ও পরিবারের নামে করেছেন স্কুল-কলেজ, মাদরাসা-মসজিদ। নামে-বেনামে কিনেছেন জমি, নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ছেন। সমাজে প্রভাব-প্রতিপত্তিও বিপুল। নিয়মিত যান বিদেশে। আবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গড়েছেন সেকেন্ড হোম। পাচার করছেন অর্থ। সবই ঠিক চলছে। শুধু ব্যাংকঋণের টাকা ফেরত দেওয়াতে যত অনীহা। 

শনিবার জাতীয় সংসদে দেশের ৩শ’ জন শীর্ষ ঋণখেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানাসহ একটি তালিকা জাতীয় সংসদে প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এরা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছে ৭০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। এঁদের কাছে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা বর্তমানে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা প্রায় দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ ব্যয়ের সমান।

এতে দেখা গেছে, শীর্ষ ৩শ ঋণখেলাপির যে তালিকা রয়েছে তাতে বরাবরের মতোই এবারও আসেনি রাঘববোয়ালদের নাম। অর্থমন্ত্রীর তুলে ধরা তথ্যমতে, ২০০৯ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানির কাছ থেকে পাঁচ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছেন ১৪ হাজার ৬১৭ জন। এসব ঋণগ্রহীতার অধিকাংশই ঋণখেলাপি হয়ে গেছেন। সর্বসাকুল্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৮৩ কোটি টাকা। এর আগে শীর্ষ ২০ ও ১০০ জন ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। দুজন সাংসদের প্রশ্নের উত্তরে এসব তথ্য প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী।

এ ছাড়া প্রকাশ করা হয়েছে ৫ কোটি টাকার বেশি ঋণগ্রহীতাদের তালিকাও। তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নামে-বেনামে কোম্পানি খুলে বড় বড় গ্রুপের পক্ষে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব গ্রুপের একেকটিতে ৩০টা কোম্পানি পর্যন্ত রয়েছে। এসব কোম্পানির বিপরীতে ৩০ থেকে ৩৫টি ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। অথচ অর্থমন্ত্রীর প্রকাশ করা তালিকায় এসব গ্রুপের নাম আসেনি; এসেছে তাদের দু-একটি কোম্পানির নাম। এ কারণে শীর্ষ ঋণখেলাপিদের কাছে পাওনার পরিমাণও বাস্তবের তুলনায় অনেক অনেক কম দৃশ্যমান হচ্ছে।

নিয়মানুযায়ী, এক ব্যক্তি বা গ্রুপের যে কোনো একটি কোম্পানি খেলাপি হলেই তিনি বা সেই গ্রুপ ঋণখেলাপি হিসেবে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) চিহ্নিত হবেন বা হবে। অর্থমন্ত্রীর তুলে ধরা ঋণখেলাপির তালিকায় একই ব্যক্তির বা গ্রুপের একাধিক কোম্পানির তথ্য দেওয়া হলেও ওই ব্যক্তি বা গ্রুপের সর্বমোট কী পরিমাণ ঋণখেলাপি হয়েছে, সে তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। অথচ বড় অংকের ঋণ নিয়ে সটকে পড়েছেন এসব ব্যক্তি ও তাদের গ্রুপ।

শীর্ষ ৩শ ঋণখেলাপির তালিকায় প্রথম নামটি চট্টগ্রামের সামানাজ সুপার অয়েলের। কোম্পানিটির নামে খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছে ১ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। কার্যত এ কোম্পানিটির মূল হচ্ছে এসএ গ্রুপ। শাহাবুদ্দিন আলমের এ গ্রুপটি ঋণখেলাপি হওয়ার পরও তিনি দীর্ঘদিন পরিচালক হিসেবে ছিলেন। তার কাছে ২৪টি ব্যাংকের পাওনা প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। তারই কোম্পানির একটি এসএ অয়েল রিফাইনারি। ৮ নম্বর তালিকায় থাকা এ কোম্পানির নামে খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছে ৭০৭ কোটি টাকা। তারই আরেকটি কোম্পানি সামানাজ কনডেন্সড মিল্কের নামে খেলাপি রয়েছে ১২৭ কোটি টাকা, তালিকায় যেটি রয়েছে ১২৩ নম্বরে।

খেলাপির তালিকায় দ্বিতীয় নামটি গাজীপুরের গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং। এ প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকের পাওনা দেখানো হয়েছে ৯৮৪ কোটি টাকা। এ কোম্পানিটি কার্যত অ্যাননটেক্স গ্রুপের। এর কর্ণধার ইউনুস বাদলের ২২টি কোম্পানির বিপরীতে জনতা ব্যাংক থেকে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ গ্রুপের ৬টি প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকায় এসেছে পৃথক পৃথকভাবে-সুপ্রভ কম্পোজিট ৬২০ কোটি, সুপ্রভ স্পিনিং ৬শ কোটি ও সিমরান ৫৮৯ কোটি, সুপ্রভ মোটর ৪৬ কোটি, সুপ্রভ মেলাঙ্গ স্পিনিং ১৬৭ কোটি, অ্যাননটেক্স নিট ২২৯ কোটি এবং জ্যাকার্ডের খেলাপি ৪৮৮ কোটি টাকা। অথচ গ্রুপটির মোট খেলাপি যোগ করা হলে খেলাপির অংকটা অনেক উঁচুতে উঠে যাবে। তদুপরি এ গ্রুপেরই আরও কিছু কোম্পানির খেলাপি ঋণ তালিকায় তুলে ধরা হয়নি।

সম্প্রতি মোস্তফা গ্রুপের চেয়ারম্যান হেফাজতুর রহমান ঋণখেলাপের দায়ে আটক হয়েছেন। তার কাছে ৩১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। অথচ তালিকায় মোস্তফা গ্রুপের একটিমাত্র কোম্পানি রয়েছে। ফলে তালিকায় তার কোম্পানির নাম এসেছে ২০৫ নম্বরে।

সাম্প্রতিককালে আলোচিত ক্রিসেন্ট গ্রুপের কছে জনতা ব্যাংকের পাওনা প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে অন্য কোম্পানির নামেও আরও ২ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে গ্রুপটি। শীর্ষ খেলাপির করা তালিকায় এ গ্রুপের মাত্র ৪টি কোম্পানির নাম রয়েছে-রিমেক্স ফুটওয়ার ৯৭৬ কোটি, রুপালি কম্পোজিট ৭৯৮ কোটি, ক্রিসেন্ট লেদার ৭৭৬ কোটি, ক্রিসেন্ট ট্যানারিজ ১৬৩ কোটি এবং লেক্সকোর খেলাপি ৪৩৯ কোটি টাকা। জাতীয় পার্টির নেতা মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিমের ক্রিস্টাল গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানির কাছে ১২টি ব্যাংকের পাওনা প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা।

তার সবগুলো প্রতিষ্ঠানের নাম আসেনি তালিকায়। এসেছে ইব্রাহিম কনসোর্টিয়াম ১৫০ কোটি, ইব্রাহিম টেক্সটাইল ৩৭৩ কোটি, ইব্রাহিম কম্পোজিট ৭৪ কোটি, ক্রিস্টাল স্টিল ১০৫ কোটি, ম্যাক ১১৩ কোটি, মা টেক্স ১১১ কোটি এবং ম্যাক্স ইন্টারন্যাশনালের খেলাপি ৩৭২ কোটি টাকা।  গ্লোব গ্রুপের মাত্র তিনটি কোম্পানির বিপরীতে খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছে-গ্লোব মেটাল ১৫০ কোটি, গ্লোব এডিবল অয়েল ১৫০ কোটি এবং গ্লোব জনকণ্ঠ পরিবারের খেলাপি ৮০ কোটি টাকা।

শীর্ষ খেলাপির তালিকায় চারে আছে কোয়ান্টাম পাওয়ার (৮২৮ কোটি টাকা) এবং পাঁচ নম্বরে চট্টগ্রামের মাহিন এন্টারপ্রাইজ (৮২৫ কোটি)। শীর্ষের দশ নম্বরে থাকা গ্রামীণ শক্তির খেলাপি ঋণ ৬০১ কোটি টাকা।

তালিকায় হলমার্কের বিভিন্ন কোম্পানির নাম এসেছে পৃথকভাবে। এ গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সোনালী ব্যাংকের পাওনা ৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ম্যাক্স স্পিনিংয়ের নামে ৫২৬ কোটি (১৪তম), আনোয়ার স্পিনিং ৪৭৫ কোটি (২০), হলমার্ক ফ্যাশনস ৩৪১ কোটি (৩১), টি অ্যান্ড ব্রাদার্স কম্পোজিট ১৯৭ কোটি (৫৫), ওয়ালমাট ফ্যাশন ১৭০ কোটি (৭৭) ও হলমার্ক স্পিনিং ৭২ কোটি (২৭৫তম) টাকা ঋণখেলাপি।

এ ছাড়া শীর্ষ ২০ খেলাপির তালিকায় রয়েছে গাজীপুরের সৌরভ স্পিনিংয়ের ৫৮২ কোটি (১১তম), কম্পিউটার সোর্স ৫৭৫ কোটি (১২), বেনেটেক্স ৫২৩ কোটি (১৫), আলফা কম্পোজিট ৫২৩ কোটি (১৬), সিদ্দিক ট্রেডার্স ৫১১ কোটি (১৭), রুবায়া ভেজিটেবল ৫০১ কোটি (১৮) এবং রাইজিং স্টিল ৪৯৪ কোটি টাকা (১৯তম)।

শীর্ষ খেলাপির তালিকায় আরও রয়েছে সেন্ট্রাল হাসপাতাল ২৮৬ কোটি (৪১তম), কেয়ার স্পেশালাইজড হাসপাতাল ২০৪ কোটি (৫২) টাকা। তালিকায় আরও রয়েছে মন্নু ফেব্রিক্স (২৬৭ কোটি), আলোচিত বিসমিল্লাহ গ্রুপের বিসমিল্লাহ টাওয়েল (২৪৪ কোটি), আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিআইএফসি (২০২ কোটি), ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ (১৮০ কোটি), সিক্স সিজন ১৮৩ কোটি, বুলু ইন্টারন্যাশনাল ২১৪ কোটি, এপেক্স ১৩০ কোটি, কেয়া কসমেটিকস ৯৯ কোটি, অটবি ১১৮ কোটি, রূপায়ণ হাউজিং ২৮০ কোটি, অরনেট সার্ভিস ১৩৭ কোটি এবং দেশবন্ধু সুগার মিল ৮৪ কোটি টাকা।

আওয়ামী লীগের সাংসদ মো. ইসরাফিল আলমের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তালিকা তুলে ধরেন।  সরকারি ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের কয়েকটি বড় ব্যাংকের কাছ হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়েছে কয়েকটি গ্রুপ। এসব গ্রুপের নাম সর্বত্রই আলোচিত হলেও তালিকায় আসেনি। রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক কারণে তারা ‘খেলাপি’ হয়েছেন, এমন অজুহাত দেখিয়ে বারবার তারা খেলাপির তালিকার বাইরে থেকে যাচ্ছেন এবং তাবৎ সুবিধা ভোগ করছেন। অথচ ব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ ফেরত দিচ্ছেন না। আদালতের মাধ্যমে আদেশ নিয়ে খেলাপির তকমা কাটিয়ে তারা ভোগ করছেন সব সুযোগ-সুবিধা। সেসব ব্যক্তি ও গ্রুপের নাম তালিকায় স্থান পায়নি।

সংসদ সদস্য লুৎফুন নেসা খানের আরেক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ৩৯ মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৪৩ হাজার ২১০ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এ সময়ে ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়েছে ৫৮ হাজার ৪৩৬ জন। ওই সংসদ সদস্য ২০০৯ সালে ঋণখেলাপি কত ছিল ও তাদের কাছে প্রাপ্ত ঋণের পরিমাণ এবং ২০১৮ সালে ওই সংখ্যা ও অর্থের পরিমাণও জানতে চেয়েছিলেন। অর্থমন্ত্রী এর জবাবে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি ডেটাবেইজে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরের আগের কোনো তথ্য সংরক্ষিত নেই। তাই ২০০৯ সালের ঋণের তথ্য দেওয়া সম্ভব হয়নি।

অর্থমন্ত্রী জানান, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঋণখেলাপির সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১১ হাজার ৯৫৪ জন; বর্তমানে ১ লাখ ৭০ হাজার ৩৯০ জন। ২০১৫ সালে খেলাপির পরিমাণ ছিল ৫৯ হাজার ১০৫ কোটি টাকা; ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৩১৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর খেলাপি ঋণ নতুন করে আর বাড়বে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন আ হ ম মুস্তফা কামাল। কিন্তু খেলাপি ঋণ হ্রাসে আদায়ের পদক্ষেপ জোরদারের পরিবর্তে ঋণখেলাপিদের আরো সুবিধা ও ছাড়ের পথ তৈরি করে দিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি ঋণ শ্রেণীকরণ ও পুনঃ তফসিল উভয় নীতিমালাতেই ঋণখেলাপিদের বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ পুনঃ তফসিল নীতিমালার আওতায় মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট ও ৯ শতাংশ সরল সুদ নির্ধারণসহ ১০ বছর মেয়াদে ঋণ নিয়মিত করার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। যদিও ঋণ পুনঃ তফসিলের বিশেষ নীতিমালার ওপর আগামী ২৪ জুন পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দিয়েছেন আদালত। এই স্থগিতাদেশ উঠে গেলে সার্কুলারের সুবিধাভোগী হবেন এসব খেলাপিরাই। এতে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কমলেও ব্যাংকিং খাত ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা।

গতকাল সংসদে উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে কার্যরত সকল তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এক লাখ ৭০ হাজার ৩৯০টি। এসব প্রতিষ্ঠানে খেলাপি হওয়া অর্থের পরিমাণ এক লাখ দুই হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ১১.৮৭ শতাংশ। এর বাইরে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অবলোপনের মাধ্যমে ব্যাংকের হিসাবের খাতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে নিট ৪০ হাজার ১০১ কোটি টাকা। এ ঋণ যোগ করলে দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ ৫০ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘তালিকা দিলেই হবে না, কারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি আর কারা অনিচ্ছাকৃত খেলাপি সেটা চিহ্নিত করতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশেই এগুলো চিহ্নিত করে তালিকা প্রকাশ করা হয়। কাজেই যারা ইচ্ছা করে ঋণের টাকা ফেরত দিচ্ছে না তাদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত। খেলাপিদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কয়েক ডজন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি চট্টগ্রামের এস এ গ্রুপের কর্ণধার মো. শাহাবুদ্দিন আলম। তিনি ঋণের টাকা ফেরত না দিয়ে নামে-বেনামে বিভিন্ন জায়গায় অঢেল সম্পদ গড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার পরও বিভিন্ন সময় প্রভাব খাটিয়ে একের পর এক সুবিধা নিয়েছেন। একই ঋণ পুনঃ তফসিল করিয়েছেন বারবার। সব শেষ নিয়েছেন পুনর্গঠন সুবিধাও। কিন্তু ঋণের টাকা আর ফেরত দেননি। অর্থমন্ত্রীর সংসদে উপস্থাপিত শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় তাঁর মালিকানাধীন সামান্নাজ সুপার অয়েল এখন ১ নম্বরে। সামান্নাজ সুপার অয়েলের কাছে এক ডজনেরও বেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ রয়েছে এক হাজার ৪৯ কোটি টাকা। এস এ গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠান এস এ অয়েল রিফাইনারি রয়েছে শীর্ষ তালিকার ৮ নম্বরে। এ প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ৭০৭ কোটি টাকা। ১২৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়ে তালিকার ১২৩ নম্বরে আছে তাঁদের আরেক প্রতিষ্ঠান সামান্নাজ কনডেন্স মিল্ক। সূত্র বলছে, এই গ্রাহক খেলাপি হলেও হাইকোর্টে রিট করে দীর্ঘদিন মার্কেন্টাইল ব্যাংকে পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। গত বছরের ১৭ অক্টোবর তাঁকে প্রতারণার মামলায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এ্যাননটেক্স গ্রুপের কর্ণধার ইউনুস বাদলের বিস্ময়কর ‘উত্থানের’ গল্প সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচিত। জুভেনিল সোয়েটার নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবসায় নেমে তিনি এখন ২২টি প্রতিষ্ঠানের মালিক। একের পর এক প্রতিষ্ঠান খুলে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে ছয় বছরে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছেন তিনি। ওই টাকায় বিভিন্ন স্থানে জমি কিনেছেন। স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। ঢাকার উত্তরা ও টঙ্গীতে করেছেন বাড়ি, মোহাম্মদপুরে কিনেছেন ফ্ল্যাট। নামি-দামি মডেলের গাড়িতে যাতায়াত করেন তিনি। এ গ্রুপের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে শীর্ষ খেলাপির তালিকায়। এর মধ্যে গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্নের নাম উঠে এসেছে তালিকার ২ নম্বরে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের পাওনা এক হাজার ১২০ কোটি টাকা; যার ৯৮৪ কোটি টাকাই এখন খেলাপি। পাশাপাশি ইউনুস বাদলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সুপ্রভ কম্পোজিট নিট, সুপ্রভ স্পিনিং মিলস, সিমরান কম্পোজিট, সুপ্রভ রুটার স্পিনিং মিলস, জ্যাকার্ড নিট টেক্স, এমএইচ গোল্ডেন জুট মিলস ও সুপ্রভ মেলান্জ স্পিনিং রয়েছে তালিকার ৯, ১১, ১৩, ২১, ২৫, ৫৪ ও ৮০ নম্বরে।

ভুয়া রপ্তানি কাগজে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া পুরান ঢাকার সহোদর এম এ কাদের ও এম আজিজও আলোচিত ঋণখেলাপি। তাঁদের বিরুদ্ধে ঋণের অর্থ পাচার ছাড়াও গুলশান ও বনানীতে বিলাসবহুল বাড়ি, জমি ও সিনেমা তৈরির অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের মালিকানাধীন পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রিমেক্স ফুটওয়্যার, রূপালী কম্পোজিট লেদার, ক্রিসেন্ট লেদার প্রডাক্টস ও ক্রিসেন্ট ট্যানারিজের নাম রয়েছে তালিকার ৩, ৬, ৭ ও ৮৩ নম্বরে। এর মধ্যে রিমেক্স ফুটওয়্যার ৯৭৬ কোটি, রূপালী কম্পোজিট ৭৯৮ কোটি, ক্রিসেন্ট লেদার ৭৭৬ কোটি ও ক্রিসেন্ট ট্যানারিজের খেলাপি ১৬৩ কোটি টাকা। প্রায় এক হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে করা মামলায় গত ৩০ জানুয়ারি ক্রিসেন্ট লেদারের চেয়ারম্যান এম এ কাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ঋণখেলাপি হিসেবে বহুল আলোচিত চট্টগ্রামের আরেক ব্যবসায়ী হারুনুর রশিদ। তিনি খেলাপি হলেও বিলাসী জীবনযাপন করেন; চড়েন দামি গাড়িতে। রাজধানীর ধানমণ্ডি ও চট্টগ্রামে তাঁর বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া নামে-বেনামে বিভিন্ন জায়গায় অনেক জমি থাকারও অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর মালিকানাধীন পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের তিনটি রুবিয়া ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ ৫০১ কোটি, এইচ স্টিল রি-রোলিং মিলস ২০৯ কোটি ও চট্টগ্রাম ইস্পাত ১১৭ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে শীর্ষ তালিকার ১৮, ৫১ ও ১৪০ নম্বরে রয়েছে।

দেশের একসময়ের সেরা তথ্য-প্রযুক্তি আমদানিকারক ও পরিবেশক প্রতিষ্ঠান কম্পিউটার সোর্স লি. ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঋণ নিয়ে তা অন্য খাতে ব্যবহার করেছে। ঋণের বড় অংশ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় জমি কিনেছে। ঋণের একটা অংশ সিঙ্গাপুরে পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় ১২ নম্বরে এবং ১৬টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ৫৭৫ কোটি টাকা খেলাপি।

শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকার চার নম্বরে রয়েছে আসবাবপত্র খাতের অটবির সহযোগী প্রতিষ্ঠান কোয়ান্টাম পাওয়ার সিস্টেমস। এ গ্রুপের কর্ণধাররা বিলাসী জীবন যাপন করলেও ব্যাংকের টাকা ফেরত দেন না। এ প্রতিষ্ঠানের কাছে দেশের ১৫টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ রয়েছে প্রায় ৮২৮ কোটি টাকা।

ব্যাংক খাতে স্মরণকালের ভয়াবহ ঋণ কেলেঙ্কারির হোতা হলমার্ক গ্রুপ সোনালী ব্যাংকের শেরাটন হোটেল শাখা থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। এ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তাদের কাছ থেকে মাত্র সাড়ে ৪০০ কোটি টাকার মতো আদায় করতে সক্ষম হয়েছে সোনালী ব্যাংক। এই গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স স্পিনিং মিলস, আনোয়ার স্পিনিং মিলস, হলমার্ক ফ্যাশন ও ওয়ালমার্ট ফ্যাশন শীর্ষ খেলাপির তালিকায় ১৪, ২০, ৩১ ও ৭৭ নম্বরে রয়েছে। এ ছাড়া সোনালী ব্যাংকের অন্য দুই গ্রাহক প্রতিষ্ঠান ফেয়ার ট্রেড ফ্যাব্রিকস ও টি অ্যান্ড ব্রাদার্স নিট কম্পোজিটও রয়েছে তালিকার ৩৪ ও ৫৫ নম্বরে। এই ছয় প্রতিষ্ঠানের কাছে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় দুই হাজার ৩০৩ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘হলমার্ক থেকে অর্থ আদায়ে সোনালী ব্যাংক আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। এরই মধ্যে ১৬টি মামলার রায় ব্যাংকের অনুকূলে এসেছে।’

আরেক নামসর্বস্ব গ্রুপ বিসমিল্লাহ কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকা নেয়; যার সবটাই খেলাপি। এ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বিসমিল্লাহ টাওয়াল রয়েছে তালিকার ৪৮ নম্বরে। এ প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রাইম ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ রয়েছে ২৪৪ কোটি টাকা। গ্রুপটির কর্ণধার খাজা সোলেমান আনোয়ার ঋণের টাকা ফেরত না দিয়েই সপরিবারে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন।

ব্যাংকিং খাতে আরেক আলোচিত ঘটনা বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি। বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু চেয়ারম্যান থাকাকালে অনিয়মের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেন। এ ব্যাংকের নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান ‘আমাদের বাড়ি’ রয়েছে তালিকার ৭৬ নম্বরে। ব্যাংকটির কাছে এ প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ১৭৩ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে বর্তমানে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এই প্রবণতা আরো বেড়েছে। বিশেষ করে বড় ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে এটা দেখা যাচ্ছে; যাঁরা ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তা ও পরিচালকদের সঙ্গে যোগসাজশ, অনিয়ম, জাল-জালিয়াতি ও রাজনৈতিক প্রভাবসহ বিভিন্ন কৌশলে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছেন। কিন্তু ঋণের টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। 

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘তালিকা দিলেই তো হবে না, এদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সেটাই দেখার বিষয়। যে তালিকা করা হয়েছে সেটার যথার্থতা কতটুকু? বড় ঋণখেলাপি যারা ঋণ পুনঃ তফসিল ও পুনর্গঠন সুবিধা নিয়েছে বা যেসব ঋণ অবলোপন হয়েছে তাদের এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে আমার ধারণা। তাই এদেরও তালিকায় আনতে হবে।’  

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বড় কিছু গ্রাহকের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত। এঁরা বিভিন্ন উপায়ে ঋণের নামে প্রচুর টাকা বের করে নিয়েছেন এবং নানা কাজে লাগিয়েছেন। কিন্তু ফেরত দিচ্ছেন না। ঋণ ফেরত দেওয়ার আন্তরিকতাও তাঁদের মধ্যে দেখা যায় না। এসব ঋণের বিপরীতে যে জামানত নেওয়া হয় তাও পর্যাপ্ত নয়। ফলে মামলা করেও ঋণ আদায় করা সম্ভব হয় না।’ 

সাউথইস্ট ব্যাংকের এমডি এম কামাল হোসেন বলেন, ‘রাজনৈতিক চাপেও অনেক ঋণ গেছে।’ তাঁর মতে, ‘ঋণখেলাপিরা যে টাকায় জমি, বাড়ি, গাড়ি ও ফ্ল্যাট কিনেছেন সেটা তো সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা। এটা খেয়ানত করার অধিকার কারো নেই।’

Ads
Ads