ভেজাল কি রমজানেই মেলে: সারাবছর অভিযানের নির্দেশ হাইকোর্টের

  • ১৬-Jun-২০১৯ ১০:২১ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

এতোদিন ভেজাল বিরোধী অভিযান মূলত রমজান মাস কেন্দ্রিকই ছিল। এ নিয়ে ফেসবুক সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও কম লেখালেখি হয়নি। প্রশ্ন রাখা হয়, শুধু রমজান মাস এলেই কেন এই ভেজাল বিরোধী অভিযান চালানো হয়। বাকি বছর কেন এই ভেজাল বিরোধী অভিযান চালানো হয় না। সেই প্রশ্নে শরিক হলো এবার দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টও। নির্দেশ দেওয়া হলো শুধু বিশেষ কোনো মাসে নয়, সারাবছরই ভেজাল ও মানহীন পণ্যের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর। এছাড়াও নিরাপদ পণ্য ও খাদ্যের মান নির্ণয়ের জন্য ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষকে আগামী দুই মাসের মধ্যে হটলাইন কার্যক্রম চালু করার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। গতকাল রোববার বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পরীক্ষায় বাজারে থাকা নিম্নমানের ৫২ পণ্যের বিষয়ে এক শুনানিতে এই আদেশ দেন আদালত।

উল্লেখ্য, ৫২ পণ্য বাজার থেকে অবিলম্বে না সরানোয় গত ২৩ মে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে তলব করেছিলেন হাইকোর্ট। বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় মানহীন ৫২টি খাদ্যপণ্য অবিলম্বে বাজার থেকে সরাতে ও জব্দে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশ বাস্তবায়নে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম ‘আইওয়াশ’ (লোক দেখানো) বলে অভিহিত করেছেন হাইকোর্ট। নির্দেশনা প্রতিপালন না করায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের প্রতি আদালত অবমাননার রুল দিয়ে এ বিষয়ে নিজের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে ১৬ জুন তাকে সশরীরে আদালতে হাজির হতে বলা হয়। গত ২৩ মে হাইকোর্ট এ আদেশ দেন।

খাদ্যে ভেজাল নিয়ে গণমাধ্যমে কিংবা অন্যান্য ফোরামে যত আলোচনা হয়, সম্ভবত আর কোনো একক বিষয়ে তা হয় না। প্রায়ই গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে আসছে, ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে মানুষ কিভাবে ক্রমেই বেশি পরিমাণে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু ভেজাল কি কমছে? বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের প্রায় সব মানুষই মনে করে, ভেজাল ক্রমেই বাড়ছে। তারপরও বেঁচে থাকার প্রয়োজনে এসব ভেজাল খাদ্যই কিনতে বাধ্য হচ্ছে। ভেজালমুক্ত হবে- এ আশায় অনেকে নামি-দামি ব্র্যান্ডের খাদ্যপণ্য কিনে বেশি দাম দিয়ে। কিন্তু লাভ কী? সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বহু নামি-দামি প্রতিষ্ঠানের পণ্যও নিম্নমানের। মানুষ তাহলে যাবে কোথায়?

এ অবস্থায় এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১২ মে হাইকোর্ট এক আদেশে রুল দিয়ে মানহীন পণ্য অবিলম্বে সরাতে ও জব্দে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানিয়ে ওই দুই কর্তাব্যক্তিকে আদালতে প্রতিবেদন দিতেও বলা হয়। এর আগে গত ৯ মে ৫২টি ভেজাল পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার ও জব্দ চেয়ে রিটের শুনানিতে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্স অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পরীক্ষায় প্রমাণিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৫২টি ভেজাল ও নিম্নমাণের পণ্য জব্দ এবং এসব পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার ও উৎপাদন বন্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি-না সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বিএসটিআই ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য অধিদফতরের দুই কর্মকর্তাকে তলব করেন হাইকোর্ট।

প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বাজার থেকে ২৭ ধরনের ৪০৬টি খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করেছিল। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যে ৩১৩টি পণ্যের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে, তার মধ্যে ৫২টি প্রতিষ্ঠানের পণ্য নিম্নমানের বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে- সরিষার তেল, পানি, সেমাই, নুডলস, সফট ড্রিংক, গুঁড়া মসলা, লাচ্ছা সেমাই, আয়োডিনযুক্ত লবণ, চানাচুর, বিস্কুট, সুজি, মধু প্রভৃতি। সরিষার তেলের নামকরা ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে- তীর, জিবি, পুষ্টি, রূপচাঁদা ইত্যাদি। আছে প্রাণ অ্যাগ্রোর লাচ্ছা সেমাই, মধুবন ও মিঠাইয়ের মিষ্টি, এসিআই, মোল্লা সল্ট, মধুমতী, দাদা সুপার, তিন তীর, মদিনা, স্টারশিপ, তাজ ও নূর স্পেশালের আয়োডিনযুক্ত লবণ; ফ্রেশ, প্রাণ, ড্যানিশ, সান, ডলফিন ও মনজিল গ্রুপের হলুদের গুঁড়া।

এখন প্রশ্ন হলো, নামি-দামি প্রতিষ্ঠানগুলোই যদি তাদের খাদ্যপণ্যের মান ঠিক না রাখে, তাহলে অনামি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে মান আশা করব কিভাবে? জনমানুষের উদ্বেগ ও ভেজালের ভয়াবহ ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে উচ্চ আদালত থেকে একাধিকবার সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু কাজের কাজ যে বিশেষ কিছুই হয়নি তার প্রমাণ বিএসটিআইয়ের প্রতিবেদন। এর আগেও সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানসহ আরও কিছু গবেষণাগারের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অনুরূপ ফলাফলই পাওয়া গিয়েছিল। তখনই যদি পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে আজকের এই অবস্থা হতো না। জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসে যায়, সরকার কি সেই দায়িত্ব পালন করছে? সরকারের নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, বিএসটিআইসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে এসব দেখার জন্য। তারা কি সেই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে? করলে নিশ্চয়ই এত দিনে অবস্থার অনেক উন্নতি হতো। কিন্তু বাস্তবে তেমন উন্নতি আমরা দেখতে পাচ্ছি না; বরং অবনতিই দেখতে পাই। ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্য কোনো ক্রমেই নয়। প্রয়োজনে খাদ্যমান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি তাদের কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু রমজান এলেই নয়, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান নিয়মিত করতে হবে এবং আদালতের সংখ্যা বাড়াতে হবে। যেকোনো মূল্যে ভেজালকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

Ads
Ads