বাজেট নিয়ে নানাদিক: ‘হাঁসের যেন ব্যথা না লাগে’

  • ১৫-Jun-২০১৯ ০৯:৫৬ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

স্বাধীনতা উত্তরকাল থেকে এ যাবৎকালের সর্ব বৃহৎ কলেবরের ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হলো গত বৃহস্পতিবার। রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয় মিলিয়ে বাজেটের আকার প্রায় সোয়া পাঁচ লাখ কোটি টাকা। এরপর থেকে এ নিয়ে ভালো দিক, মন্দ দিকসহ নানা অ্যাঙ্গেল থেকে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এ বাজেট জনকল্যাণমুখী। প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষিতে বাড়তি প্রণোদনা- এসব গুরুত্ব পেয়েছে। শিক্ষার মান বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আনা হয়েছে। অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, বাজেটে মধ্যবিত্ত চাপে পড়বে। ধনীরা যথেষ্ট সুবিধা পেয়েছে। অর্থমন্ত্রী তাদের প্রতি উদার হয়েছেন। প্রকৃতগত দিক থেকে এরকম আলোচনা-সমালোচনা প্রতিটি বাজেট পেশ উত্তরই হয়ে থাকে। এ আর নতুন কি। সরকার পক্ষ যেমন যুক্তি দিয়ে এর পক্ষে মত তুলে ধরবে পাশাপাশি সরকার বিরোধীরাও যুক্তি দিয়েই এর বিপক্ষে নানা মত তুলে ধরবে। এর কোনোটিই নতুন নয়।

যেমন, গত বৃহস্পতিবারের বাজেটের ওপর গত শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে সমালোচনা করতে গিয়ে সিপিডি উল্লেখ করেছে, এই বাজেটের সুবিধা পাবে অর্থনৈতিক ‘অপশাসনের সুবিধাভোগীরা’। যদিও সিপিডির এ মন্তব্যেও নতুনত্ব কিছু নেই। কেননা, আমরা তো বরাবরই দেখে আসছি যে, প্রতিটি বাজেটেরই সুবিধা পেয়ে আসছে ওই অর্থনৈতিক ‘অপশাসনের সুবিধাভোগীরাই।’ পক্ষে-বিপক্ষে মতামত যাই হোক না কেন, আমাদের অর্থনীতি এগিয়ে চলেছে, সেটা নিয়ে এখন আর দ্বিমত তেমন নেই। একই সঙ্গে উন্নয়নের ধারা বজায় রাখার পথে যেসব চ্যালেঞ্জ সামনে রয়েছে, সেসবও গুরুত্ব পাচ্ছে। সবাই বলছেন, আশাবাদী হওয়ার মতো অনেক বিষয় আমাদের সামনে রয়েছে। একই সঙ্গে রয়েছে উৎকণ্ঠাও- যেমন, অর্থমন্ত্রী যতটা স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, সেটা পূরণে সুনির্দিষ্ট ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ যথেষ্ট মাত্রায় নেওয়া হচ্ছে কি, নাকি তা অতি রোমান্টিক বায়বীয় কল্পনার ফানুসমাত্র! তবে আমরা চাইব, বাজেট বাস্তবায়নে এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা জয় করায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। 

এবারের বাজেট পেশকালে কিছু প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। যেমন, কর ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনা, মূল্য সংযোজন কর আদায়ে নতুন পদ্ধতি চালু করা, খেলাপি ঋণ আদায়ে বাড়তি জোর দেওয়া, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে খেলাপি হওয়াদের কোনোভাবেই ছাড় না দেওয়া, শিক্ষার মান বাড়াতে বিশেষ নজর দেওয়া, টানা প্রায় এক দশক ধরে বন্ধ থাকা স্কুল-কলেজ শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি ফের শুরু করা,। কৃষকদের বাড়তি সুবিধা দেওয়া, প্রবাসে কাজ করে যারা কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে পাঠায়, তাদের দুই শতাংশ হারে ভর্তুকি প্রদান করা ইত্যাদি। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা অনেক ক্ষেত্রেই কেন অনুপস্থিত? হতে পারে, এসব ভাবনা সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং দফতর-অধিদফতরের রয়েছে। সংসদে আগামী দুই সপ্তাহ বাজেট নিয়ে আলোচনা হবে। সেখানেও হয়তো মিলবে কিছু দিকনির্দেশনা। ততোদিন না হয় আমরা তারই অপেক্ষায় থাকি।

আমরা জানি যে, সরকারের বেশ কয়টি মেগা অর্থনৈতিক প্রকল্প রয়েছে। পদ্মা সেতুর কাজ তো ইতিমধ্যেই কতকটা দৃশ্যমান। বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতের কয়েকটি অবকাঠামোর কাজ চলছে। কিন্তু সরকার ব্যয়বহুল এসব প্রকল্পের কোনোটিতেই সময়মতো শেষ হওয়ার নজির সৃষ্টি করতে পারেনি। সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ার অর্থই হচ্ছে অপ্রীতিকর ব্যয় বৃদ্ধি। আর শেষ বিচারে তার বোঝা কিন্তু জনগণের ওপরেই বর্তায়। সরকার ব্যাংক ঋণ ও সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে যে অর্থ সংগ্রহ করছে, তার জন্যও জনগণকেই চাপ সহ্য করতে হবে। অর্থমন্ত্রী রাজহাঁসের পালক যতটা সম্ভব তোলার কথা বলেছেন; কিন্তু একই সঙ্গে বলেছেন হাঁসের যেন ব্যথা না লাগে। প্রবাদটি সুন্দর। কিন্তু এটাও ভুলে গেলে চলবে না যে, এই ব্যথা যাতে অনুভূত না হয় সেজন্যও প্রতিষেধক ইঞ্জেকশনের অভাব নেই। সরকার যদি সেই পন্থাটিই নিয়ে থাকে, তখন নিরুপায় জনগণের কী হবে? বাস্তবতা হচ্ছে, অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ধনবানদের ওপর করের চাপ বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈষম্য বাড়ছে এটা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। যা দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূলমন্ত্রের বিরোধী। এ পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য সম্পদের পুনর্বণ্টন গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্য দরকার শুল্ককর আদায়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ। তাতে ধনবানদের একটি অংশ হয়তো অসন্তুষ্ট হবে; কিন্তু তাতে যদি দেশের উন্নতি ত্বরান্বিত হয়, বৈষম্য কমে আসে, তো তাদের অসন্তুষ্টিতে রাষ্ট্রের কী আসে যায়! 

Ads
Ads