কলংকমুক্ত ছাত্রলীগ কতদূর, শোভন-রাব্বানীকে শেখ হাসিনার আল্টিমেটাম!

  • ১২-Jun-২০১৯ ০৯:৪১ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: উৎপল দাস ::

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, শুধু একটি ছাত্র সংগঠন নয়। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ একটি আবেগ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে সফল একটি প্রেমের নাম। স্বাধীন বাংলাদেশ বির্নিমানে যে সংগঠনটির রয়েছে গৌরব আর এতিহ্যের সুদীর্ঘ সমৃদ্ধ ইতিহাস। ছাত্রলীগের ইতিহাসের প্রতিপলে ত্যাগ, সংগ্রাম, বিক্ষোভ আর মানবতার নাম স্বণাক্ষরে লেখা রয়েছে। 

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজ হাতে গড়া ছাত্রলীগ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছে অন্যসব সহযোগী সংগঠনের থেকে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। যেখানে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, তাঁতী লীগ এবং শ্রমিক লীগের সম্মেলন বছরের পর বছর না হওয়ার পরও তেমন কোনো মাথা ব্যাথা নেই আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার। 

কিন্তু ছাত্রলীগের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসাবে বরাবরই সংগঠনটিকে শেখ হাসিনা কলংকমুক্ত রাখতে সর্বাত্নক চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল করতে গিয়ে নানা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও রাজনৈতিক ব্যস্ততার মাঝেও ছাত্রলীগের জন্য আলাদা করে সময় বের করেছেন অতীতে, বর্তমানেও ভালোবেসে সময় দিচ্ছেন। 

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের পর সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের ৪ নেতা (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক এবং বাহাউদ্দিন নাসিম) ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী গত ১ মাসেও সুষ্ঠু সমাধান করতে না পারায় বেশ খানিকটা মনোক্ষুন্ন হয়েছেন শেখ হাসিনা। এ অবস্থায় কলংকমুক্ত ছাত্রলীগ গড়তে কতদিন সময় লাগবে জেনে দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ৪ নেতা ও ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে মাত্র ২ দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী শুক্রবারের মধ্যে ছাত্রলীগের চলমান সংকট সুষ্ঠুভাবে সমাধান করার এ আল্টিমেটাম দিয়েছেন তিনি। গণভবনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র ভোরের পাতাকে বিষয়গুলো নিশ্চিত করেছে। 

বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সূত্রটি আরো জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ত্রিদেশীয় রাষ্ট্রীয় সফর শেষে দেশে ফেরার পরই ছাত্রলীগের সমস্যা সমাধানের কতদূর জানতে চেয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ৪ নেতার মধ্যে একজনের সঙ্গে কথা বলেন। তখন তিনি শেখ হাসিনাকে জানিয়েছিলেন, ‘আপা (শেখ হাসিনা) আমরা মোটামুটি গুছিয়ে এনেছি। যারা বিতর্কিত তাদের বাদ দিয়ে এবং যারা টানা অবস্থান কর্মসূচীতে বিদ্রোহী হিসাবে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৫ দিন সময় লাগবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরপর ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর কাছে সর্বশেষ অবস্থার বিবরণ জানতে চাইলে, সমস্যার সমাধানে কি কি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সে বিষয়ে পরিষ্কার কোনো উত্তর দিতে ব্যর্থ  হয়েছেন শীর্ষ দুই নেতাই। কারণ তারা দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের ৪ নেতার ওপর দায়ভার চাপিয়ে নিজেদের রক্ষা করেছেন। 

পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বিতর্কিত ১৯ জনের  একটি তালিকাও রেখে আসেন শোভন -রাব্বানী। কিন্তু সেই তালিকা পেয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি শেখ হাসিনা। তাই সেটি প্রকাশ করার অনুমোদন দেয়া হয়নি। এমনকি আরো নতুন করে তালিকায় আসা কমপক্ষে ১৬ জনসহ মোট ৩৫ জন বিতর্কিতকে এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া গেছে তাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও ছাত্রলীগের এই কমিটিতে মোট ৬০ জনেরও বেশি বিতর্কিত রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদেরও বিষয়েও খোঁজ খবর নিয়ে  ছাত্রলীগকে পরিপূর্ণভাবে কলংকমুক্ত করতে সংগঠনের শীর্ষ নেতা ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের চূড়ান্তভাবে  একটি তালিকা প্রস্তুতির আল্টিমেটাম দিয়েছেন  শেখ হাসিনা। 

গণভবন সূত্র আরো জানিয়েছে, যদি আল্টিমেটামের এই সময়ের মধ্যে সমাধান করতে ব্যর্থ হন দায়িত্বপ্রাপ্তরা, তখন দায়িত্ব দেয়া হতে পারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রলীগের সোনালী দুঃসময়ের সাবেক সভাপতি ওবায়দুল কাদেরকে। তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত ৪ নেতাকে ব্যর্থ বলে ধরে নিয়েই প্রধানমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে দায়িত্ব দিবেন। যদিও ওবায়দুল কাদের ভোরের পাতার এ প্রতিবেদকে ফোন ব্যাক করে কয়েকদিন আগেই বলেছেন, ‘ছাত্রলীগ নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যাথা নেই। এটা জাহাঙ্গীর কবির নানকের বিষয়। তবে সমস্যা সমাধানে আপা (শেখ হাসিনা) আমাকে দায়িত্ব দিলে তা অবশ্যই নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে পালন করে দেখাবো।’

এদিকে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক দেশের প্রভাবশালী একটি গণমাধ্যম (যে গণমাধ্যমের খবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পড়েন না) রাজু ভাস্কর্যে টানা ১৮ দিন ধরে অবস্থান করা বিদ্রোহী পদবঞ্চিতদের ‘ছাত্রলীগই নয়’ বলে যে মতামত দিয়েছেন; তা নিয়ে চলছে নানামুখী কথাবার্তা ও সমালোচনা। পদবঞ্চিতরা দাবি করছেন,  ‘নানক ভাই কি বলতে চেয়েছেন তা আমরা বুঝতে পারি নাই।  উনার কথাই যদি সত্যি হয় তাহলে আমরা (পদবঞ্চিতরা) ছাত্রলীগ করি না, তবে কি করি? ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে এমনও অনেকেই ঠাঁই পেয়েছেন যারা জীবনে এর আগে কোনোদিন কোনো পদেই ছিলেন না। সংগঠনের গঠনতন্ত্রের বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত অনেকেই রয়েছেন। তাদের মতো বিতর্কিতরা যদি আপার ছাত্রলীগকে কলংকিত করেও ছাত্রলীগ পরিচয় দিতে পারে; তাহলে আমাদের কি দোষ?  আমরা বুক ফুলিয়ে বলতে পারি, শেখ হাসিনার ছাত্রলীগ করি বলেই আন্দোলন করে অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করে যাচ্ছি এবং ফলাফল ঘরে নিয়েই ফিরবো।’

পদবঞ্ছিতরা আরো বলেন,  ‘ছাত্রলীগের পরিপূর্ণ গঠনন্ত্রের নাম শেখ হাসিনা। আপা যদি আমাদের উঠে যেতে বলেন, তাহলে আমরা এখনই উঠে চলে যাবো। আমাদের আন্দোলন আপার ছাত্রলীগে ঠাঁই পাওয়া বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে। আপা যাদের দায়িত্ব দিয়েছেন সেই দায়িত্বপ্রাপ্ত ৪ নেতা ও ছাত্রলীগের শীর্ষ  দুই নেতার বিরুদ্ধে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। আমাদের অভিযোগ শুধু বিতর্কিদের নিয়ে। কিন্তু, যারা তাদের পদ দিয়েছে তাদেরও খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে হবে। কেননা ছাত্রলীগকে কলংকিত করার দায় তারা এড়াতে পারেন না। আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবো, যতদিন না পর্যন্ত আমাদের অভিভাবক শেখ হাসিনার ছাত্রলীগ কলংকমুক্ত হয়।  আমাদের নিজেদের যোগ্যতা ও মেধা, ত্যাগ ও পরিশ্রম মূল্যায়ণ করার আগে অবশ্যই ছাত্রলীগের প্রকৃতপক্ষে যারা বিতর্কিত রয়েছেন তাদের পদশূণ্য ঘোষণা করে তালিকা আকারে প্রকাশের দাবি জানাচ্ছি। এরপর অবশ্যই আমরা আন্দোলন থেকে সরে আসবো। কিন্তু যতদিন না পর্যন্ত বিতর্কিতদের প্রকৃতপক্ষে বাদ দেয়া না হবে ততদিন আন্দোল চলবে। আমরা  শেখ হাসিনার জন্য জীবন বাজি রেখে ছাত্রলীগ করেছি, কিন্তু যারা কোনোদিন ছাত্রলীগের মিটিং মিছিলেই উপস্থিত হয়নি; তারা কিভাবে ছাত্রলীগ হয়? এমন প্রশ্ন রাখেন অনেক পদবঞ্চিত।

এদিকে, এখন পর্যন্ত মোট ৬২ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যম অভিযোগ উঠে এসেছে। তাদের বাদ দিলেই ছাত্রলীগের সাময়িক কলংকমুক্তি ঘটবে বলে মনে করেন সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান নেতাকর্মীরা। তারা মনে করেন, শেখ হাসিনার পছন্দের ছাত্রলীগের কমিটিতে যারা বিতর্কিতদের পদ দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। কেননা তারা ছাত্রলীগে নিজেদের পছন্দের এবং অসাংগঠনিক লোক বসিয়েছেন,  এটা কখনোই কাম্য হতে পারে না। কারণ ছাত্রলীগের আদর্শের সাথে এটি কখেনোই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ছাত্রলীগের কয়েকজন শীর্ষ সাবেক নেতার সঙ্গে সাময়িক এই সমস্যা সমাধানের উপায় কি হতে পারে এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন ভোরের পাতার এ প্রতিবেদক। তিনজন সাবেক প্রভাবশালী নেতা এক কথায় বলেছেন,  ‘এই শোভন রাব্বানীর ছাত্রলীগ নিয়ে কথা বলার মতো রুচি বা সময় তাদের নেই। কারণ ছাত্রলীগের হারানো ঐতিহ্যকে বিতর্কিতদের ঠাঁই দিয়ে লুণ্ঠন করেছেন তারা। শেখ হাসিনার ছাত্রলীগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য মূল দায়ী হলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ৪ নেতা এবং শোভন রাব্বানী। প্রাণের ছাত্রলীগের এই অবস্থা সৃষ্টির জন্য তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এমনটা প্রত্যাশা করেন সাবেক অনেক ছাত্রলীগ নেতা। কারণ তারা সবাই শেখ হাসিনার প্রশ্নে আপোসহীন, তাই ছাত্রলীগকে কলংকমুক্ত দেখতে চান। 

 

ফলে সমস্যার সমাধানে তিনটি উপায় নিয়ে কথা বলেছেন ছাত্রলীগের সাবেক শীর্ষ কয়েকজন নেতা। তারা বলেন, ছাত্রলীগের চলমান সংকট নিরসনে জাহাঙ্গীর কবির নানক ভাইয়ের নেতৃত্বে আরো ৩ নেতা ব্যর্থ  হলে তাদের ভবিষ্যত রাজনীতির ক্ষেত্রে তা অবশ্যই মাইনাস পয়েন্ট হিসাবে যোগ হবে। কিন্তু তিনি নিজে দায়িত্ব নিয়ে প্রকৃত বিতর্কিতদের ছাত্রলীগ থেকে বের করে দিতে পারলে ভবিষ্যত আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে মূল্যায়িত হবেন। কেননা প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছে,  সরকারি কাজ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির চেয়ে মাঝে মাঝে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় ছাত্রলীগ। কেননা তিনি ছাত্রলীগটাকে মন থেকেই ধারণ করেন। 

 

নানক-রহমান-মোজাম্মেল এবং নাসিম ব্যর্থ হলে ছাত্রলীগের সমস্যা সমাধানের জন্য ওবায়দুল কাদেরকে দায়িত্ব দিলে তা একদিনের মধ্যেই সুষ্ঠুভাবে সমাধান হবে বলে মনে করেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা। 

সর্বশেষ যে পক্রিয়ায় ছাত্রলীগের এই সমস্যার সমাধান হতে পারে তা হচ্ছে, ছাত্রলীগের সর্বোচ্চ অভিভাবক ও পরিপূর্ণ গঠনতন্ত্র শেখ হাসিনা নিজে উদ্যোগী হয়ে যদি কোনো সিদ্ধান্ত দেন। তাহলে মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যেই সব সমস্যার সুষ্ঠুতম সমাধান হবে বলে মনে করেন প্রকৃতপক্ষে ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতাকর্মী ও দেশবাসী।

Ads
Ads