রূপপুরের বালিশকাণ্ড: স্বচ্ছ বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাই

  • ২০-মে-২০১৯ ১০:১৪ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন একটা বিষয় প্রায় নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, যত বড় প্রকল্প, যেন তত বড় দুর্নীতির বিলাসবহুল আয়োজন। তাই তো সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠলে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জন্য গ্রিন সিটি আবাসন পল্লির বালিশসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র অস্বাভাবিক মূল্যে কেনা ও তা ভবনে তোলার জন্য বাড়তি ব্যয়ের ঘটনায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। গতকাল সোমবার বিচারপতি তারিক উল হাকিম ও বিচারপতি মো. সরওয়ারদীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন। এর আগে এই একই প্রকল্পে কর্মকর্তাদের জন্য তৈরি আবাসিক গ্রিন সিটি ভবনের আসবাবপত্র কেনাকাটা ও সেগুলো ভবনে তোলার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ব্যয়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

নিঃসন্দেহে এটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত এবং এতে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সরকারি তথা জনগণের করের অর্থের অপচয় রোধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আমরা আশাবাদী। জানা যায়, রূপপুর আণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত রাশিয়ার নাগরিক ও দেশের কর্মকর্তাদের আবাসনের জন্য গ্রিন সিটি নামে ২০ ও ১৬ তলার দুটি ভবন তৈরি করা হয়। এসব ভবনের জন্য কেনা আসবাবপত্রের যেসব দাম দেখানো হয় তাতে যে কারও চক্ষু ছানাবড়া চড়কগাছ হয়ে যাবেই। এতে প্রতিটি বালিশ কেনার জন্য ৯ হাজার ৯৫৭ টাকা ও সেটি ভবনে তোলার জন্য সর্বোচ্চ ৭৬০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় দেখানো হয়। এছাড়া একটি ইলেক্ট্রনিক কেটলির দাম ৫ হাজার ৩১৩ টাকা ও সেটি ফ্ল্যাটে উত্তোলন ব্যয় ২ হাজার ৯৪৫ টাকা, একটি আয়রনের দাম ৪ হাজার ১৫৪ ও সেটি ফ্ল্যাটে তোলার খরচ ২ হাজার ৯৪৫ টাকা, ৯৪ হাজার ২৫০ টাকায় কেনা রেফ্রিজারেটর ফ্ল্যাটে উঠানোর খরচ ১২ হাজার ৫২১ টাকা এবং ১ লাখ ৫ হাজার টাকায় কেনা ওয়াশিং মেশিন ফ্ল্যাটে তোলার ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩০ হাজার ৪১৯ টাকা। এভাবে নানা আসবাবপত্রের দাম যেমন অনেক বেশি দেখানো হয়েছে, তেমনি সেগুলো ফ্ল্যাটে তোলার ব্যয় দেখানো হয়েছে আকাশচুম্বী। তবে বালিশের দাম ও তা তোলার খরচ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা তৈরি হয়েছে। এত বাড়াবাড়ি মূল্য ও তোলার ব্যয় দেখানো হয়েছে যে, বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই। যেখানে ইলেক্ট্রনিক ও অন্য আসবাবপত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা এসে ফ্ল্যাটে ফিটিং করে দিয়ে যায়, সেখানে এগুলোর উত্তোলন ব্যয় যা দেখানো হয়েছে তা যে পুকুরচুরি তাতে সন্দেহ নেই। আরও উদ্বেগের বিষয়, কেনাকাটার সঙ্গে জড়িত পাবনার প্রকৌশলীরা এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলছেন, মন্ত্রণালয় থেকেই দরপত্র আহ্বান ও কেনাকাটার অনুমোদন হয়েছে। কিন্তু তারপর মন্ত্রণালয়ের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। আর আগের মন্ত্রীর আমলের সিদ্ধান্ত বলেও এমন অনিয়মকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই।

সরকারি অর্থের অপচয়কে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। বিভিন্ন সময় রূপপুর প্রকল্পে কর্মরতদের পারস্পরিক যোগসাজশে তৈরি ঠিকাদারের টেন্ডার দেওয়া ও তাদের মাধ্যমে পণ্য কেনার কথা শোনা গেছে। স্বাভাবিক দামের কয়েকগুণ বেশিতে পণ্য কেনা ও ফ্রি ফিটিং করে দেওয়ার স্থলে এমন অস্বাভাবিক ব্যয়ে সেগুলো উত্তোলনের ঘটনা থেকে যোগসাজশে কেনাকাটার ধারণা পাওয়া যায়। তারা যে অনিয়ম সাজিয়েছেন তা তো রূপকথাকেও হার মানায়। সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম রোধে সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে জনগণের অর্থ তছরুপ বাড়বে বৈ কমবে না। কেন্দ্রটি চালু হওয়ার আগেই যারা একে কলঙ্কিত করছে অনিয়ম-দুর্নীতির মহোৎসবের মাধ্যমে, তারা যেন বিনা বিচারে কিছুতেই পার না পায় সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

Ads
Ads