বিশুদ্ধ পানির সংকট: ঢাকা ওয়াসাকে দুই ভাগ করার প্রস্তাব 

  • ১৯-মে-২০১৯ ১০:৪৬ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

সম্প্রতি ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কর্তৃক হাইকোর্টে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে রাজধানীর ৫৯টি এলাকার পানি বেশি দূষিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ওই তালিকার বাইরে আরও অনেক এলাকায়ই বিশুদ্ধ পানির সংকট নেই তা কী করে নিশ্চিত হই। শুধু বিশুদ্ধ পানির সংকটই নয়, পাশাপাশি পানির তীব্র অভাবও দেখা যাচ্ছে। একে তো বিশুদ্ধ পানির অভাব; তার ওপর গ্রীষ্মের দাবদাহে পানির অভাব- এ দুইয়ে মিলে নগরবাসী কী পীড়াদায়ক পরিস্থিতি পার করছেন, তা বলাই বাহুল্য। ফলে গত কয়েকদিন ধরেই ওয়াসার পানি নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছিল। শুরুতে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ওয়াসার পানিকে বিশুদ্ধ বলে দাবি করলেও পরে তাদের সে দাবি থেকে সরে আসে। কাজেই এখন রাজধানীসহ নারায়ণগঞ্জের নির্ধারিত এলাকায় নিরবচ্ছিন্নভাবে পানি সরবরাহের দায়িত্ব ওয়াসার। পানির প্রাপ্যতা সমস্যার পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির সংকট নিয়ে দিনের পর দিন গ্রাহকদের কেন দুর্ভোগ পোহাতে হবে- এর সঠিক জবাব এখন ওয়াসাকেই দিতে হবে।

আর এই জবাব প্রত্যাশার মাঝেই গত বৃহস্পতিবার ঢাকা সিটি করপোরেশনের মতো ঢাকা ওয়াসাকেও দুই ভাগ করতে বলল সংসদীয় কমিটি। বৈঠকে মন্ত্রণালয়কে এ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। মূল বিষয়টি হলো উন্নত সেবা প্রদান। সেটি এক ভাগ নাকি দুই ভাগ করে জোগানো হবে, সেটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত। সেবার মান বাড়লে নগরবাসী নিশ্চয়ই একে স্বাগত জানাবে। তবে সিটি করপোরেশন ভাগ করে দুই ভাগের মতো যদি সেবার মান না বাড়ে, তাহলে এতে সরকারের ব্যয়ই বাড়বে, কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলবে না বলেই আমরা মনে করি। 

নগরবাসীর একটাই চাওয়া তা হচ্ছে, নিরাপদ পানি ও জলাবদ্ধতামুক্ত নগরী। পানির পাইপকে নিয়মিত নজরদারিতে রেখে লিকেজ শনাক্ত করতে হবে। কারণ এসব ছিদ্র দিয়ে দুর্গন্ধযুক্ত অপরিষ্কার পানি ঢুকে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। সব দিক বিবেচনায় এনে বিশুদ্ধ, নিরাপদ এবং সুপেয় পানির জন্য জনসচেতনতা সব থেকে বেশি প্রয়োজন। খাবার পানিকে জনবান্ধব এবং সবার জন্য উপযোগী করে তুলতে হবে। পানির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে কোনো ধরনের অবহেলার অবকাশ নেই। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক ‘প্রমিজিং প্রগ্রেস : অ্যা ডায়াগনস্টিক অব ওয়াটার সাপ্লাই, স্যানিটেশন, হাইজিন অ্যান্ড প্রভার্টি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে দেশে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহকৃত পানির ৮০ শতাংশেই ডায়রিয়ার জীবাণুর (ই-কোলাই) উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। আর এতেই প্রমাণ হয়, সম্প্রতি ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কর্তৃক হাইকোর্টে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে রাজধানীর ৫৯টি এলাকার পানি বেশি দূষিত বলে উল্লেখ করার বিষয়টিও বাস্তব নয়।

এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি। দুঃখজনক হলো, দেশের ৯৮ শতাংশ মানুষ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় এলেও অনিরাপদ পানির কারণে তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার দুর্বলতায় স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন রোগ ও উপসর্গের প্রকোপ বাড়ছে এবং এর ফলে নষ্ট হচ্ছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। বিষয়টি গভীর উদ্বেগজনক বলেই আমরা মনে করি। এহেন প্রেক্ষিতে দূষিত পানির সংকট মোকাবিলায় আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে মানুষ যে বিকল্প উৎসের সন্ধান করবে, তারও উপায় নেই। কেননা, দেশে বোতলজাত ও কনটেইনার বিশুদ্ধ পানির নামে যা সরবরাহ করা হচ্ছে তাতেও ভোক্তাদের সঙ্গে ভয়াবহ প্রতারণা করা হচ্ছে।

তা ছাড়া সবাইর পক্ষে তো আর ওই বোতলজাত ও কনটেইনারের পানি কিনে পান করা সম্ভবও নয়। কাজেই রাজধানীতে পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পানির বিকল্প উৎস যেমন সন্ধান ও ব্যবহার করতে হবে, তেমনি ঢাকা ওয়াসার কার্যক্রম আরও বাড়াতে ও গতিশীল করতে হবে। এ মুহূর্তে ঢাকা ওয়াসাকে সরবরাহকৃত পানির বিশুদ্ধতা সংরক্ষণে মনোযোগ দিয়ে প্রয়োজনীয় কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যেকোনো মূল্যে হোক, বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এমনিতেই রাজধানীবাসীর জন্য ঢাকা ওয়াসার সরবরাহকৃত পানির মান নিয়ে প্রশ্ন আজকালের নয়, তা অনেক পুরনো।

ওয়াসার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, সেবার মান, দুর্নীতি, গ্রাহক সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি, অনিয়ম, সীমাবদ্ধতা, পানি সঞ্চালনের চারদিকে অব্যবস্থাপনার জাল ইত্যাদি বিষয়ে অনুধাবন করতে গেলে বলতে হয়, এভাবে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা সম্ভব নয়। রাজধানীসহ সারা দেশে কথিত মিনারেল ওয়াটারের নামে যেসব বোতলজাত পানি বিক্রি হচ্ছে, দু-একটি বাদে তার অধিকাংশই মানসম্মত নয়। দেশে বাজারজাতকৃত অধিকাংশ বোতল, কনটেইনার ও প্লাস্টিক প্যাকেটের পানিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত আয়রন, পিএইচ, ক্লোরিন, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম নেই বললেই চলে; বরং এসব পানিতে লেড, ক্যাডমিমাম, কলিফর্ম ও জিংকের অস্তিত্ব রয়েছে। ক্যাডমিমামযুক্ত পানি নিয়মিত পান করলে শরীরে পুষ্টির অসমতা দেখা দিতে পারে এবং মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারে। কাজেই ওয়াসা কর্তৃপক্ষের মতো তাদের সরবরাহকৃত পানি সুপেয় বা শতভাগ সুপেয় থাকা বড় কথা নয়! তাদের সর্বপ্রধান দায়িত্ব হলো গ্রাহকের হাতের মুঠোয় পর্যন্ত নিরাপদ ও জীবাণুমুক্ত সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়া।

Ads
Ads