ছাত্রলীগের অর্জন শূণ্যের কোঠায়, নতুন সম্মেলন চান শেখ হাসিনা

  • ১১-মে-২০১৯ ০৬:০৮ অপরাহ্ন
Ads

উৎপল দাস

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, একটি অনুভূতির নাম। যে নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিটি সংগ্রামের গৌরবময় ঐতিহ্যের ইতিহাস। সমৃদ্ধ ইতিহাস নিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আজ নানা প্রশ্নের সম্মুখীন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া সংগঠনে অনুপ্রবেশ, টেন্ডার, চাঁদাবাজি, হত্যাসহ নানা নেতিবাচক খবরের কারণে শিরোনাম হয়েছে দীর্ঘদিন। এরপর একটা সময় আদর্শিক ছাত্রলীগ চলে যায়  একটি সিন্ডিকেটের কবলে। সেই অদৃশ্য সিন্ডিকেটমুক্ত করতে স্বয়ং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও ছাত্রলীগের সর্বোচ্চ অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্ব তুলে নেন নিজের কাঁধে। কিন্তু তাতেও ছাত্রলীগের হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসে নি। এমনকি গত কয়েকটি কমিটির তুলনায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার ক্ষেত্রে এত বেশি সময় ক্ষেপন করছেন শেখ হাসিনার মনোনীত ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, তা নিয়ে ঘরে বাইরে সমালোচনার ঝড় বইছে। 

গত বছরের এই দিনে ছাত্রলীগের ২৯ তম সম্মেলনের পর এক বছর পূর্ণ হলেও এখনো পর্যন্ত শীর্ষ দুই নেতা কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে না পারাকে সবচে বড় ব্যর্থতা হিসাবে দেখছেন সবাই। এমনকি ছাত্রলীগের পদপ্রত্যাশীরাও হতাশ হয়ে গেছেন। শীর্ষ দুই নেতার পিছনে ঘুরতে ঘুরতে অনেকেই সর্বশেষ বিসিএস পরীক্ষাও দেননি, শুধু রাজনীতি করবেন বলে। কিন্তু কমিটি কয়েক মাস আগে হয়ে গেলে, পোস্ট পদবী না পেলেও বিসিএস পরীক্ষাটা ভালোভাবেই অনেকে দিতে পারতেন বলে জানিয়েছেন অনেকে। 

ভোরের পাতার সঙ্গে আলাপকালে একাধিক সাবেক ও বর্তমান ছাত্রলীগ নেতা বলেছে, শুধু কি পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে না পারার ব্যর্থতা? এছাড়াও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতা এখনো পর্যন্ত সারাদেশে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে গুছিয়েই আনতে পারেননি। এমনকি কয়েকটি উপজেলা কমিটি গঠন এবং বিলুপ্ত করার মধ্যেই তাদের সাংগঠনিক কাজ সীমাবদ্ধ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় সংবাদ মাধ্যমে কিছু প্রেস রিলিজ তারা পাঠিয়েছেন যেগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই শোক সংবাদ। সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় ফনি মোকাবিলায়ও ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার মধ্যে সমন্বয়হনীতা দেখা গেছে। এমনকি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগের দিন দুর্যোগ মোকাবিলায় কমিটি গঠন করা হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেকেই বলেছে, আমার বাড়ি তো বরিশাল। দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, কিন্তু সেখানে যাওয়ারই কোনো উপায় নেই। যদি তাদের সদ্বিচ্ছা থাকতো তাহলে ঘূর্ণিঝড়ের তিনদিন আগেই আমাদের কমিটির সবাইকে বরিশালে পাঠিয়ে দিতো। এমন অভিযোগ রয়েছে দুর্যোগ মোকাবিলায় গঠিত কমিটিতে ঠাঁই পাওয়া প্রায় সকল সদস্যদেরই। 

এছাড়া পহেলা বৈশাখের আগের রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে আগুন লাগিয়ে দিয়ে বৈশাখি কনসার্ট স্থগিত হওয়ার ঘটনায় ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির নেতাদের ইমেজ ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর মতো আচরণ করেছে। এ ঘটনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রথমে জানানো হলে, তিনি মনে করেছিলেন কোনো প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি এমন হীন কাজ করেছে। কিন্তু তদন্তে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দুই নেতার অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়টি সামনে চলে আসে। এরপর তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ডেকে শাসিয়েছেন। ভবিষ্যতে যেন এমন ভুলের কোনো পুনরাবৃত্তি ঘটে। ওই সময় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে কমিটি বিলুপ্ত করতেও বলেছিলেন। পরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে বিষয়টি মিটমাট হয় এবং গত ২২ এপ্রিলের মধ্যে ছাত্রলীগের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার আল্টিমেটাম দেন। 

কিন্তু সেই আল্টিমেটাম পার হওয়ার পরও কয়েকদফা বৈঠক করেও ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়নি। ছাত্রলীগের সাবেক কমিটির সভাপতি এম সাইফুর রহমান সোহাগ এবং সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইনের সঙ্গে সমঝোতা করে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। কিন্তু শেখ হাসিনার কথাও রেজওয়ানুল হক চৌধুরী এবং গোলাম রাব্বানী মানতে পারেননি। ফলাফল হিসাবে সাবেক দুই নেতার সঙ্গে তাদের সমঝোতা হয়নি। এখনো পর্যন্ত বিষয়টি তাই ঝুলে রয়েছে। 

এতো গেল ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার বিষয়টি। এছাড়া বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট হিসাবে পরিচিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি বিলুপ্ত করা নিয়েও কথা উঠেছে। যে অপরাধে জবি ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে, এরচেয়েও অধিক গুরুতর অভিযোগ থাকার পরও অনেক জেলা কমিটি নিয়ে কোনো কথা বলেন না সংগঠনের বর্তমান শীর্ষ দুই নেতা। 

ছাত্রলীগের একটি অংশ গত এক বছরেও কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে না পারার পরও শোভন রাব্বানীকে সমর্থন করে যাচ্ছেন। তারা বলছেন, এই সময়ে জাতীয় নির্বাচন এবং ডাকসু নির্বাচন গেছে।  তাই কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জাতীয় নির্বাচনে ছাত্রলীগের তেমন কোনো ভূমিকাই ছিল না। সারাদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব থেকেছেন অনেকে। রাজপথ বা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের তেমন দেখা যায়নি। খোদ আওয়ামী লীগ নেতারাই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মাঠে নামাতে ভয় পেতেন। কারণ আওয়ামী লীগকে বিতর্কিত করার জন্য এক ছাত্রলীগই যথেষ্ট।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বশেষ লন্ডন সফরের সময় যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তার কাছে ছাত্রলীগের বিষয়ে জানতে চান। তখন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ওদের (শোভন-রাব্বানী) কাছে আমি আসলে যা চেয়েছিলাম, তার কিছুই তারা করতে পারেনি। দুজনের বিরুদ্ধেই অভিযোগ রয়েছে বিস্তর। আমি এতদিন এসব নিয়ে তেমনভাবে ভাবতাম না। দেশে ফেরার পর কমিটি বিলুপ্ত করে দিয়ে নতুন সম্মেলন দিতেও পারি। তবে কাদেরর (ওবায়দুল কাদের) জন্য অনেক কিছুই করা সম্ভব হয় না। তবে এবার আর কোনো ভুল করলে ছাড় দেয়া হবে না। তখন এই কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন সম্মেলনের তারিখ জানিয়ে দেবো আমি (শেখ হাসিনা) নিজেই।  ভোরের পাতার কাছে লন্ডন থেকে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র বিষয়গুলো নিশ্চিত করেছে। 
 

Ads
Ads