তাকওয়া অর্জনের মাস রমজান

  • ৮-মে-২০১৯ ১০:০০ অপরাহ্ন
Ads

:: মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ ::

আজ পবিত্র রমজানুল মোবারকের ৩য় দিন। রহমতের দিনগুলো একেক করে কমে যাচ্ছে। রমজানে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা আসলে কি চাচ্ছেন তার বন্দার কাছে। আল্লাহ পাক চাচ্ছেন রমজানের রোজার মাধ্যমে বান্দা তাকওয়াপূর্ণ জীবন লাভ করুক।  

তাকওয়া কী?
তাওয়া  শব্দটি আরবী কুউওয়াতুন থেকে নির্গত। অর্থ শক্তি। তাকওয়া অর্থ সেই মানসিক শক্তি অর্জনকে বুঝায় যার মাধ্যমে একজন মুমিন বান্দাহ পাপ পঙ্কিলতার পরিবেশে থেকেও পাপের হাতছানি  থেকে বাঁচতে পারে। তাকওয়ার একটি ঘটনা বুখারী শরীফে রাসূল সা্  উল্লেখ করেছেন। এক যুবক তার প্রতিবেশি বোনের সম্মতিতেই ব্যাবিচারে লিপ্ত হবে। সকল প্রস্তুতি নেয়ার পর মেয়েটি আর্তনাদ করে উঠলো, ইন্নি আখাফুল্লাহ। আমি আল্লাহকে ভয় পাই। যুবক ধাক্কা খেলো। সত্যি তো! এই নির্জন স্থানে কেউ আমাদেরকে না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন। এই যে সামর্থ সুযোগ থাকার পরেও আল্লাহর ভয়ে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এর নাম তাকওয়া। 

চিন্তা করুন, দীর্ঘ সময় আমরা সিয়াম পালন করি। ইচ্ছা করলে লুকিয়ে হলেও আমরা খাবার খেতে পারি। কোন একজন পানিতে ঢুব দিয়ে পানি পান করতে পারে। সন্ধ্য যখন ঘনিয়ে আসে,  লোভনীয় সব খবার সামনে নিয়ে আমরা নির্ধারিত সময়ের অপেক্ষায় থাকি। একট আগেও আমরা খাবার গ্রহন করিনা। এরই নাম তাকওয়া। 

তাকওয়া অর্জনের মাস ব্যাপি প্রশিক্ষণঃ
মানুষ দুটি অঙ্গের মাধ্যমে সবচে বেশি গুনাহতে লিপ্ত হয়।
এক, মুখ
দুই, লজ্জাস্থান
মাহে রামজান আমাদেরকে এই দুটি অঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করার প্র্যাকটিস শেখায়। 

দিনের বেলায় অন্য সময়ে হালাল খাবার খাওয়ার অনুমতি রয়েছে। অনুমতি রয়েছে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে হালাল উপায়ে একত্রবাসের। কিন্তু মুমিন বান্দাহ আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে এই হালাল কাজটি পরিত্যাগ করে এই রমজান মাসে। এরই নাম তাকওয়া। এভাবে যে লোক আল্লাহর নির্দেশে হালাল কাজটি ছেড়ে দিতে পারে, তার জন্য চিরস্থায়ী হারাম কাজ পরিত্যাগ করা কতোইনা সহজ।

যে ব্যক্তি পানি পান করা ছাড়তে পারে তার জন্য মদ ছেড়ে দেওয়া কি খুব কষ্টের? যে লোক হালাল খবার ছেড়ে দেয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভয়ে সেতো সহজেই সুূদ ঘুস অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পত্তি গ্রাস করা ছেড়ে দিতে পারে। যে বান্দাহ আল্লাহর নির্দেশে নিজের স্থীকেও ছুয়ে দেখেনা, সেতো অনায়সেই ব্যাবিচার ছেড়ে দিতে পারবে। এই প্র্যাকটিস সারা মাস যাবত আমরা মুমিনরা করে থাকি। এই শিক্ষাটা যদি মুমিন বান্দাহরা অাত্মস্থ করতে পারে তাহলে একটি তাকওয়াপূর্ণ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ গঠিত হবে। মানুষ দুনিয়াতেই ফিরে পাবে জান্নাতি পরিবেশের নমুনা। রাসূল সা্ ইরশাদ করেছেন যে ব্যক্তি নিজের মুখ আর লজ্জাস্থান হেফাজতের নিশ্চয়তা দেবে, আমি তাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দিচ্ছি।

আল্লাহ  তায়ালা তাকওয়া অজর্নের জন্য বহুবার মানুষকে তাগিদ প্রদান করেছেন পবিত্র আল কুরআনের মাধ্যমে। যথা বলা হয়েছে- (হে ইমানাদারগণ তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে ভয় কর এবং তোমরা মুসলমান না হয়ে মৃতুবরণ করো না) সুরা আল ইমরান-১০২) অন্য আয়াতে বলা হয়েছে- (নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক সম্মানিত সে যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খোদাভীরু)। অন্য আয়াতে রয়েছে- (হে ইমানদারগণ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ্য করে আগামী দিনের জন্য কি প্রস্তুত করেছে, আল্লাহ তোমাদের কর্ম সম্পর্কে অবগত) সুরা হাশর-১৮। অন্য আয়াতে রয়েছে- (হে ইমানদারগণ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমরা সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও) সুরা তওবা-১১৯। অন্য আয়াতে রয়েছে- (নিশ্চয়ই আল্লাহ যারা মুত্তাকী এবং যারা সৎকর্মপরায়নশীল তাদের সাথে রয়েছেন) সুরা নাহল-১২৮। অন্য আয়াতে রয়েছে- (তোমরা সৎ ও তাকওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা কর তোমরা পাপ ও সীমালংঘনের কর্মে সহযোগিতা করনা তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠিন শাস্তি দাতা) সুরা মায়েদা-২। অন্য আয়াতে রয়েছে- (হে ইমানদারগণ তোমরা অাল্লাহকে ভয় কর যাতে তোমরা সফলতা অর্জন করতে পার। সুরা বাকারা-১৮৯। অন্য আয়াতে রয়েছে- (হে নবী আপনি আল্লাহকে ভয় করুন এবং আপনি কাফের ও মুনাফিকদের অনুসরণ করবেন না, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও মহাজ্ঞানী। সুরা আহযাব-১। এছাড়া ও অসংখ্য আয়াত রয়েছে যা দ্বারা আল্ল¬াহ তায়ালা মানব জাতি এমন কি নবীকেও তাকওয়া অর্জনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। যা দ্বারা তাকওয়া অর্জনের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা বুঝা যায়। কেন না তাকওয়া অর্জন ছাড়া একজন মানুষ মুমিনই হতে পারে না। 

তাকওয়া দ্বারা মানুষের গোটাজীবন পরিচালিত হয়। তাই যার মাঝে তাকওয়া নেই সে তার গোটা জীবন কুফরী অবস্থায় অতিবাহিত করে। পক্ষান্তরে যার মাঝে তাকওয়া রয়েছে তার গোটাজীবন পরিচালিত হয় মহান আল্লাহ  প্রদত্ব বিধান ও রাসূল (সা:) প্রদর্শিত আদর্শ মোতাবেক। তাই মানুষকে জান্নাত লাভ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেতে হলে সর্ব প্রথম তাকওয়া অর্জন করতে হবে। কেননা তাকওয়া দ্বারাই প্রতিটি মানুষ স্ব-মহিমায় অবস্থান করতে পারে। তাকওয়া দ্বারা শুধু পরকালে লাভ রয়েছে এটাই শেষ কথা নয়। পার্থিব সুখ-শান্তি বজায় রাখতে হলে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তাকওয়া অর্জন করা। তাকওয়া অর্জন করার গুরুত্ব ও তাৎপর্য কতটা ব্যাপক তা সূক্ষ্মভাবে আল কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের দিকে লক্ষ্য করলে স্পষ্ট হয়ে যায়। যেমন পূর্ববর্তী যত নবী ও রাসুল এ ধরায় আগমন করেছেন তাঁরা সকলেই তাঁর স্বীয় জাতীকে সর্বপ্রথম যে দাওয়াত পেশ করেছিলেন তার মধ্যে আল্ল¬াহকে উপাস্যরূপে গ্রহণ এবং তাকওয়া অর্জনই ছিল মূল বিষয়। যথা হযরত হুদ (আ:) এর সম্পর্কে বলা হয়েছে- (স্মরণ করুন সে সময়ের কথা, যখন হুদ তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন তোমরা কি তাকওয়াশীল হবে না?) সুরা শুয়ারা-১২৪। অন্য আয়াতে হযরত সালেহ (আ:) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে- (স্মরণ করুন সে সময়ের কথা যখন সালেহ (আ:) তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন তোমরা কি তাকওয়া অবলম্বন করবে না। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য বিশ্বস্ত রাসূল। তোমরা আল্ল¬াহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর)। সুরা শুয়ারা-১৪২। তেমনি অন্য আয়াতে হযরত লুৎ (আ:) এর সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে- (লুৎকে তার সম্প্রদায় মিথ্যা প্রতিপন্ন করে যে রাসূল হিসেবে এসেছিল। যখন সে তাঁর সম্প্রদায়কে তোমরা কি মুত্তাকী হবে না? আমি তোমাদের নিকট বিশ্বস্ত রাসূল। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর)। সুরা শুয়ারা-১৬১। অন্যত্র হযরত শোয়াইব (আ:) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে- (স্মরণ করুন সে সময়ের কথা যখন শোয়াইব (আ:) তোমরা কি মুত্তাকী হবে না? আমি তোমাদের নিকট বিশ্বস্ত রাসূল। তোমরা আল্ল¬াহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। সুরা শুয়ারা-১৭৭।

পৃথিবীতে চুরি-ডাকাতি থেকে মুক্ত থাকতে পুলিশ চৌকিদার রাখা হয়। দোকান পাট সংরক্ষণ রাখতে সার্কিট ক্যামেরা, স্যাটেলাইট ও উন্নততর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এ সকল অন্যায়ের জন্য কোট-কাচারী, জেল, উকিল, জজ ইত্যাদি নিযুক্ত করা হয়। আর এ সকল তখন প্রয়োজন হবে না যখন প্রতিটি মানুষ একটি বিষয় বা একটি চরিত্র অর্জন করতে সক্ষম হবে তা হচ্ছে তাকওয়া। বর্তমান যুগে মারামারি, হানাহানি, চুরি-ডাকাতি, গুন্ডামী, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, সুদ-ঘুষ, কেলেঙ্কারী, করফাকি, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, কর্মেফাঁকি এ সকল বিষয় অহরহ চলছে। আর যার প্রতিরোধ সরকার হরেকরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা সত্ত্বেও এর কোন সমাধান করতে পারছে না, কিংবা পারবে বলে আশা করা যায় না। তবে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ব একটি পদক্ষেপই পৃথিবীর যাবতীয় দুর্নীতি ও কুকর্ম বিলুপ্ত করতে সক্ষম তা হচ্ছে- মানুষকে তাকওয়াবান হতে হবে। যদি কোন মানুষের মাঝে খোদাভীতি থাকে তাহলে সে কোন প্রকার অশ্লীলতা, দুর্নীতি বা গোনাহের কাজে জড়িত হতে পারে না। এটই হল তাকওয়া। রমজানের মূল প্রশিক্ষন মুমিন বান্দা যেন রোজা ও সিয়াম সাধনার মাধ্যমে তাকওয়াপূর্ণ জীবন লাভ করে মুত্তাকী হয়ে ইহকালিন ও পরকালিন সফলতা লাভ করতে পারে।

লেখক: আলেমেদ্বীন, সাংবাদিক ও বহুগ্রন্থপ্রণেতা।

Ads
Ads