শাহ্‌ সুজা মসজিদ, মোগল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন

  • ২৩-Apr-২০১৯ ০৮:৫২ অপরাহ্ন
Ads

:: মাছুম কামাল ::

শাহ্ সুজা মসজিদ, মোগল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। সম্রাট আওরঙ্গজেবের দ্বিতীয় পুত্র শাহ্ সুজার নামে এর নামকরণ করা হয়েছে। কুমিল্লা নগরীর মোগলটুলী এলাকায় অবস্থিত এই মসজিদ আনুমানিক  ৩৬০ বছর আগেকার স্মৃতি বহণ করে দাঁড়িয়ে আছে।

কুমিল্লায় এমনকি ভারতীয় উপমহাদেশে অবস্থিত সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদগুলোর একটি এই শাহ্ সুজা মসজিদ। বর্তমানে এই মসজিদে প্রায় ১২০০-১৪০০ মুসুল্লি একত্রে নামাজ আদায় করতে পারেন।

মসজিদের গায়ের নামলিপি অনুযায়ী ১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দে এটি নির্মাণ করা হয়। শাহ্ সুজার নাম অনুযায়ী নামকরণ করা হলেও আদতেই এটি শাহ্ সুজা কর্তৃক নির্মিত কিনা তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। এ ব্যাপারে দু'টি মতভেদ রয়েছে। 

প্রথম মতটি হল: মসজিদের শিলালিপি অনুযায়ী এবং মসজিদটির প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ কৈলাসচন্দ্র সিংহ তার রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস গ্রন্থে (৯৪-৯৫ পৃষ্ঠা) উল্লেখ করেছেন শাহ্‌ সুজার বন্ধু ত্রিপুরার তৎকালীন মহারাজা গোবিন্দমাণিক্য বন্ধু শাহ্‌ সুজার নাম চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য নিজের নিমচা তরবারি ও হিরকাঙ্গুরীয় বিক্র‍য় করে সংগ্রহীত অর্থ দ্বারা মসজিদটি নির্মাণ করেন ও শাহ্‌ সুজার নামে নামাঙ্কিত করেন।

অপর মতটি হল: শাহ্ সুজা ত্রিপুরা বিজয় করে তার বিজয় স্মারক হিসেবে মসজিদটি নির্মাণ করেন। তবে, দ্বিতীয় মতটির তুলনায় প্রথম মতটিই অধিক গ্রহণযোগ্য। কারণ, শাহ্ সুজার ত্রিপুরা বিজয় সম্পর্কে প্রায় কিছুই ইতিহাসে উল্লেখ নেই। কিন্তু, মতভেদ যা'ই থাকুক না কেনো, মসজিদটি যে অত্যন্ত প্রাচীন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

মসজিদের বাইরের আয়তাকার মাপে এটির দৈর্ঘ্য ১৭.৬৮ মিটার এবং প্রস্থ ৮.৫৩ মিটার, প্রাচীরগুলো ১.৭৫ মিটার পুরু। মসজিদের চারকোনে ৪টি বুরুজ রয়েছে যা উপরের দিকে কার্ণিশ পর্যন্ত উঠে গেছে, এর শীর্ষে রয়েছে ছোট একটি গম্বুজ। মসজিদের পূর্ব পাশের প্রাচীরে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ পাশে একটি করে খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার রয়েছে। প্রবেশদ্বারের উভয় পাশে ও উপরে প্যানেল নকশা অলঙ্কৃত রয়েছে। কিবলা প্রাচীরে রয়েছে তিনটি মেহরাব রয়েছে। প্রধান মেহরাবটি বড় এবং অধিক আকর্ষণীয়। এটি ফুল, লতা-পাতা ও জ্যামিতিক নকশা দ্বারা শোভিত। দুইটি পাশ্ব খিলান দ্বারা মসজিদের অভ্যন্তর মোট তিন ভাগে বিভক্ত।

এছাড়াও মসজিদের ছাদে অষ্টকোনাকৃতির ড্রামের উপর নির্মিত তিনটি গম্বুজ রয়েছে। মাঝের গম্বুজটি বড় এবং এর গায়ে চাঁদ-তারা নকশা দ্বারা শোভিত। গম্বুজগুলোর শীর্ষদেশ পদ্মনকশা ও কলসচূড়া দ্বারা অলঙ্কৃত করা হয়েছে। এর কার্ণিশের নিচের অংশে রয়েছে অত্যন্ত সুক্ষ্ম মারলোনের নকশা। 

মসজিদের অভ্যন্তরের মিনারে অবস্থিত একটি শিলালিপি হতে জানা যায়, ১৮৮২ সালে হাজী ইমামউদ্দিন কর্তৃক মসজিদটি সংস্কার  ও ৭.৩২ মিটার প্রশস্ত একটি বারান্দা মসজিদের সম্মুখে নির্মিত হয়। জনৈক মুসলমান কর্তৃক এমন একটি কথা প্রচলিত আছে যে, অনেক বছর পূর্বে ত্রিপুরার রাজার দেওয়ান সরকার কর্তৃক ওয়াকফ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার জন্য মসজিদের গায়ে সংযুক্ত নামফলকটি তুলে অদূরেই গোমতী নদীতে ফেলে দেন।

মতভেদ থাকুক, থাকুক জনশ্রুতিও। আয়তনের ক্ষুদ্রতা কিংবা সংস্কারের ফলে মসজিদটির মূল সৌন্দর্য কিছুটা নষ্ট হলেও শাহ্‌ সুজা মসজিদ মোগল আমলের এক অভূতপূর্ব নিদর্শন। এর সুক্ষ্ম কারুকাজ,  নির্মাণশৈলী আজও মোগলদের রুচিবোধ এবং আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে উজ্জ্বল হয়ে আছে, থাকবে।

Ads
Ads