মুজিবনগর দিবস: বাঙালি জাতিসত্ত্বার মাইলফলক 

  • ১৭-Apr-২০১৯ ১০:১৩ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বুধবার যথাযোগ্য ভাবগাম্ভীর্য ও মর্যাদার সঙ্গে পালিত হলো ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। এটি হচ্ছে বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের পথে অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখাতে একটি মাইলফলক স্থাপনের দিন। ১৯৭১-এর এই দিনেই পাকিস্তানের কারাগারে আটক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি এবং সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক করে গঠিত বিপ্লবী সরকার মেহেরপুর বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে শপথগ্রহণ করে। স্থান হিসেবে যা ‘মুজিবনগর’ এবং দিন হিসেবে যা ‘মুজিবনগর দিবস’ হিসেবে ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হয়ে আছে। এই সরকারই হচ্ছে বাংলাদেশের ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের বৈধ সরকার, যারা মুক্তিযুদ্ধকে সংঘটিত করেছিল এবং বিজয় অর্জন পর্যন্ত তার স্থায়িত্ব ছিল। যে সরকার মুক্তিযুদ্ধ, রাজনৈতিক কর্মকা-, কূটনৈতিক ও প্রচার ক্ষেত্রে বিশ্ব জনমত গঠন এবং এক কোটি উদ্বাস্তুর পুনর্বাসন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করেছিল। সেই মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বদানকারী জাতীয় ৪ নেতাসহ ওই সরকার পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার প্রতি রইল আমাদের গভীর শ্রদ্ধা। 

কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের এমএনএ এবং এমপিএদের অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে মুক্তিযুদ্ধ ও সরকার পরিচালনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয়। এই মন্ত্রিপরিষদ এবং এমএনএ ও এমপিএরা ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করেন। সে সরকারে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়। তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ (পরবর্তীকালে বিতর্কিত ও কুখ্যাত) ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য নিয়োগ করা হয়। ১১ এপ্রিল এম এ জি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। এরপর ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ পূর্ব ঘোষণা মোতাবেক কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরে বৈদ্যনাথতলার এক আমবাগানে মন্ত্রিপরিষদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের শুরুতেই বাংলাদেশকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ রূপে ঘোষণা করা হয়। এরপর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি একে একে প্রধানমন্ত্রী ও তার তিন সহকর্মীকে পরিচয় করিয়ে দেন এবং নতুন রাষ্ট্রের সশস্ত্রবাহিনীর প্রধান হিসেবে কর্নেল এম এ জি ওসমানী এবং সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ পদে কর্নেল আবদুর রবের নাম ঘোষণা করেন। এরপর সে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ পাঠ করা হয়। এই ঘোষণাপত্রেই বলা হয়, ‘সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি থাকিবেন।’ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার পরও নতুন সংবিধান প্রণীত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই ঘোষণাপত্র সংবিধান হিসেবে কার্যকর ছিল।

আমরা মনে করি, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় ৪ নেতাসহ যারাই নেতৃত্ব দিয়েছেন মুক্তি সংগ্রামে-যুদ্ধক্ষেত্রে, জাতি গঠনে- ইতিহাস তাদের যে স্থান দিয়েছে সে মতোই তাদের প্রত্যেককেই যথাযোগ্য সম্মান দিতে হবে। মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসের মাইলফলক ঘটনা ও দিবসগুলোকে যথাযথ মর্যাদায় স্মরণ, তাৎপর্য অনুধাবন এবং নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করা আমাদের ওপর ঐতিহাসিক দায় বর্তায়। আজকে যারা এই মুজিবনগর দিবসকে উপেক্ষা করছেম, মনে রাখতে হবে তারা এ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী নয়। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসের প্রমাণ হিসেবে এই মুজিবনগর দিবসকেও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করতে হবে। 

Ads
Ads