বিএনপি-জামায়াত মনে করে আওয়ামী লীগে দগদগে ঘা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে: রাশেক রহমান

  • ১৭-Apr-২০১৯ ১০:০২ অপরাহ্ন
Ads

রাশেক রহমান, শুধু তরুণ প্রজন্মের কাছেই নয় সবার কাছেই অতি প্রিয় মুখ। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সামাজিক, আঞ্চলিক ও আন্তজার্তিক পরিম-লেও স্বীয় মেধা, যোগ্যতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন। নিজেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার আদর্শে বলীয়ান একজন আওয়ামী লীগার হিসাবেই মানুষ তাকে চেনে। টেলিভিশন টক শো থেকে শুরু করে নিজ এলাকা রংপুরের মিঠাপুকুরের মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্য একজন সম্ভবনাময় রাজনীতিবিদ। তরুণ এই রাজনীতিবিদ গতকাল বুধবার ভোরের পাতার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় মেতেছিলেন। কথা হয়েছে সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক নানা বিষয়ে। আলাপচারিতার চুম্বক অংশ নিয়েই এই সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন ভোরের পাতার সিনিয়র প্রতিবেদক উৎপল দাস

আলাপচারিতার শুরুতেই উঠে আসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অনুপ্রবেশের বিষয়টি। রাশেক রহমান বলতে শুরু করলেন, অনুপ্রবেশ শব্দটির ব্যাপ্তি অনেক বৃহৎ। কিছু মানুষ সত্যিকার অর্থেই বুঝতে পেরেছে জননেত্রি শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের জন্য কিছু করছে এবং করতে চায়। স্বাধীনতা সংগ্রাম ও যুদ্ধে আওয়ামী লীগই একমাত্র দল যে দলটি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকই অন্য রাজনৈতিক মতাদর্শের বিশ্বাসী থাকলেও তাদের যখন দৃষ্টি উন্মোচিত হয়েছে তারা তখন আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে। এটাকে অনুপ্রবেশ বলা হয়ত যাবে না।

রাশেক রহমান খুব স্পষ্টভাবে বলেন, ‘অনুপ্রবেশ বলতে আমি এমন একজনকে বুঝাতে চাই যে ব্যক্তি প্রেট্রোল বোমা মেরে মানুষ হত্যা করেছে, যিনি নিজেকে বাঁচাতে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন অথবা আদর্শিক কোন পরিবর্তন তার হয়নি, বরং আপাতত ভালো থাকার জন্য যারা আওয়ামী লীগে যোগদান করেছে তারাও অনুপ্রবেশকারীর ভালো উদাহরণ হতে পারে। এছাড়া একজন ভিন্ন রাজনৈতিক দল জামায়াত বা বিএনপির সদস্য হওয়া স্বত্বেও কোনো অর্থপিপাসু বা লোভী ব্যক্তির হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য আওয়ামী লীগের পাশে দাঁড়িয়েছেন তাদেরকেই অনুপ্রেবশকারী বলতে পারি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সত্যিকারের যে মূলবোধ সামাজিক ন্যায় বিচার বা ধর্ম নিরপেক্ষতার বিষয়গুলো যারা ছলে বলে কৌশলে নষ্ট করছে তাদেরকেও অনুপ্রবেশকারী বলা যেতে পারে।’

রাশেক রহমান বলেন, ‘এখন দেশে টেলিভিশনের বাইরে বিএনপি নাই, রাজনীতির মাঠে জামায়াতে ইসলামী নামে দলটি নাই। এখন সবাই আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগ। তাতে করে যেটা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ বনাম জনগণ। কেননা প্রগতিশীল বিরুদ্ধ পক্ষ না থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এটা কখনোই কাম্য নয়।’ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চালানো যেতেই পারে বলে মনে করেন রাশেক রহমান। কিন্তু যুগপৎভাবে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রে, সরকারে, সমাজে এবং রাজনৈতিক/দলীয় ক্ষেত্রে। যখন এই সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুদ্ধি অভিযান হয়ে যাবে। শুদ্ধি অভিযানের নামে যখন অভিযান শুরু করবেন, তখন বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা তিনি তার অবস্থানে ঠিক থাকলেও তার আশেপাশের মানুষজন সেখান থেকে ফায়দা লুটতে পারেন বলেও মনে করেন এই তরুণ রাজনীতিবিদ। তাই সুশাসনের অবস্থাটা যদি সুদৃঢ় করা যায়, যা আপদদৃষ্টিতে দেখা যায় না, সেটা ঠিক করা গেলেই শুদ্ধি অভিযান সফল হয়ে যাবে। বলায় বাহুল্য বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস প্রশংসনীয় এবং অভূতপূর্ব। ঐক্যবদ্ধভাবেই আমাদের তাকে সহযোগিতা করতে হবে। 

জনগণ বনাম আওয়ামী লীগ বিষয়টি আরো সুস্পষ্টভাবে বুঝাতে গিয়ে রাশেক রহমান নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘কোটা তো শুধু আওয়ামী লীগপন্থী ছেলেমেয়েদের দাবি ছিল না। এটা ছিল দলমত নির্বিশেষে একটা দাবি। এই আন্দোলনের কিছু কিছু ক্ষেত্রে এখনও বিভ্রান্তির জায়গা রয়েছে এবং এই ক্ষেত্রে নিরাপদ সড়ক গড়ে তোলার জাতীয় ঐক্য এখনও সৃজিত হয়নি। আর এজন্য কথা শেষ করতে চাই বিখ্যাত গায়ক মান্না দের বিখ্যাত একটি গানের দুটি লাইন দিয়ে-

“এই কূলে আমি আর ঐ কূলে তুমি মাঝখানে নদী ঐ বয়ে চলে যায় ...।” টানা তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে এবং দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে এ বিষয়ে বলতে গিয়ে রাশেক রহমান জানান, বাংলাদেশে অভূতপূর্ব উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি হয়েছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশে যে দলই রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল তাদের সময়ের সাথে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নের তুলনা করাটাই হবে অন্যায়। আওয়ামী লীগ সরকার এত বেশি উন্নয়ন করেছে যে তুলনা করার কোনো সুযোগ নাই। তবে একটা কথা আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, শেখ হাসিনার নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ সরকার দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসেছিল ২০০৯ সালে, আর এখন ২০১৯ চলছে। এই দশ বছরে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান কি কি অপকর্ম করেছে সেই সময়ের ১৬ বছরের ছেলেটির খুব বেশি মনে থাকার কথা নয়।

এটার জন্য দায়ী আমাদের কিছু চর্চা। আমরা আসলে সংবাদের সঙ্গে, পত্রপত্রিকার সঙ্গে তেমনভাবে থাকি না। সুনিদির্ষ্টভাবে এ বিষয়ে কাউকে আপনি দায়ী করতে পারবেন না। তবে বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, বিএনপি-জামায়াত, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের সময়কালে আপনাদের নিশ্চয় সিরাজগঞ্জের পূর্ণিমা রানী শীলের কথা, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা, একসঙ্গে ৫০০ জায়গায় বোমা হামলা, সংখ্যালুঘুদের বিতারিত করা, তাদের মা বোনদের ধর্ষণ করা, আহসানউল্লাহ মাস্টার, শাহ এম এস কিবরিয়া হত্যাকা-, ব্রিটিশ হাইকমিশনা আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলা কথা। এসব আপনার আমার মনে আছে। কিন্তু আজকে যাদের নিয়ে আমরা ভবিষ্যত রাজনীতির কথা ভাবছি তারা কি সব মনে রেখেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই সে বিষয়গুলো সম্পর্কে কতটুকু সম্পৃক্ত করতে পেরেছি, সে বিষয়ে প্রশ্ন রাখার সুযোগ রয়ে যায়। আর সেই সুযোগেই নতুন প্রজন্মের অনেকে বলে বসে, প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়ন তো হওয়ারই কথা। তারা বিশেষভাবে দেখতে এটাকে দেখতে চায় না।

এই জায়গাটায় আমাদের বিশ্বাসের পরিবর্তন জরুরি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আগের মতোই বলতে হয়, বঙ্গবন্ধু ও জননেত্রী শেখ হাসিনার আদর্শ ও নেতৃত্বে বিশ্বাসী, প্রকৃতপক্ষেই আওয়ামী লীগকে ভালোবাসে; এমন সব মানুষকে  মাঝে রাজনীতির মাঠে ছড়িয়ে দিতে হবে। যাতে করে একাত্তরের মতো একটা গণজাগরণ আবারো মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়। এই জাগরণের চর্চা যদি শুরু না হয়, সত্যিকার অর্থে কোনো পরিবর্তন সম্ভব না। ধর্মনিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রাশেক রহমান বলেন, ‘ধর্মনিরপক্ষেতা একটি চর্চার বিষয়, কর্ষনের বিষয়। একজন কৃষক যেমন চাষ করেন, তেমনি ধর্মনিরপেক্ষতার বীজ বুপন করতে হয়; তাহলে যারা ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে তাদেরকে মাঠে প্রান্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে এটা করা কখনোই সম্ভব নয়।’

সাম্প্রতিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রাশেক রহমান বলেন, সমাজ বড্ড অশান্ত হয়ে আছে। সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার কারণেই অশান্ত সড়ক , নুসরাতের মতো লাখো নুসরাত আমাদের আশে পাশের লোকজন দ্বারাই নির্যাতিত হচ্ছে। তারা বিচার পাচ্ছে না। এই অশান্তির জায়গাগুলো যদি দূর না হয়- ‘সফল হবেন তবে বড় অক্ষরে সফল হবেন না, ছোট অক্ষরে হবেন।’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব নিয়ে বলতে গিয়ে রাশেক রহমান বলেন, ‘আপনি যদি কোনো সমাজের প্রতিবাদী সত্বাকে দমন করতে চান, তাহলে প্রথমে যে কাজটি করতে হবে সেটি হচ্ছে সকলকে কোনো না কোনোভাবে, চকমকে বিজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে বিলাস সামগ্রী ক্রয় ও ইকুয়াল মান্থলি ইন্সটালমেন্টের ভিত্তিতে ঋণ দিয়ে ব্যস্ত রাখতে হবে। তখন প্রতিবাদ করার জন্য রাস্তায় কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না।

মানুষ এখন ঘরে বসেই প্রতিবাদ করতে পারে, কেননা এটা করতে গেলে তার কর্মক্ষেত্রে কোনো বাধাগ্রস্ত হয় না। তাই তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে গতিময় জীবনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেই বেছে নিচ্ছে। এটাকে ইতিবাচক হিসাবেও নেয়া যেতে পারে। কেননা গঠনমূলক উপলক্ষ্য ছাড়া এখন মানুষকে আর একত্রিত করা যাবে না।কিন্তু আপনারা তাকিয়ে দেখুন, ২০১৫ সালের টানা ৯০ দিনের পেট্রোল বোমা হামলার সময় জনগণকে বিএনপি-জামায়াত সম্পৃক্ত করতে পারেনি। ফলে তাদের সকল ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে।’

রাশেক রহমান আরো বলেন, ‘এই সমাজে দুই ধরণের লোক বিএনপি করছে এখন। তাদের মধ্যে একদল মন্ত্রী, এমপি হওয়ার জন্য, ব্যবসা করার জন্য। আরেক দল নীতিগত বা আদর্শগতভাবে আওয়ামী লীগের বিরোধী হওয়ার কারণে। আপনারা এবার স্থানীয় সরাকার নির্বাচনে (উপজেলা  পরিষদ) দেখুন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ফলে আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগে লড়াই হয়েছে। ফলে কিছু বিশ্ঙ্খৃলা হয়েছে। এই সময়টাতে বিএনপি-জামায়াতপন্থী আওয়ামী বিরোধীরা গ্যালারিতে বসে হাতহালি দিয়েছে। তারা মনে আগামীকালের কথা না ভেবে দীর্ঘমেয়াদে মনে করছে, আওয়ামী লীগে বোধহয় একটা বিশাল সংঘাতের ক্ষত, দগদগে ঘা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ 

নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রাশেক রহমান বলেন, ‘আমি মনে করি রাজনৈতিক কর্মীরা আমাকে মনে রাখুক। আমার পরিবারের প্রায় সবাই সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন এবং আছেন। তারা সবাই নিজ নিজ অবস্থানে সফল। আমার পরিকল্পনা হচ্ছে, জাতীয়, আঞ্চলিক যেকোনো সংকট মোকাবিলায় একজন প্রাসঙ্গিক মানুষ- নিজেকে এই অবস্থানে নিয়ে যেতে পারলেই আমি নিজেকে অনেক সফল মনে করবো। অর্থাৎ সংকটে অথবা সমাধানে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারাকে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন একজন সফল রাজনিতিক হয়ে প্রকাশিত হওয়ার ক্ষেত্রে।’

Ads
Ads