নুসরাত হত্যাকাণ্ড: অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা এখনও জামায়াত নেতা!

  • ১৬-Apr-২০১৯ ০১:৩৭ পূর্বাহ্ণ
Ads

ভোরের পাতা ডেস্ক

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির হত্যার পর একে একে বেরিয়ে আসছে অনেক কিছুই। অধ্যক্ষ ও প্রশাসনের অনিয়ম-দুর্নীতি, জেলার অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, রাজনৈতিক নেতাদের দুর্বৃত্তায়নসহ বেশকিছু বিষয় এখন সামনে এসেছে। ফুলগাজীসহ পুরো ফেনীতে এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। বাতাসে উড়ছে গুজব আর বিভ্রান্তিকর তথ্যও। নুসরাত হত্যাকে পুঁজি করে সুবিধাবাদীরাও এখন মাঠে। আগের বিরোধও সামনে আনছেন কেউ কেউ। যে যার মতো করে সুবিধা নিচ্ছেন। তবে সব ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও জামায়াত নেতা সিরাজ-উদ-দৌলার অপকর্ম। 

মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, অভিভাবক কমিটির সদস্য ও স্থানীয় রাজনীতিবিদরা জানান, আশির দশকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির মাধ্যমে জামায়াতের রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। পরে জামায়াতের রোকন হন। ২০১৬ সালের দিকেও তাকে জামায়াতের মিছিল-সমাবেশে দেখা যেত। পরবর্তী সময়ে জামায়াতের সভা-সমাবেশে তাকে দেখা না গেলেও দলের জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তবে এতকিছুর পরও জামায়াত থেকে এখনও সিরাজকে বহিস্কার করা হয়নি। এমনকি উপজেলা জামায়াতের বড় একটি অংশ এখনও তার পক্ষে কাজ করছে। 

এ বিষয়ে উপজেলা জামায়াতের আমির কলিম উল্যাহ  বলেন, সিরাজকে অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০১৬ সালে জামায়াত থেকে বহিস্কার করা হয়। জামায়াতের সঙ্গে এখন তার আর কোনো সম্পর্ক নেই। তবে তাকে বহিস্কারের কোনো কাগজ কিংবা প্রমাণ দেখাতে পারেননি তিনি। কলিম উল্যাহ আরও বলেন, জামায়াত কখনোই লিখিতভাবে বহিস্কারাদেশ দেয় না। মৌখিকভাবে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জামায়াতের একটি পক্ষ এখনও সিরাজের পক্ষে কাজ করছে বলে যে অভিযোগ পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে উপজেলা জামায়াতের আমির বলেন, এটি সত্য নয়। অধ্যক্ষ জেলে যাওয়ার আগেও জামায়াতের নেতাকর্মীদের দেখলে তিনি গালি দিতেন। তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন।

অধ্যক্ষের পক্ষে কাজ করতে অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ :নুসরাতকে শ্নীলতাহানির মামলায় সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ যখন জেলে, তখন তার স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে দেন-দরবার করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফেরদৌস আক্তার এ জন্য নানা মহলকে টাকা দিয়েছেন বলেও একটি সূত্র জানিয়েছে। এ বিষয়ে জানতে একাধিকার ফেরদৌস আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ফোনে না পেয়ে তার ফেনীর পাঠাবাড়ির বাসায় গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। তার বোন হোসনে আরা বেগমের মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর বাড়িতে গিয়ে তার বিষয়ে কোনো তথ্য মেলেনি। হোসনে আরা বেগমের স্বামী সহিদুল ইসলাম বলেন, অধ্যক্ষের স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার এখন কোথায় থাকেন, তারা জানেন না। সোনাগাজীর ৮নং আমিরাবাদ ইউনিয়নের চরকৃষ্ণজয় গ্রামে অধ্যক্ষ সিরাজের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় তার ঘরে তালা। বাড়ির সামনে পুলিশ পাহারা বসানো হয়েছে। অধ্যক্ষের স্ত্রী ও ছেলেরা এখন কোথায় আছেন, তা জানেন না সিরাজের বড় ভাইয়ের স্ত্রী হাছিনা আক্তার।

অধ্যক্ষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অনুসন্ধান করে দেখা যায়, তার একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে জনতা ব্যাংকের সোনাগাজী শাখায়। ওই ব্যাংকের ম্যানেজার জহিরুল ইসলাম বলেন, এখানে অধ্যক্ষের শুধু বেতন-ভাতার অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তিনি গ্রেফতারের পর থেকে এই অ্যাকাউন্টে কোনো লেনদেন হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধ্যক্ষের স্ত্রীর কাছে রক্ষিত টাকা তিনি প্রথমে স্বামীর মুক্তির আন্দোলন, পরে নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার কাজে ব্যয় করেন। আর সিরাজের নির্দেশেই এ টাকা তিনি ব্যয় করেছেন। 

আওয়ামী লীগের বিরোধ প্রকাশ্যে :নুসরাত হত্যার ঘটনার সঙ্গে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজনের নাম জড়িয়ে পড়ায় বিব্রত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় পাল্টাপাল্টি অবস্থানে স্থানীয় নেতৃত্বের বিরোধ প্রকাশ্যে উঠে এসেছে। নেতারা এখন একে অন্যের সমালোচনায় ব্যস্ত। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে বিপর্যস্ত স্থানীয় আওয়ামী লীগ। সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়েও রয়েছে ধূম্রজাল। নেতাকর্মীরা বলছেন, জেলা কমিটি রুহুল আমিনকে সভাপতি ঘোষণা করলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়নি। আবার আগের সভাপতি ফয়জুল কবিরকে অব্যাহতি না দেওয়ায় তিনি এখনও নিজেকে সভাপতি বলেই দাবি করেন। জেলার প্রভাবশালী নেতাদের পছন্দে পকেট কমিটি নিয়ে ইচ্ছামতো দল চালাচ্ছেন রুহুল আমিন।

নুসরাতকে যৌন হয়রানির ঘটনার পর রুহুল আমিনসহ মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটিতে যুক্ত একটি পক্ষ প্রকাশ্যে ও গোপনে অধ্যক্ষ সিরাজকে রক্ষায় মাঠে নামে। অন্যপক্ষ সিরাজের বিচারের দাবিতে সক্রিয় হয়। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম মামুন বলেন, আমরা চেয়েছিলাম নিপীড়ক অধ্যক্ষের বিচার করতে। কিন্তু উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিন এবং পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম আমাদের আন্দোলন করতে বাধা দিয়েছিলেন।

অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিন বলেন, আমি কাউকে মদদ দিইনি। আমিও চাই অপরাধীদের যেন বিচার হয়।

সূত্র: সমকাল

Ads
Ads