সেনাবাহিনীর পুতুল হয়েই থাকবেন ইমরান খান!

  • ২৫-Jul-২০১৮

::ভোরের পাতা ডেস্ক::

ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলেও সেনাবাহিনীর পুতুল হয়েই থাকবেন কিনা তা নিয়ে বেশ কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও তার উত্থানে নিজের ক্যারিশমাও কম নয়। ক্রিকেটার হিসেবে পাকিস্তান দলকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন।


 
রাজনীতিতে তার সাফল্য অনেকটা বিস্ময়কর। কয়েকজন লোক নিয়ে ‘পাকিস্তান তেহরিক-ই- ইনসাফ’ (পিটিআই) দল গড়ে তোলার সময় অনেকে হেসেছেন। শূন্য থেকেই রাজনীতি শুরু করেছেন। অবশ্য তার

এগিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে কাজ করেছে সেনাবাহিনী। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর পাকিস্তানের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাতেও ইমরান খানকে সেনাবাহিনীর পুতুল হয়েই থাকতে হবে বলে অনেক বিশ্লেষক অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এটা না করলে সেনাবাহিনী তাকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারে।

পাকিস্তানে ২৭২ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠন করার জন্য ১৩৭ আসনের প্রয়োজন। বেশি আসন পেলেও ইমরান খানের সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। ফলে ঝুলন্ত পার্লামেন্টের জন্য তাকে অন্য দল কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থন প্রয়োজন হবে।

ইমরান খান বলেছেন, তিনি নওয়াজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) এবং আসিফ আলি জারদারির পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) এ দু’দলের কারও সমর্থন নেবেন না। নির্বাচনে পিপিপির তুলনায় মুসলিম লীগের খারাপ ফল হয়েছে। ইমরান খান যখন পাকিস্তানের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন; তখন দেশটির সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। বিদ্যুতের দাম অনেক বেশি হওয়ায় বিনিয়োগ কম। দুর্নীতি অনেক বেশি। দেশটি জঙ্গিবাদেও আক্রান্ত।

উগ্রপন্থী প্রার্থীরা স্বতন্ত্র কিংবা নিজেদের ছোট ছোট আঞ্চলিক দলের হয়ে নির্বাচন করেছেন। তাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ছাড়া আর কোনো দলের সারা দেশে প্রার্থী দেয়ার মতো কোনো সামর্থ্য নেই। উগ্রপন্থীরা খুব বেশি জয় লাভ করেনি। তবে ইমরান খানের দলে অনেক উগ্রপন্থী প্রার্থী মনোনয়ন লাভ করেছেন। ইমরান খানের আমলে পাকিস্তানের নীতিতে খুব বড় কোনো পরিবর্তন কেউ আশা করছেন না।

সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইমরানের বোঝাপড়া দু-এক দিনের নয়। বছরের পর বছর ধরে তিনি সেনাবাহিনীর হয়েই রাজনীতি করেছেন। এরি মধ্যে দু-একজন সেনাপ্রধান বদলে গেছেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইমরান খানের দোস্তি ঠিক রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ইমরান খানের সরকারের সম্পর্ক কেমন হবে এখনই বলা যায় না। এজন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।


 
পাকিস্তানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঞ্জাব প্রদেশে ইমরানের দল খুব ভালো করেছে। পাঞ্জাব প্রদেশটি নওয়াজ শরিফের ঘাঁটি বলে পরিচিত। নওয়াজ শরিফ এবং তার ভাই শাহবাজ শরিফ উভয়েই পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। এবার পাঞ্জাব প্রদেশ দু’ভাগ হওয়ার দাবি উঠেছে। দক্ষিণ পাঞ্জাব আলাদা প্রদেশ করার দাবি তুলছে। এ আলাদা করার আন্দোলনে শরিকদের সঙ্গে আঁতাত করেছেন ইমরান। ফলে পাঞ্জাবে এবার নওয়াজের দলের সঙ্গে সমান সমান পাল্লা দিয়েছে ইমরানের দল। ইমরান খান নিজেও খুব ভালো করেছেন। তিনি পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব আসনেই জয়ী হয়েছেন।

তার বিপরীতে শাহবাজ শরিফ চারটি আসনে দাঁড়িয়ে সব আসনে জয়ী হতে পারেননি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলে অন্তত দুটি আসনে শাহবাজ শরিফ হেরেছেন। এক সময়ে ধারণা ছিল যে, তার ‘খাইবার পাখতুন খাওয়া’ (কেপিকে) প্রদেশে শুধু পিটিআই জয়ী হয়েছে। এবারের নির্বাচনে দেখা গেল, ইমরানের দল একমাত্র বেলুচিস্তান ছাড়া পাঞ্জাব, সিন্ধুসহ গোটা পাকিস্তানে কম-বেশি আসন পেয়েছে। বেলুচিস্তানে আঞ্চলিক দল ‘বালুচ ন্যাশনালিস্ট পার্টি’ (বিএনপি) বেশি আসন পেয়েছে।

পাকিস্তানে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার সোহরাব হোসেন বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেছেন, ‘ইমরান খানই সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন। পাকিস্তানে সেনাবাহিনী বিশাল ভূমিকা পালন করে থাকে। ফলে সেনাবাহিনী কতটা বিকশিত হতে দেবে সেটাই দেখার বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হয় সেটা তাৎপর্যপূর্ণ। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো আছে এবং ভবিষ্যতেও ভালো থাকবে এটা বলা যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে সেটা বড় বিষয়।’

তিনি বলেন, ‘নওয়াজ শরিফের জন্যে খুবই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছে। যেভাবে তাকে কারাগারে নেয়া হয়েছে সেটা দুঃখজনক। মেয়ে ও মেয়ের জামাইকেও জেলে নিয়েছে। কিন্তু পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি তদন্তে কমিটিতে চার সদস্যের তিনজনই সেনাবাহিনীর লোক। তবে নওয়াজ শরিফ দেশে ফিরেছেন। তিনি বলেছেন, রাজনীতি করব। এটা তার দলের নেতাকর্মীদের জন্যে ভালো হয়েছে’।

সোহরাব হোসেন বলেন, ‘নওয়াজ শরিফ ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক করতে চেয়েছিলেন। সেটা সেনাবাহিনী ভালো চোখে দেখেনি। সেনাবাহিনী ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক চায় না। এখন দেখা যাক তারা কী করে। পাকিস্তানে অর্থনৈতিক অবস্থাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৬-৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি হবে না। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে ইমরান খান কতটা উদ্যোগ নেন সেটাও বিবেচ্য। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা কিছুই থাকবে না। সেনাবাহিনীর ইশারায় সব হবে।’

পাকিস্তানে বাংলাদেশের সাবেক ডেপুটি হাইকমিশনার নাসিমা হায়দার যুগান্তরকে বলেছেন, ‘ইমরান খানের পিটিআই বিজয়ী হওয়ায় পাকিস্তান আবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ল। সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া ইমরান খানের টিকে থাকা সম্ভব নয়। ইমরান খান যতই গণতন্ত্রের কথা বলুন- সেনাবাহিনীর জোরেই তিনি ক্ষমতায় গেছেন। কট্টর ইসলামী গ্রুপগুলো তাকে সমর্থন দিয়েছে। ইমরান খানের একটা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড রয়েছে।


 
তিনি কট্টর পাঠানি তাই জঙ্গিরা তাকে সমর্থন করবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন হয় সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। নওয়াজ শরিফের সঙ্গেও আর্মির সম্পর্ক ছিল। আর্মি তার ওপর থেকে সমর্থন সরিয়ে নেয়ায় তাকে সরতে হল। তবে নওয়াজ শরিফের একটা শক্ত ভিত্তি আছে। ইমরানের তা নেই। আর্মি সমর্থন সরিয়ে নিলে তিনি টিকতে পারবেন না। যতদিন তিনি সেনাবাহিনীর পুতুল থাকবেন ততদিন টিকে থাকবেন। তার বাইরে গেলেই তাকে সরে যেতে হবে।’

পাকিস্তানে বাংলাদেশ হাইকমিশনে দুই দফা দায়িত্ব পালনকারী এ সাবেক কূটনীতিক আরও বলেন, ‘ইমরান খানের লক্ষ্যই ছিল যে কোনো মূল্যে প্রধানমন্ত্রী হওয়া। ক্রিকেট ছাড়ার পর থেকে তিনি এ টার্গেট নেন। তারপর সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। এখন সেনাবাহিনীর সঙ্গে অমিল হলেই সেনাবাহিনী তাকে তাড়িয়ে দেবে।’ নাসিমা হায়দার বলেন, ‘পাকিস্তানের সমাজে সেনাবাহিনীর প্রবল প্রভাব রয়েছে। তার বাইরে একটি এলিট গ্রুপ আছে। তবে তারা প্রান্তিক শ্রেণী। সেনাবাহিনী পাকিস্তানে যা বলে তাই। ফলে ইমরান খানের সরকারের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না।’