সড়ক দুর্ঘটনা : পরিবহন কেন হবে ঘাতকের প্রতিনিধি ?

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া শুরুতে এবারের ঈদযাত্রা ভালোয় ভালোয় কাটছিল। এমনিতেই ঈদের মতো সার্বজনীন ছুটির মধ্যে যাত্রীদের যাওয়া-আসার সময় সড়ক দুর্ঘটনার মাত্রাটা একটু বেশি হয়। কারণ এ সময় পরিবহনগুলোরও তাড়া থাকে বেশি। এই তাড়া খাওয়া যাত্রী উঠানো-নামানো শেষে যেভাবে পরিবহন ছোটানো হয় তাতে করে অন্যান্য সময়ের চাইতে অনেকটা বেশি দুর্ঘটনা দেখা দেয় বলেই আমরা জানি।

তবে এবারের ঈদুল ফিতরের ছুটিতে যেভাবে বিভিন্ন সড়ক দুর্ঘটনায় এখনো পর্যন্ত অন্তত যে ৬৪ জনের প্রাণহানি ঘটল, তাতে আমাদেরকে বিস্মিতই করে বৈকি। এই যে আমাদের সড়কপথ নিয়ে এতো বিনিয়োগ, সতর্কতা, আলোচনা-সমালোচনার পরও দেশের সড়কপথ যে এখনও ভরসা করার মতো নিরাপদ নয়, এই প্রাণহানির ঘটনাই তার একটি নজির।

গণমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে গত রোববার রাতে। নীলফামারীর সৈয়দপুরের বিভিন্ন গ্রামের ২৭ কিশোর দিনাজপুরের স্বপ্নপুরী থেকে ঈদ-পরবর্তী পিকনিক সেরে পিকআপে করে বাড়ি ফেরার সময় পেছন থেকে একটি যাত্রীবাহী বাস ধাক্কা দিলে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয় আরও ১৪ জন। দুর্ঘটনার জন্য ঘাতক বাসটি কিছুতেই দায় এড়াতে পারে না বলে আমরা মনে করি।

কথা হচ্ছে, পিকআপ কেন যাত্রী বহনের জন্য হবে? এ ছাড়া গণমাধ্যমে আরো যে ১৫টি দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ হয়েছে, এর মধ্যে সাতটিরই শিকার মোটরসাইকেল আরোহী। এসব দুর্ঘটনায় নিহত ৫৫ জনের মধ্যে ১৩ জনই মোটরসাইকেল আরোহী। এই যে এখন এতো মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় কবলিত হচ্ছে এর জন্য আমরা মনে করি এতে মোটরসাইকেল চালকই অধিকাংশই দায়ী। কেননা, আমরা বিভিন্ন সড়কপথে দেখি একশ্রেণির মোটরসাইকেল চালক যেভাবে ধরাকে সরা জ্ঞান করে বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল ছোটায় তাতে করেই তাদের যেকোনো সময়ে দুর্ঘটনায় কবলিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তারা এতোই আনন্দচিত্তে উদ্দাম গতিতে মোটর সাইকেল ছোটায় যে, তাতে তারা ভুলেও মনে করে না যে, তাদের এই উদ্দাম গতির তোড়েই কোথাও মৃত্যু লেখা রয়েছে। ফলে তাদের এই আনন্দের গতিই অনেক ক্ষেত্রে কাল হয়ে দাঁড়ায়। এ কথা যেমন মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তেমনি অন্যান্য যানবাহনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ঈদের ছুটিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রিন্ট মিডিয়া বন্ধ থাকে। সেকারণে এসব দুর্ঘটনার খবরের অনেকাংশই সাধারণের জানার মধ্যে আসে না। বড় দুর্ঘটনাগুলো নিয়ে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় তাৎক্ষণিক খবর হলেও গোটা পরিস্থিতি কিন্তু অনেকটা আড়ালেই থেকে যায়। যদিও এটা অস্বীকারও করা যাবে যে, গত কয়েক দশকে সড়ক নেটওয়ার্ক দেশের মহানগরী থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। সেইসঙ্গে দ্রুত বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যাও। তবে এই বিস্তৃত যানবাহন ও যাত্রী চলাচলের মধ্যে সড়কপথের বিস্তার ও প্রসারণ ঘটেনি। কিন্তু সেই অনুপাতে সড়কপথের নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব হয়নি। তার ওপর গাড়িচালকদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে সংযমের অভাব।

ফলে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যানবাহনের বেপরোয়া গতি, লেন না মানা, অপ্রশিক্ষিত চালক, ত্রুটিযুক্ত যানবাহন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সড়কের বিপজ্জনক বাঁক বা খানাখন্দ দায়ী থাকে। চালকরা এতোটাই অর্থলোলুপ হয়ে উঠেছে যে এরই পরিণতিতে তাদের বেপরোয়া গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গাড়ি ছোটানোর ফলেই তারা হয়ে উঠছে সাধারণের হন্তারকের প্রতিনিধি। আমরা মনে করি, এটা প্রতিরোধে কঠোর আইন করে তার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কোনো বিকল্প নেই। তাদের আশ্রয়দাতা ও প্রশ্রয়দাতা হিসেবে যতোবড় রাঘব-বোয়ালই হোক সাধারণের স্বজন হারানোর নীরব কান্না সরকারকে শুনতেই হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here