সবাইকে ঈদ শুভেচ্ছা, নির্বিঘ্নে হোক ঈদযাত্রা

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

আজ চাঁদ দেখা গেলেই কাল ঈদ। ঈদ এখন আর নিছক কোনো ধর্মীয় উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এখন এটা সার্বজনীন আনন্দ-বিনোদন এবং মিলনমেলায়ও রূপ নিয়েছে। তাইতো এ ঈদ উপলক্ষে বিশে^র অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের রাষ্ট্রপ্রধানরাও মুসলিম প্রধান অধ্যুষিত রাষ্ট্রপ্রধাদের নামে ও সে দেশের জনগণের উদ্দেশে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়ে থাকেন। ঈদের দিনে আমাদের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকেন। আর এভাবে একটি ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে সর্ব ধর্মীয় মেলবন্ধনেরও সূত্রপাত হয়ে থাকে। তবে এ মেলবন্ধন শুধু নির্দিষ্ট দিনেই সীমাবদ্ধ না থেকে নিয়মিত অব্যহত থাকতো তাহলে দেশের কোথাও সাম্প্রদায়িকতার লেশমাত্র থাকে না। দুর্ভাগ্য মানবজন্মেও, সেটা কার্যত হয়নি। মানুষ আবার নিজ নিজ স্বার্থের দ্বন্দ্বে সেই চিরচেনা রেষারেষির মধ্যে মিশে যায়। তারপরও বছর শেষে মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য নির্ধারিত দুই ঈদ, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা যে আনন্দ বয়ে আনে তা থেকেও আমরা পুরনো ক্ষত ভুলে গিয়ে নতুনের আবাহনে উদ্দীপ্ত হতে পারি। তাই তো ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার জন্য কারোর মধ্যেই যেন চেষ্টা ও আন্তরিকতার অভাব থাকে না। ঈদের আগমনি সুর ঝঙ্কৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ছোট-বড় সবার মনের মধ্যে আনন্দের লহরি বাজতে থাকে। সমাগত ঈদ উৎসবকে ঘিরে ইতোমধ্যে দেশব্যাপী সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। চারদিকে উৎসবের আমেজ। এ কয়দিন যে রাজধানীজুড়ে যানজটের প্রাবল্যে পথচলা বড়ো দায় ছিল এখন সেই সড়কপথই কী সুনসান ফাঁকা। এমন দিনে মনে হয় এই প্রকৃতি যদি সারা বছর থাকতো!

জীবনের নানা প্রয়োজন ও তাগিদকেও উপেক্ষা করে বছরের এই একটি দিনে নাড়ির টানে মানুষ ছুটে চলে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ব্যাকুল মন নিজ গৃহে কিংবা গ্রামে ফেরার সে কি টানটান উত্তেজনা তা ভাষায় তুলে আনা মুস্কিল। সব মানুষের মধ্যেই যে একটা শেকড়ের টান থাকে সেটা বোঝা যায় এ রকম ধর্মীয় উৎসব এলে। তা ঈদ-ই হোক আর অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উৎসবই হোক। মানুষ ছুটে চলে তার আপন জন্মভূমিতে। এই যে ধর্মীয় সংস্কৃতি, তা আজ রূপ নিয়েছে জাতীয় সংস্কৃতিতে। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে ঈদ এখন সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। কিন্তু উৎসবকে কেন্দ্র করে বিড়ম্বসারও কমতি নেই। হাজারও বিড়ম্বনা যেন পিছু ছাড়ছে না ঘরমুখো লাখো মানুষের। একদিকে ট্রেন, লঞ্চ ও দূরপাল্লার বাসের পর্যাপ্ত টিকিট নেই। অন্যদিকে টিকিট চলে যায় কালোবাজারিদের হাতে। তখন টিকিট যেন হয়ে ওঠে সোনার হরিণ। তা ছাড়া যে টিকিট পাওয়া যাবে তার ভাড়াও আদায় করা হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ।

এভাবে প্রতি বছর যাত্রী হয়রানি করে, যাত্রীদের বিড়ম্বনায় ও ভোগান্তিতে ফেলে তারা যেন এক স্বর্গীয় আনন্দ লাভ করে। তবে অন্যান্যবারের তুলনায় এবার মহাসড়কগুলোর অবস্থা কিছুটা উন্নত বলা যায়। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সড়ক পথের অনেকটা নিয়ন্ত্রণ নেয়া সম্ভব হয়েছে। তারপরও এখনো যেসব জায়গায় ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত, কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টিতে সেগুলো বড় হয়েছে আরও; ধীরগতিতে চলতে চলতে গর্তে পড়ে বিকলও হচ্ছে অনেক গাড়ি, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে সেগুলো সরাতে আবার বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের এই দশা এবারও ঈদযাত্রায় দুর্ভোগের শঙ্কা জাগাচ্ছে। কারণ ঈদের সময় এই মহাসড়কে উত্তরাঞ্চলগামী গাড়ির সংখ্যা বাড়বে কয়েকগুণ, একই সঙ্গে যানজটও বাড়বে। এই দুর্ভোগের ধকল যাবে ময়মনসিংহগামীদের জন্যও। একইভাবে ফোর লেন হলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের অবস্থা যে ভালো তাও বলা যাবে না। সর্বাত্মক চেষ্টা করলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে ঘরমুখো মানুষের নির্বিঘেœ ঈদযাত্রার নিশ্চয়তা দিতে পারেননি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। যদিও তিনি বলেছেন, তিনি কথা রেখেছেন। তারপরও তিনি ‘সামান্য বৃষ্টি হলে সড়কপথ নাই হয়ে যায়’ উল্লেখ করে ঠিকাদারদের ‘প্রতারক’ বলেছেন। তার মানে আমাদের সড়কপথগুলো কাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে যায় তা স্বয়ং সেতুমন্ত্রীই বলে দিয়েছেন। আর সড়কপথ এমন হয় বলেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কানাডা সফর শেষে শাহাজালাল বিমানবন্দরে নেমেই সড়কপথের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চান সেতুমন্ত্রীর কাছে। সেতুমন্ত্রীও সাধ্যমতো কম করছেন না। কিন্তু আমাদের ঠিকাদাররাই যদি দুর্নীতিপরায়ণ হন তাহলে এক্ষেত্রে কে আর কি করতে পারবে? মোদ্দাকথা হচ্ছে, তাদেরকে নিয়মিত জবাবদিহিতার মধ্যে না আনার জন্যই এমন হয়ে আসছে প্রতিবছর। তারপরও ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা হচ্ছে। বৃষ্টি যদি চলতেই থাকে, তাহলে খুব কঠিন হবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা।

তারপরও আমার মনে হয়, এ চ্যালেঞ্জ যতটা সম্ভব সহনীয় এবং ঘরমুখো যাত্রীদের ভোগান্তি কমানোর চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। সরকারের পক্ষ থেকে এমন আশ্বাস প্রতি বছরই দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু জনগণের ঈদযাত্রা কতোখানি নির্বিঘ্ন হয় সেটাই হচ্ছে বড় প্রশ্ন। ঈদকে কেন্দ্র করে সবাই আনন্দ পেতে চায়। রমজানের শুরুতে এ উৎসব-আনন্দের শুভসূচনা এবং ঈদের মাধ্যমে তার পরিসমাপ্তি ঘটে। আমরা প্রত্যাশা করছি, সকলের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন হোক। আর ঈদ শেষে নির্মল আনন্দের সঙ্গে ঘরে ফিরুক। নিরাপদ হোক আবার এই কর্মব্যস্ত শহরে ফিরে আসা।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here