সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যারা মনোনয়ন পাচ্ছেন

:: উৎপল দাস ::

বর্তমান জাতীয় সংসদে ১৮ জন (১৭ জন সাধারণ আসনে এবং একজন সংরক্ষিত মহিলা আসনে) ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংসদ সদস্য রয়েছেন। এদের মধ্যে কয়েকজন এমপি এলাকায় তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেননি। আবার কয়েকটি আসনে নতুন প্রার্থী রয়েছেন যারা তৃনমুলে ব্যাপক জনপ্রিয় অথবা ভোটের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ট্রাম্প কার্ড। অথবা সরকারদলীয় জোটের অংশীদার হিসাবেও কয়েকজন রয়েছেন আলোচনায়। সেক্ষেত্রে ১৪ দলের টিকেটে অনেকের কপালে নৌকার মনোনয়ন জুটতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে আগামী নির্বাচনে ২০/২১ জন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন পেতে পারেন বলে জানিয়েছে আওয়ামী লীগ ও জোটের শরিক সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে ২/১ টি আসনে বর্তমান সংসদ সদস্যদের পরিবর্তে অন্য কোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতা প্রার্থী হতে পারেন। আর দল সরকার গঠন করলে এবার অন্তত ২/৩ জন সংরক্ষিত মহিলা এমপি হবেন বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। যশোরের একটি আসনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংসদ সদস্য মনোনয়ন পচ্ছেন না এটা মোটামুটি নিশ্চিত।

ঠাকুরগাঁও ১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন। এখানে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে এ্যাড. ইন্দ্রনাথ রায় এবং অরুনাংশ দত্ত টিটো বিবেচনায় রয়েছেন।

দিনাজপুর ১ আসনে মনোরঞ্জন শীল গোপাল, নওগাঁ ১ আসনে সাধন চন্দ্র মজুমদার, যশোর ৪ আসনে রনজিত কুমার রায়, মাগুরা ২ আসনে বীরেন শিকদার, রবগুনা ১ আসনে ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভ, বরিশাল ৪ আসনে পংকজ নাথ, ময়মনসিংহ ১ আসনে জুয়েল আরেং, সুনামগঞ্জ ২ আসনে জয়া সেন গুপ্ত, মুন্সিগঞ্জ ১ আসনে সুকুমার রঞ্জন ঘোষ, মুন্সিগঞ্জ ৩ আসনে মৃনাল কান্তি দাসের দলীয় মনোনয়ন মোটামুটিভাবে নিশ্চিত বলা যায়।

পার্বত্য খাগড়াছড়ি এবং পার্বত্য রাংগামাটি আসনও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য অলিখিত বরাদ্ধ।

খুলানা ১ আসনটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রিজার্ভ আসন হিসেবে বিবেচিত। এখানকার বর্তমান সংসদ সদস্য পঞ্চানন বিশ্বাস। এ আসন থেকে ৩ বার নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমানে বয়সের ভারে কিছুটা বিপর্যস্ত। এ আসনে ২০০৮ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন ননী গোপাল মন্ডল। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন। এ আসনে নতুন প্রার্থী হিসেবে সাড়া জাগিয়েছেন তরুণ শিল্পপতি শ্রীমন্ত অধিকারী রাহুল। পঞ্চানন এবং ননী গোপালের মধ্যকার ব্যাপক কোন্দল নিরসনে দলীয় হাইকমান্ড শ্রীমন্ত অধিকারী রাহুলের মতো প্রার্থীকে বেছে নিতে পারেন বলে জানা গেছে।

খুলনা ৫ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য নারায়ন চন্দ্র চন্দ বর্তমান সরকারের মন্ত্রী পরিষদেরও সদস্য। এ আসনে তাঁকে ধাক্কা দিতে পারেন তরুণ নেতা অজয় সরকার।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে যশোর ৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন স্বপন ভট্টাচার্য্য। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা তার উপর ব্যাপক অসন্তুষ্ট। তাদের জোর দাবী এ আসনে স্বপন বাবু বাদে অন্য কোন দলীয় প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে হবে। অনুসন্ধানে জানা গেছে স্বপন ভট্টাচার্য্য স্থানীয় সর্বসাধারনের কাছে ব্যাপক বিতর্কিত।

এছাড়া ঝিনাইদাহ ২ আসনে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কনক কান্তি দাস, বাগেরহাট ৪ আসনে এ্যাড. প্রবীর রঞ্জন হালদার (সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা সুধাংশ শেখর হালদারের ছোট ভাই), নেত্রকোনা ৩ আসনে অসীম কুমার উকিল, কিশোরগঞ্জ ৫ আসনে অজয় কর খোকন, কুমিল্লা ৭ আসনে অধ্যাপক ড. প্রাণ গোপাল দত্ত, চাঁদপুর ৩ আসনে সুজিত রায় নন্দী, রংপুর ২ আসনে বিশ্বনাথ সরকার বিটু, খুলনা ৬ আসনে ইঞ্জিনিয়ার প্রেম কুমার মণ্ডল।

এছাড়া আওয়ামী লীগের সরাসরি মনোনয়ন না পেলেও ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসাবেও যাদের মনোনয়ন দেয়া হতে পারে তাদের মধ্যে রয়েছেন ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের স্বত্বাধিকারী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এফবিসিসিআইর পরিচালক ও বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা। চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে তিনি নৌকার মনোনয়ন প্রত্যাশী। এ আসনটি যদি জোটকে ছেড়ে দেয়া হয় তারপরও ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ হিসাবে দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকেই এগিয়ে রাখছেন জোটের প্রার্থী হিসাবে।

ঢাকা-১৯ (সাভার) এর বর্তমান সংসদ সদস্য ডা. এনামুর রহমানের কপালে একাদশ নির্বাচনের নৌকার টিকেট নাও মিলতে পারে। সেক্ষেত্রে জোটের প্রার্থী হিসাবে নির্মল রোজারিও’র নাম খুব ভালো অবস্থানে রয়েছে।

হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে প্রতি নির্বাচনেই নৌকার মনোনয়ন আলোচনায় থাকেন কানাডা প্রবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) সুরঞ্জন দাশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি মনোনয়ন পাননা। তবে এবার তাকে নৌকা সরাসরি দিতে না পারলেও জোটের প্রার্থী করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-১ আসনে চমক দেখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে বর্তমান সংসদ ও আ.লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. কর্ণেল (অব.) ফারুক খান যদি ঢাকার কোনো আসন থেকে নির্বাচন করেন তাহলে দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মুকুল বোসের নাম জোরেশোরেই সেখানে উচ্চারিত হচ্ছে।

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নেত্রকোনা-৩, কেন্দুয়া-আটপাড়া নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগ দলীয় তৃণমূল নেতাকর্মীসহ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের রাজনৈতিকদল ও বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা পরিবর্তন চান। এজন্য ত্যাগী ও সৎ নেতাকে তারা প্রাধান্য দেবেন বেশি। আর এ ক্ষেত্রে এগিয়ে রাখছেন আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতা অসীম উকিল। নির্বাচনী এলাকায় নিয়মিত ভাবে উঠোন বৈঠক, সভা সমাবেশ ও গণসংযোগ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক নব্বইর গণআন্দোলনের অন্যতম ছাত্রনেতা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অসীম কুমার উকিল। তার সঙ্গে একজোট হয়ে মাঠে কাজ করছেন বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি অধ্যাপক অপু উকিল। নৌকার পক্ষে গণজোয়ার গড়ে তুলতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন এই দম্পত্তি।

চাঁদপুর-৩ (চাঁদপুর সদর ও হাইমচর) আসনে নৌকার ব্যানারে পরপর দুবার সাংসদ নির্বাচিত হন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। তিনি এবারও মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। তবে আসনটিতে তার মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ আসনে দলটির কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দীও মনোনয়নপ্রত্যাশী। তিনিও রয়েছেন গণসংযোগে। মনোনয়ন দৌড়ে সুজিত রায় নন্দী এবার শক্ত অবস্থানে আছেন।

বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনের বর্তমান এমপি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস। তবে তিনি বরিশাল-৫ (মহানগর-সদর) থেকেও মনোনয়ন চাইতে পারেন। এক্ষেত্রে অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বলরাম পোদ্দার নৌকার মনোনয়ন পেতে পারেন আসনটিতে। তিনি এলাকায় গণসংযোগ থেকে শুরু করে নানামূখী রাজনৈতিক, সামাজিক কাজ করে যাচ্ছেন।

রংপুর ২ আসনে কৃষক লীগের সংগঠনিক সম্পাদক বিশ্বনাথ সরকার বিটু মনোনয়ন পেতে পারেন নৌকার। তিনি বলেন, আমি আমার এলাকার জনগণকে সাথে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। যখন উপজেলার চেয়ারম্যান ছিলাম, তখন এলাকার উন্নয়নে কাজ করেছি। আমি কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হিসাবে জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। দল মনোনয়ন দিলে আমি নির্বাচনী এলাকাকে উন্নয়নের মডেল হিসাবে গড়ে তুলবো। নির্বাচিত হলে সংসদে কৃষকের কথা তুলে ধরবো।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ কমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার প্রেম কুমার মণ্ডল। তিনি খুলনা-৬ আসন থেকে একাদশ নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। ইতিমধ্যে তিনি এলাকায় পরিশ্রমী, ত্যাগী, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, সদালাপী ও কর্মীবান্ধব প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছেন।

ইঞ্জিনিয়ার প্রেম কুমার মণ্ডল এর আগে চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ কমিটির সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

এলাকার চলম‌ান রাজনী‌তি‌তে তারুণ্য নির্ভর নেতৃ‌ত্বের প্র‌য়োজ‌নে এবং বিপুল সংখ্যক নতুন ভোটার তথা তরুণদের কা‌ছে ই‌তিম‌ধ্যে জন‌প্রিয়তার শী‌র্ষে অবস্থান কর‌ছেন প্রেম। একই সা‌থে তৃণমূ‌লের সা‌থে নির‌বি‌চ্ছিন্ন যোগ‌া‌যো‌গের মাধ্য‌মে তাদের কা‌ছেও গ্রহণযোগ্যতা পে‌য়ে‌ছেন।

আগামী নির্বাচন‌কে সামনে রেখে অনেক দিন আগে থেকে এলাকায় যাওয়া-আসা করছেন তিনি। বি‌ভিন্ন ধর্মীয় উৎসব, জাতীয় দিবস ও রাজ‌নৈ‌তিক কর্মসূ‌চি‌কে কেন্দ্র করে তি‌নি জনসংযোগ চা‌লি‌য়ে যা‌চ্ছেন। নিজ এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি নিয়মিত এলাকার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি যোগ দিচ্ছেন সামাজিক অনুষ্ঠানে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here