শান্তির পাহাড়ে ফের অশান্তির ঝনঝনানি

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

পাহাড়ে আবার শুরু হয়ে গেল অস্ত্রের ঝনঝনানি। ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তির ১৭ বছর পেরিয়ে গেল তারপরও এই অঞ্চলে অশান্তির বাতাস বন্ধ হওয়ার যেন কোনোই জো নেই। এলাকা দখল, চাঁদাবাজির এলাকা নির্ধারণ এবং নিজেদের প্রতিপত্তি প্রকাশের এক অন্ধ প্রতিযোগিতার ফেরে অকাতরে প্রাণ যাচ্ছে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বেরও। গত এক বছরে পার্বত্য তিন জেলায় এই ধরনের আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় অন্তত ৪২ খুন এবং ২৫ জনের মতো মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত কিংবা আক্রমণের শিকার হয়েছেন।

অথচ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো সমানাধিকার ভিত্তিতে সরকার এ অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়নযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়ার মধ্যেও ‘পাহাড়িদের অধিকার’ আদায়ের নামে আঞ্চলিক দুটি সংগঠন যে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে তা আমাদের কাছে রহস্যজনক হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। যা দিনে দিনে অস্ত্রের ঝনঝনানিতে রূপ নিয়েছে। ফলে প্রতিনিয়ত পড়ছে লাশ আর লাশ; গুম, অপহরণ তো আছেই। চাঁদাবাজির তো সীমা-পরিসীমা নেই। তারই ভয়ঙ্কর রূপ দেখা গেল গত বৃহস্পতিবার রাঙামাটির উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমার হত্যার ঘটনার মধ্য দিয়ে। কিন্তু তারা এখানেই থেমে থাকবার পাত্র নয়। পরদিন শুক্রবার তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় এই অস্ত্রের ঝনঝনানিতে নিহত হলো আরো পাঁচজন। আহত ছয়-সাত জন। এ অবস্থা আর কতদূর গড়িয়ে চলে এ নিয়ে আমরা শঙ্কিত আছি। এসব নিয়ে পাহাড়ে বসবাসরত শান্তিপ্রিয় পাহাড়ি-বাঙালিরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকাই স্বাভাবিক। তবে এতে আমরা প্রত্যাশা করব এ নিয়ে আমাদের চৌকস নিরাপত্তা বাহিনী এসব সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের যে কোন অপতৎপরতা রুখে দেবে। কেননা, সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কর্মকা- প্রমাণ করেছে ওরা সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-কেও প্রতিহত করতে চায়।

তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির দীর্ঘদিনের সংঘাতময় পরিস্থিতি নিরসনের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে জনসংহতি সমিতি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে এক ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। অস্ত্র হাতে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) প্রধান সন্তু লারমা ও সমিতির সামরিক উইং শান্তিবাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। বিলুপ্তঘোষিত হয় শান্তিবাহিনী। আত্মসমর্পণের এ ঘটনার পর থেকেই বিরোধিতা শুরু করে জেএসএসের আরেক নেতা প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন একটি গ্রুপ। তারা শান্তি চুক্তিকে বর্জন করে এবং ওই দিন খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে কিছুক্ষণের জন্য কালো পতাকাও প্রদর্শন করে।

এরপর থেকে শান্তিবিরোধী ওই গ্রুপের তৎপরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। পরবর্তীতে ওই গ্রুপটি আত্মপ্রকাশ করে ইউপিডিএফ (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট) নামে। ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে জেএসএস প্রধান সন্তু লারমাকে সরকারের দালাল আখ্যা দিয়ে পাহাড়ে স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে আসছে। শান্তি চুক্তির দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর জনসংহতি সমিতির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের একটি গ্রুপ সংস্কারপন্থী হিসেবে আবির্ভূত হয়ে সন্তু লারমার কর্মকা-ের বিরোধিতা করে আসছে। এরা পাহাড়কে আবার অস্থিতিশীল করতে নীলনকশা প্রণয়ন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গোটা পাহাড়কে বিভিন্ন জোনে ভাগ করে এ গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যরা মাঠে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এদের এ তৎপরতাকে প্রতিনিয়ত উসকে দিচ্ছে দেশি-বিদেশি কিছু এনজিও সংস্থা। এ অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পাহাড়ে সর্বশেষ যে ঘটনা ঘটেছে তা শান্তিচুক্তি-পরবর্তী সময়ে অন্যতম একটি ঘটনা। রা

ঙামাটির নানিয়ারচরে ঘটা ওই ঘটনা ও ঘটনা পরবর্তী ঘটনায় গোটা দেশ স্তম্ভিত। মানুষ তাহলে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়ও নিরাপদ নয়! কিন্তু আমরা প্রত্যেকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রই প্রত্যাশা করি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যখন দেশ এগিয়ে যাচ্ছে তখন কারা আবার পাহাড়ে এই অশান্তির উৎসব করে দিয়েছে? তা যারাই হোক, বর্তমান সরকারের ওপর আমাদের এই ভরসা আছে যে, দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতায় জঙ্গিবাদের মতো তা অচিরেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here