লাইলাতুল কদরের তালাশ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

মাহে রমজানের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতকে আমরা লাইলাতুল কদর বা শবেকদর নির্দিষ্ট করে নিয়েছি। কিন্তু কুরআন ও হাদিসে এই ২৭ রমজানকেই লাইলাতুল কদর বলা হয়নি। তাফসিরকারকরা সুরা কদরের গাণিতিক হিসাব করে বের করেছেন এই ২৭ সংখ্যাটা। তাই নির্ভেজাল মত হচ্ছে পবিত্র লাইলাতুল কদর কোন রাত তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। এ মহা মূল্যবান রাতকে আল্লাহ তায়ালা তার বিশেষ হেকমতের কারণেই অনির্দিষ্ট রেখেছেন। আবার তা অনির্দিষ্ট হলেও আমাদের জন্য অনেকটাই নির্দিষ্ট। কেননা লাইলাতুল কদর সাধারণত রমজান মাসেই হয়ে থাকে। তা হলে বাকি এগারো মাস থেকে নির্দিষ্ট হয়ে গেল একমাস। একমাসের মধ্যে আবার শেষ দশকেই হওয়া নির্দিষ্ট। তা হলে আরও সীমাবদ্ধ হয়ে গেল । এরপর এ দশ দিনের মধ্যে আমার বেজোড় রাত্রে হওয়া নির্দিষ্ট। এই সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) বলেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকে বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদর তালাশ করো।’ (বুখারি)। তাই রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিগুলোই লাইলাতুল কদরের সম্ভাবনার রাত। প্রতিটি মুমিনের উচিত সে রাতগুলোতে বেশি বেশি ইবাদত করা। এখন বাংলাদেশে এই শবেকদরের তালাশ করা খুবই সহজ। কারণ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ নির্দেশনায় বাংলাদেশ এখন মসজিদভিত্তিক ইসলামি অনুশীলনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

পাড়ায়-পাড়ায় মহল্লাায়-মহল্লায় মসজিদ। আর সব মসজিদে চলছে ইসলামি অনুশীলনের সরকারি কর্মসূচি।

লাইলাতুল কদরে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য : ১. এ রাতে মহা-গ্রন্থ আল-কুরআনুল কারীম অবতীর্ণ হয়েছে। ২. এ রাত হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। ৩. এ রাতে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এক দলসহ জমিনে অবতরণ করেন। এছাড়াও এ রাত ভাগ্য রজনী। যে রাতের কথা সুরা দুখানে বর্ণনা করা হয়েছে। যে ব্যক্তি এ রাতে ইবাদত করবে আল্লাহ তায়ালা তার অতীতের সব (সগিরা) গুনাহ মাফ করে দেবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াব লাভের খাঁটি আশায় লাইলাতুল কদরে কিয়ামুল্লাইলে (তাহাজ্জুদে) অতিবাহিত করবে আল্লাহ তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (বুখারি ও মুসলিম)। তওবার মাধ্যমে কবিরা গুনাহও মাফ করিয়ে নেবার এক অনন্য সুযোগ লাইলাতুল কদর। লাইলাতুল কদরে পড়ার মতো একটি বিশেষ দুআর কথাও হাদিসে এসেছে। হজরত আয়শা (রাঃ) রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ আমরা যদি লাইলাতুল ক্বদর পাই তাহলে কি করবো? উত্তরে রাসূল (সাঃ) বললেন, বলবে ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ তুমি পরম ক্ষমাশীল ক্ষমা করাকে তুমি পছন্দ কর,কাজেই তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।’ (তিরমিযি)।

লাইলাতুল কদর পাওয়ার সর্বোত্তম পন্থা হল ইতিকাফ করা। কারণ ইতিকাফকারী ঘুমিয়ে থাকলেও তার আমলনামায় ইবাদতের সওয়াব লেখা হয়। সুতরাং লাইলাতুল কদরে ইতিকাফকারী ঘূমিয়ে থাকলেও তার আমলনামায় ইবাদতের সওয়াব লেখা হলে তিনি লাইলাতুল কদরের পূর্ণ সওয়াব পাবেন। ইতিকাফ প্রসঙ্গে মহানবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ) নিজেই বলেছেন, ‘আমি কদরের রাতের সন্ধানে প্রথম ১০ দিন ইতিকাফ করলাম। এরপর ইতিকাফ করলাম মধ্যবর্তী ১০ দিন। অতঃপর ওহি প্রেরণ করে আমাকে জানানো হলো যে তা শেষ ১০ দিনে। সুতরাং তোমাদের যে ইতিকাফ পছন্দ করবে, সে যেন ইতিকাফ করে।’ এরপর মানুষ তার সঙ্গে ইতিকাফে শরিক হয়। (মুসলিম, হাদিস : ১৯৯৪)

মসজিদে ইতিকাফের মাধ্যমে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশে নিজেকে আবদ্ধ করে নেওয়ার কারণে অন্তরের কঠোরতা দূর হয়। মসজিদে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখার কারণে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসায় ছেদ পড়ে, আত্মিক উন্নতির অভিজ্ঞতা অনুভূত হয়। মসজিদে ইতিকাফ করার কারণে ফেরেশতারা দোয়া করতে থাকেন, ফলে ইতিকাফকারী ব্যক্তির আত্মা নিম্নাবস্থার নাগপাশ কাটিয়ে ফেরেশতাদের স্তরের দিকে ধাবিত হয়। এ ছাড়া ইতিকাফের মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি আসে। বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াতের সুযোগ হয়। ঐকান্তিকভাবে তাওবা করার সুযোগ লাভ হয়। তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হওয়া যায়। সময় সুন্দরভাবে কাজে লাগানো যায়।

ইতিকাফের ফজিলত সম্পর্কে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি রমাযানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করবে, সে দুটি হজ ও দুটি উমরাহ পালনের সওয়াব লাভ করবে (বায়হাকি)। তাছাড়া জাহান্নাম ইতিকাফকারী থেকে দূরে থাকে যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য যে একদিন ইতিকাফ করে, তার আর জাহান্নামের মাঝে তিন খন্দক দূরত্ব হয়ে যায়। (বায়হাকি) আর এক খন্দক বলতে বুঝানো হয় অনেক দূরত্ব। যেমন আসমান ও জমিনের মধ্যকার দূরত্ব। এরকম তিন খন্দক পরিমান দূরত্বে জাহান্নাম চলে যায়। সুতরাং বরকতময় এই মাসে আমাদের উচিত পারলে পরিপূর্ণ দশদিন মসজিদে ইতিকাফের নিয়তে চলে আসা। আর তা সম্ভব না হলে কমপক্ষে বেজোড় রাতগুলো মসজিদে এসে ইবাদাত কাটানোর চেষ্টা করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দিন। আমিন।

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here