রাসায়নিক বিভ্রান্তি মধুমাস যেন বিষাক্তমাস না হয়ে ওঠে

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

আজ জ্যৈষ্ঠ মাসের ২৪ তারিখ যাচ্ছে। জ্যৈষ্ঠ মাস মানেই বাংলার সুমিষ্ট রসালো ফলের মাস। যে জন্য এ মাসটিকে বাঙালি আদর করে নাম দিয়েছে মধুমাস। বাঙালির প্রতিটি পরিবারই এই মাসটির জন্য বছরজুড়ে মুখিয়ে থাকে কবে আসবে আবার সেই আম-কাঁঠালের মাস। এ মাসেই পাকে বাংলার রসালো সুমিষ্ট সব ফল আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু এর মধ্যে অন্যতম। এক সময় এ মাসটি এলেই শিশু শিক্ষার্থীরা প্রায় মাসব্যাপী ছুটি ভোগ করতো। যারা শহরে থাকতেন তারা এই শিশু সন্তানদের নিয়ে বাড়িমুখো হতেন এই গ্রামীণ ফল আম-জাম, কাঁঠাল খাওয়ার জন্য। এ মাসে গ্রামের বাড়িতে এলে শিশুরা যেন তাদের শহরবাসের কথা ভুলেই যেতো।

এখন আর সেই দিন নেই। আগের মতো সেরকম ছুটি ভোগের সুবিধা দেয় না এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু তাই বলে প্রকৃতি প্রদত্ত বাংলার এই রসালো ফল তো আর বন্ধ হয়ে যাবে না। জাম আর লিচু স্বল্পস্থায়ী। এগুলো শিশুরা শহরে খেতে পারলেও আম-কাঁঠাল খাওয়া যেন গ্রামে গিয়ে খেলে একেবারেই মন ভরে না। এখন দেশে যে হারে মানুষ বেড়েছে তাতে করে বাংলার এই ফলের ফলনও হ্রাস পায় নি। জামই এখনো প্রাকৃতিকভাবেই হয়ে থাকে। কিন্তু অন্যান্য ফলের একটা লাভজনক ব্যাপার আছে বলে বাণিজ্যিকভাবে এগুলোর বাগান হয়ে থাকে। তা ছাড়া এতে মোটা অংকের বিনিয়োগও হয়ে থাকে। কারণ এখন এ ফলগুলো বাইরের বিভিন্ন দেশে রপ্তানিও হয়ে থাকে।

আর এই বাণিজ্যিক কারণেই এ ফলগুলো নিয়ে নানা অসাধুপায় অবলম্বনের ব্যাপার ঘটে থাকে। কৃত্রিম উপায়ে ফল পাকানো, ফলের স্থায়িত্ব বাড়ানোর নানা রাসায়নিক পদ্ধতি এর মধ্যে অন্যতম। ফলে এটার সুযোগেই যেখানে এসব কৃত্রিম কোনো ব্যাপার অবলম্বনের ব্যাপার নেই সেখানেও এই কৃত্রিম উপায়ে ফল পাকানোর অভিযোগ ছড়িয়ে দেয়ার মানুষও কম নেই। যার নজীর আমরা দেখছি সম্প্রতি ফল নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ছড়ানো নিয়ে। ফল পাকানোর জন্য কারবাইড ব্যবহার আর পাকা ফল সংরক্ষণের জন্য ফরমালিন ব্যবহারের অভিযোগ তো ছিলোই এখন ফল পাকাতে ইথোফেন নামের রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগও উঠছে। তবে মানুষ আগের মতো আর গোবেচারা অবস্থায় নেই। মানুষ এখন আগের তুলনায় স্বাস্থ্যসচেতন। তা ছাড়া বিভিন্ন ব্যানারে পরিবেশবাদী ও ভেজালবিরোধী সংস্থার তৎপরতাও সক্রিয় রয়েছে। যেকারণে সরকারও ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যাপারে পূর্ণ সজাগ। তারই দৃষ্টান্ত এই মধুমাসে আড়তে ও বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের তৎপরতা। ফলে সাম্প্রতিককালে আমরা দেখছি যে, কারবাইড ও ইথোফেন দিয়ে পাকানোর অভিযোগে কীভাবে হাজার হাজার মণ আম ধ্বংস করা হয়েছে। পাশাপাশি ফরমালিন মেশানোর অভিযোগেও শত শত টন ফল নষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু হালে একদল কৃষি বিশেষজ্ঞ ও রসায়নবিদ এ সম্পর্কে ভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন; তারা বলছেন, কারবাইড ও ইথোফেন সারা বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত ফল পাকানোর রাসায়নিক। কারবাইড ফলের মধ্যে প্রবেশ করে না, আর ইথোফেন উদ্বায়ী বলে ব্যবহারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নির্ধারিত মাত্রার নিচে চলে আসে। এ ছাড়া এ দুটি রাসায়নিক তাৎক্ষণিকভাবে মাপার মতো কোনো যন্ত্র আমাদের দেশে নেই। ফলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভূমিকা আমাদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। আগেও ফরমালিন মাপার যন্ত্র নিয়ে কথা উঠেছিল, বাতাসের ফরমালিন মাপার যন্ত্র দিয়ে ফলের ফরমালিন মাপায় তাতে সঠিক তথ্য আসেনি। তা ছাড়া বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন ফরমালিন কেবল আমিষে কাজ করে, শাকসবজি ও ফলমূলে এর ভূমিকা নেই।

বাংলাদেশ ফল উৎপাদনে আজ বিশ্বে চতুর্থ। এতেও অনুমিত হয়, ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ আজ কোথায় উঠে এসেছে। যে ফল খাওয়ার জন্য এক সময় বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানরা এই মধুমাস এলেই গ্রামে চলে যেতেন এখন আর তার প্রয়োজন হয় না। বরং গ্রাম থেকেই শহরেই অনেক বেশি ফলের সমাহারে ভরে ওঠে। এতেও বোঝা যায়, বাংলাদেশ ফল উৎপাদনে বিশ্বের কোথায় পৌঁছে গেছে। কাজেই এই বিকাশমান ফলের খাত যেন কোনো বিভ্রান্তিকর তথ্যে বাধাগ্রস্ত না হয় সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। কাজেই মধুমাসে পাকা ফল খাওয়ার ব্যাপারে জনগণের মাঝে অহেতুক বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে মুক্ত থাকতে হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here