মাদক নির্মূলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নই প্রত্যাশিত

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বাংলাদেশের মানুষ কবে মাদকমুক্ত ছিল সেটা জানতে হলে গবেষকদের মতো নানা তথ্য-উপাত্ত ঘাটতে হবে। তবে সাম্প্রতিককালে এই মাদকের ভয়াবহতা অতিশয় বেড়ে গেছে তা নিঃসংশয়েই বলা চলে। বাংলাদেশের মানুষ গাঁজা-সিদ্ধি-তাড়ি জাতীয় মাদকে আসক্ত ছিল বহু আগে থেকেই। সেটাও প্রকাশ্যে নয়। লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে এসব নেশাখোরদের উপস্থিতি ছিল। তখন এসব নেশাদ্রব্য ব্যবসা করে কারো আঙুল ফুলে কলাগাছও হওয়ার উপায় ছিল না। আর এখন এই নেশাখোর এতোটাই বেড়ে গেছে যে এর চাহিদার ওপর নির্ভর করেই বহু লোক এই নেশাদ্রব্যের ব্যবসা করে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ তো হয়ে উঠছেই বরং এটাকে ছাড়িয়ে গিয়ে তালগাছই হয়ে উঠছে।

এখন এর ব্যবসা আর দেশীয় পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ নেই, দেশের সীমানা পেরিয়ে তা হয়ে উঠছে সুদূরব্যাপী, আন্তর্জাতিক। আর এই আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বলা হয়ে থাকে মাফিয়া, ডন। এই মাফিয়া, ডনরাই আজকাল বড় বড় মাদকের চালান নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। এরা নিঃসন্দেহে সন্ত্রাসী, জঙ্গিদের ভয়াবহতার চেয়েও কোনো অংশে কম নয়। বরং মাত্রাগত বৈশিষ্ট্যের নিরিখে বেশিই বলা চলে। কারণ এই মাদক তিলে তিলে এমনভাবে ধ্বংস করে চলে যে তাতে করে গোটা জাতিকেই নিঃশেষ করে দিতে পারে। জঙ্গি, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তবুও সামাজিক প্রতিরোধ আছে। কিন্তু এই মাদকের বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠে নাই। আর এ জন্যই মাদকের আখড়াগুলো সমাজের চোখকে একপ্রকার বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েই তাদের কারবার অব্যাহত রাখে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও এসব তথ্য দুর্লভ নয়। মাদক এমনই এক চক্রব্যুহ যে এর নিকষ কালো অন্ধকার গর্ভে একবার কেউ প্রবেশ করলে তা থেকে আর বের হওয়ার সুযোগ থাকে না। যতোই তাদের মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে রাখা হোক না কেন। কিছুদিন ভালো অবস্থায় থাকলেও আবার ফিরে যায় তারা সেই পুরোনো ডেরায়। এই নেশাখোররা এতোই ভয়াবহ যে, গত পাঁচ বছরে নেশাখোর ছেলের হাতে খুন হয়েছেন ৩৮৭ জন পিতা-মাতা। একই সময়ে স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন ২৫৬ জন নারী। মাদক সেবন নিয়ে বিরোধে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে ৫ হাজার ৭৮০টি। একই কারণে প্রেমিক বা প্রেমিকার হাতে খুন হয়েছে ছয় শতাধিক তরুণ-তরুণী!

স্বাভাবিকভাবেই প্রধানমন্ত্রী মাদকের এই ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত আছেন। সেই কারণেই তিনি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছেন মাদক নির্মূলে। গত ৩১ জানুয়ারি সংসদেও তিনি বলেছেন, আমরা আমাদের শিশুদের এভাবে ধ্বংস হয়ে যেতে দিতে পারি না। প্রধানমন্ত্রীর ওই নির্দেশের পর রাজধানীসহ দেশজুড়ে মাদক বিরোধী অভিযানে পয়লা ফেব্রুয়ারি ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার হয় ৩৮ জন মাদক ব্যবসায়ী। অতঃপর গত ৩ মে শুক্রবার র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, যারা মাদক তৈরি করে, যারা বিক্রয় করে, যারা পরিবহন করে এবং যারা সেবন করে সকলেই সমানভাবে দোষী; এটা মাথায় রাখতে হবে এবং সেভাবেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

বর্তমানে এই মাদকের ব্যবহার ও ব্যবসায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে ইয়াবা। গত দশ বছর ধরে এর প্রচলন শুরু হয়েছে। এই ইয়াবা ব্যবসা করে বহু লোক আঙুল ফুলে তালগাছ হয়েছেন। তথ্যমতে, ইয়াবার পেছনেই মাদকসেবীরা বছরে খরচ করে থাকেন প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি মাদক আমদানিতে বছরে বিদেশে পাচার হচ্ছে প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা। ইয়াবার পরেই আছে ফেনসিডিল ব্যবসায়। এই মাদক ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট কোনো দলের নয়, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সে ক্ষমতাসীনের শেল্টারে থেকেই তারা এই ব্যবসা চালিয়ে যায়। এরশাদ সরকারের সময় এদেশে প্রথম প্রবেশ করে হিরোইন, অতপর ফেনসিডিল আর বর্তমানে আরো ভয়াবহ মারণনেশা ইয়াবা। শুধু দলীয়ই নয়, এমনকী পুলিশের অনুসন্ধানেই বেরিয়ে এসেছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের একটি অংশও এই ব্যবসার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। যা সম্প্রতি ভোরের পাতায়ও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সরকারের উদ্দেশে এতোসব দৃষ্টি আকর্ষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পরও মাদক কারবারী ও মাদকসেবীদের কোনো ইতরবিশেষ হয়নি। এখন আমরা অপেক্ষায় রইলাম, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা দেশের আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী আদৌ বাস্তবায়ন করে কিনা। নাকি আমরা যে তিমিরে আছি সে তিমিরেই থেকে যাবো।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here