মাদকের রাঘবরা কেন ধরা ছোয়ার বাইরে থাকবে?

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

সর্বজন প্রশংসিত দেশজুড়ে হওয়া মাদকবিরোধী অভিযান জোর অব্যহত রয়েছে। আর এ লক্ষ্য অর্জনে নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত চলমান মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। মাদকের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে গতকাল সোমবার মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তবে এই অভিযানে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতদের নিয়ে দেশের বিরোধীদল বিএনপি ও এক শ্রেণির সুশীল সমাজ প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন এতে অনেক নিরীহ লোক নিহত হচ্ছে। আর এ অভিযোগের জবাবে মাদকবিরোধী অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহতের ঘটনা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যেখানে অবৈধ ব্যবসা, সেখানেই অবৈধ টাকা আর অবৈধ অস্ত্র।

তাই এ ক্ষেত্রে জীবন বাঁচাতে গোলাগুলি হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে কাউকে হত্যা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা কাউকে হত্যা করছি না।’ আমরা মনে করি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ কথা সুশীল সমাজের কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। আর বিরোধীদল তো এ নিয়ে রাজনৈতিক কারণে পেঁচাবেই। যখন তারা ক্ষমতায় ছিল তখন তো তাদের হাতেও ‘ক্রসফায়ারে’ বহু লোক হতাহত হয়েছে। তখন সেটা নিয়ে তারাও নিজেদের সপক্ষে বক্তব্য দিয়েছে। যা হোক, এসব রাজনৈতিক বক্তব্যে না গিয়ে আমরা বলতে চাই, দয়া করে আপনারা এই মাদকবিরোধী অভিযান অব্যহত রাখা নিয়ে আর কোনো বিতর্কের সৃষ্টি করবেন না। এই দেশ যখন অর্থনৈতিকভাবে ক্রমশ উন্নয়নের সোপানে পা রেখেছে, সে পা চলতে দিন। আমরা চাইনা এই দেশ মাদকে সয়লাব হয়ে গিয়ে এই অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাঁধা হয়ে দাঁড়াক। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশ, মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকার পরও নানা কৌশলে ইয়াবা আসছে, ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। এই অভিযানে এ পর্যন্ত সারাদেশে গ্রেফতার হয়েছে ২১ হাজার মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ী; মামলা হয়েছে ১৪ হাজার ৯৩৩টি। অন্যদিকে, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে মোট ১৫৩ জন। যাদের মধ্যে পুলিশের সঙ্গে ৮৪ জন, র‌্যাবের সঙ্গে ৩৪ জন এবং বাকি ৩৫ জন ‘মাদক ব্যবসায়ীদের দুই পক্ষের’ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। এর পরও ইয়াবা চক্রের শক্ত নেটওয়ার্ক এখনও ভাঙা সম্ভব হয়নি, রাঘববোয়ালও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। এটা ঠিক যে, এখনো পর্যন্ত মাদকের রাঘববোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীও সংসদে বলেছেন মাদকের ‘পৃষ্ঠপোষকদের’ও সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ‘পৃষ্ঠপোষক’ মানে এই রাঘববোয়াল। মোটা দাগে, যারা গড ফাদার, মাফিয়া বা ডনরূপী রাঘববোয়াল।

আমরাও মনে করি, এই ‘রাঘববোয়াল’ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো পর্যন্ত প্রশ্নের উর্ধ্বে উঠতে পারেনি। তবে কোনো অজ্ঞাত কারণে তারা এই রাঘববোয়ালদের টিকিটি পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারছে না? অথচ ঘোষণা দিয়ে গত ১৮ মে থেকে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করে পুলিশ। ৪ মে থেকে পৃথকভাবে অভিযানে নামে র‌্যাব। যে অভিযানে ধরা পড়েছে অথবা নিহত হয়েছে, তাদের অধিকাংশই হয় চুনোপুঁটি, না হয় মধ্যম সারির মাদক ব্যবসায়ী। আর এক্ষেত্রে এমন অভিযোগও উঠছে যে, মাদক ব্যবসায়ীদের অনৈতিক সুবিধাও দিচ্ছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অসাধু কিছু সদস্য।

অভিযান শুরুর পর পরই চিহ্নিত অনেক মাদক ব্যবসায়ী গা ঢাকা দিয়েছে, কেউ কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এ অবস্থায় ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাসহ বিভিন্ন মহল থেকে যে প্রশ্ন উঠছে, সেটাও আমাদের আমলে নিতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করছি, এই অভিযান যেন স্বচ্ছতাপূর্ণ হয়; কোনো গোঁজামিল দিয়ে না করা হয়। মনে রাখতে হবে, দেশের মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক সচেতন। তাদের চোখে ধুলা দেয়া যাবে না। যা সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন। সুতরাং আমরাও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যে সমর্থন দিয়ে বলতে চাই যে, লক্ষ্য অর্জনে নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত চলমান মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকুক। তবে মাদকের ‘পৃষ্ঠপোষক’রূপী গড ফাদার, ডন, মাফিয়াদের কোনোভাবেই ছাড় দিয়ে নয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here