ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা!

:: স্পোর্টস ডেস্ক ::

লাতিন আমেরিকায় ফুটবলে আর্জেন্টিনার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল উরুগুয়ে। প্রতিবেশি দেশটি যখন ১৯২৪ অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয় করে স্বভাবতই প্রতিহিংসা জাগলো আর্জেন্টাইনদের মনে। কিন্তু ১৯২৮ সালে অলিম্পিকের ফাইনালে আর্জেন্টিনার সাথে ১-১ গোলে ড্র ও পরের ম্যাচে ২-১ গোলে হারিয়ে স্বর্ণপদক জয় করে নেয় উরুগুয়ে। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে পরাজিত করে শিরোপা জেতার পর আর্জেন্টিনা-উরুগুয়ের ম্যাচ সব সময়ই এক ভিন্ন মাত্রা এনে দিয়েছে ফুটবল বিশ্বে।

ঠিক এই সময় ফুটবলে তেমন কোন চরিত্র হয়ে উঠতে পারেনি ব্রাজিল। বরং ছায়া চরিত্রের মতই ছিল লাতিন ফুটবলে। দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ ১৯৪৯ সালে জয়ের পরের বছর ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকাপ ফুটবল, ফাইনালে মুখোমুখি ব্রাজিল ও উরুগুয়ে। শিরোপা জিততে ব্রাজিলের দরকার শুধু ড্র, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ম্যাচ উরুগুয়ে জিতে ব্রাজিলিয়ানদের জন্য জন্ম দেয় ‘মারাকানাজো’ ট্র্যাজেডির, যা আজও ব্রাজিলিয়ানরা ভুলতে পারেনি।

১৯৫৮ থেকে ১৯৭০ সাল, ব্রাজিল ফুটবলের সোনালী সময়ে পেলে, গারিঞ্চা, ভাভা, কার্লোস, তোস্তাও, গার্সন, রিভেলিনো, জার্জিনিয়োসহ আরো অনেক কিংবদন্তি ব্রাজিলিয়ানদের উপহার দিয়েছে অসাধারণ অনেক মুহূর্ত। এই সময়ের মাঝে তিনটি বিশ্বকাপ জয়ী দেশ হিসেবে নিজেদের করে নিয়েছে জুলেরিমে ট্রফি।

ব্রাজিলের এই উত্থানের সময়গুলোতে আর্জেন্টিনা তুলনামূলক ছিল নিষ্প্রভ, উরুগুয়ে আর আগের পরাশক্তি নেই। বিশ্ব ফুটবল মেতে উঠেছিল পেলে বন্দনায়, ফুটবলে আনন্দ নিয়ে আসার জন্য সকলের প্রিয় গারিঞ্চা এবং সুন্দর ফুটবলের দেশ হিসেবে ব্রাজিল নিজেদের নিয়ে গিয়েছিল অন্য এক পর্যায়ে।

তিনটি বিশ্বকাপ এবং পেলে নামের কিংবদন্তি তখন ব্রাজিলের আছে, কিন্তু লাতিন পরাশক্তি আর্জেন্টিনার অর্জনের খাতা তেমন আকর্ষনীয় নয়। ব্রাজিল এই সময়ে নিজেদের এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে তখন আর্জেন্টিনাকে ব্রাজিলের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী বলার মত সময় আসেনি।

আর্জেন্টিনা অবশ্য এরপর ঘুরে দাঁড়িয়েছে, নিজেদেরকে পরিচয় করে দিয়েছে প্রতিটি আসরের অন্যতম শিরোপার দাবিদার হিসেবে। বিশ্বব্যাপী আর্জেন্টিনা যথেষ্ট সমীহ আদায় করে নেওয়ার পর ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ জয় আর্জেন্টিনা ফুটবলের শক্তিশালী চিত্র প্রকট আকারে প্রতীয়মান হয়ে উঠে।

ব্রাজিলিয়ানরা সবসময়ই চেয়েছে পেলের ১০০০তম গোল হোক একজন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষকের বিপক্ষে, ১৯৬৯ সালে ভাস্কোর বিপক্ষে পেলের পেনাল্টি থেকে করা গোলটি ছিল তার ১০০০তম গোল। ভাস্কোর গোলরক্ষক ছিল আর্জেন্টিনার এডগার্দো আন্দ্রাদা, পেনাল্টি শট অল্পের জন্যে রক্ষা করতে না পারার ক্ষত তিনি প্রায় বয়ে বেড়িয়েছেন সারা জীবন, কেন?

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার দ্বন্দ্ব তখন প্রায় এমন একটা পর্যায়ে যে আন্দ্রাদা মনে করেন এমন একটা ঐতিহাসিক মহূর্তের সাথে তিনি জড়িয়ে যেখানে ব্রাজিলিয়ানদের সাফল্য বহন করা খুবই কষ্টের। ব্রাজিলিয়ান ক্লাবে আর্জেন্টাইনদের কিংবদন্তি হয়ে উঠা কিংবা আর্জেন্টিনার ক্লাবে ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের আইকন হয়ে উঠা ঐ সময়ে অতিমাত্রার ভিন্ন কিছু ছিল না।

ক্রুজেইরো কিংবদন্তি আর্জেন্টাইন সেন্টার ব্যাক রবার্তো পারফিমো তুলে ধরেছেন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভিন্ন এক দিক। তার মতে ব্রাজিলিয়ানদের খেলায় রয়েছে সাম্বার মত সৃজনশীলতা, আনন্দ ও হালকা একটা ভাব এবং অন্যদিকে আর্জেন্টাইনদের খেলার রয়েছে ট্যাঙ্গোর মত অতিমাত্রার আবেগ ও কৌশলগত নির্ভুলতা। সাম্বা নাচ যেমন ব্রাজিলের সংস্কৃতির একটি অন্যতম ধারক , ঠিক তেমনি ট্যাঙ্গো আর্জেন্টিনার সংস্কৃতির একটি অপরিহার্য অংশ।

আর্জেন্টিনা ফুটবলকে ধারণ করে জীবনের একটি বিষাদময়, দুঃখময় মুহূর্তের মত অন্যদিকে ব্রাজিলিয়ানদের কাছেও ফুটবল জীবনের অংশ কিন্তু তা বহন করে সাম্বার নাচের মত আনন্দ।
পারফিমো বলেন, ‘আমরা একে অন্যের প্রতি পরশ্রীকাতর। বলের সাথে আমাদের সম্পর্ক ভিন্ন। আমরা এটি ব্যবহার করি লক্ষ্য অর্জনের জন্যে, কিন্তু তারা এটি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত আনন্দের জন্যে। ফুটবল আমাদের জীবনের সাথে জড়িত, বাঁচার আরেকটি পথ। ফুটবল আমাদের কাছে ট্র্যাজিক কিন্তু তাদের জন্যে তা নয়।’

বিশ্বকাপে এই দুই দল মুখোমুখি হয়েছে তিনবার, ১৯৭৮, ১৯৮২ ও ১৯৯০ সালে, এর মধ্যে ১৯৭৮ সালের ম্যাচটি ‘রোজারিও ব্যাটল’ নামে খ্যাতি লাভ করে। ১৯৯০ সালের ম্যাচে ১-০ গোলে পরাজয়ের পর, ব্রাজিলিয়ান খেলোয়ার ব্রাঙ্কো দাবি করেন আর্জেন্টাইন কোচিং স্টাফ তাকে ট্রাঙ্কুইলাইজার মেশানো পানি খেতে দিয়েছিল, ম্যাচটি ‘হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল নামে বিখ্যাত।

১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনা প্রায় একক কৃতিত্বে আর্জেন্টিনাকে এনে দিলেন বিশ্বকাপ, তখন আর্জেন্টিনার অর্জন দুইটি বিশ্বকাপ ও ব্রাজিলের তিনটি। ব্যাবধান কমার পাশাপাশি আর্জেন্টিনা পেয়ে যায় ম্যারাডোনা নামের এমন এক কিংবদন্তি, যাকে সহজে দাঁড় করানো যায় পেলের সাথে তুলনায়। দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন পালক যোগ হয় ম্যারাডোনা নামের সাথে এবং কে সেরা, এই বিতর্ক আজও সমান তালে বিদ্যমান।

দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে ম্যারাডোনার বিখ্যাত উক্তি,
‘অন্য যেকোন দেশের চেয়ে আমার দেশ ব্রাজিলকে হারাতে বেশি ভালোবাসে। একই কথা তাদের জন্যেও প্রযোজ্য। নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ইতালি অথবা অন্য যেকোন দেশের বিপক্ষে জয়ের চেয়ে তারা আমাদের বিপক্ষে জয়ে বেশি আনন্দ লাভ করে। ব্রাজিলকে হারানোর চেয়ে সুন্দর কিছু নেই।’

এবারের বিশ্বকাপের সেমি ফাইনাল বা ফাইনালে আবারও ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মহারণের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন ক্রীড়ামোদীরা। তখন অনেকেই হয়তো বলবেন মেসি বনাম নেইমার লড়াই। কিন্তু প্রতিপক্ষ দল দুটির নাম যখন ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা, তখন প্রতিদ্বন্দ্বিতার আর নতুন কোনো এককের প্রয়োজন নেই। ফুটবলপ্রেমীদের নয়নজুড়ানো ফুটবলের সম্মোহনে বেঁধে ফেলতে যারপরনাই চেষ্টা করবে দুটি দলই!

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here