বিশ্ব মা দিবস: বছরের প্রত্যেকটি দিনই হোক মায়ের জন্য

:: আবু সাঈদ সজল ::

‘মা’ ছোট্ট একটা শব্দ, কিন্তু কি বিশাল তার পরিধি! সৃষ্টির সেই আদিলগ্ন থেকে মধুর এই শব্দটা শুধু মমতার নয়, ক্ষমতারও যেন সর্বোচ্চ আধার। মায়ের অনুগ্রহ ছাড়া কোনো প্রাণীরই প্রাণ ধারণ করা সম্ভব নয়। তিনি আমাদের গর্ভধারিনী, জননী। সকলের জীবনে মায়ের স্থান সবার ওপরে। তাই তাঁকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা জানানোর জন্য একটি বিশেষ দিনের হয়ত কোনো প্রয়োজন নেই। তারপরও আধুনিক বিশ্বে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারটিকে ‘মা দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। কিন্তু মায়ের জন্য মাত্র একটি দিবস, চিন্তাও করা যায়! জানি না, করপোরেট বিশ্বে কেন শুধু একটি দিবসকে নির্ধারণ করেছে মা’কে সম্মান জানানোর জন্য? বছরের বাকি দিনগুলোতে তাহলে কী হবে? মা’কে দূরে ঠেলে রাখবে? সেটাও জানি না, তবুও কেন যেন একটা উপলক্ষ ভেবে নিয়ে আমিও লিখতে বসে গেলাম। তবে, ভাবনায় এটাও কাজ করছে যে, মা’কে নিয়ে লিখতে তো কোনো দিবসের প্রয়োজন নেই!

করপোরেট দুনিয়া হয়তো এ দিনটি ‘বিশ্ব মা দিবস’ হিসেবে পালন করার রীতি বের করে নিয়েছে। যাদের কাছে মায়ের মূল্য মাত্র একদিনের জন্য, তারা তো বছরে একটি দিনকেই বেছে নেবে (এর পেছনে অধিকাংশই যে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না); কিন্তু আমার কাছে কোনো দিবস-টিবস নেই। বছরের ৩৬৫ দিনই তো আমার মায়ের জন্য। ‘মায়ের জন্য ভালোবাসা’ আমার সপ্তাহের সাতদিন প্রতিদিনই এবং দিনের ২৪ ঘন্টাই। যারা পুরো বছর মায়ের কোনো খোঁজ খবর রাখে না, ‘বিশ্ব মা দিবস’ শুধু তাদের জন্য। ওই একটি দিন মায়ের জন্য তারা আহ্লাদে মেতে ওঠেন। করপোরেট দুনিয়া কত সুন্দরভাবেই না মা থেকে আমাদেরকে দূরে সরিয়ে রাখে।

ইতিহাসবিদের মতে, এই দিনটি প্রাচীন গ্রিসের মাতৃ আরাধনার প্রথা থেকে সূত্রপাত হয়। কথিত আছে ১৬ শতকে ইংল্যান্ডে প্রথম মা দিবস পালন হয়। এটাই ছিলো দেব-দেবীদের মা ছাড়া নিজের আসল মাকে নিয়ে মানে রক্ত মাংসের মাকে নিয়ে মা দিবস। দিবসটি তারা মাদারিং ডে হিসেবে পালন করতো। সেদিন সরকারি ছুটিও ছিলো। পরিবারের সবাই তাদের মায়ের সাথে দিনটি কাটাতো। তবে এই দিবসটি ততোটা প্রসার লাভ করেনি।

প্রায় ১০০ বছর পর ১৮৭০ সালে আমেরিকার জুলিয়া ওয়ার্ড হাও নামের এক গীতিকার মা দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। তিনি আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় একটি দেশাত্মবোধক গান লিখেছিলেন। সে গানটা সে সময় বেশ জনপ্রিয় ছিলো। আমেরিকায় গৃহযুদ্ধের সময় হাজার মানুষকে হত্যা করা হচ্ছিলো কারণে বা অকারণে। এক মায়ের সন্তান আরেক মায়ের সন্তানকে হত্যা করছিলো অবলীলায়। এই সব হত্যায দেখে জুলিয়া খুব ব্যথিত হয়েছিলেন। তিনি এটা বন্ধ করার জন্য আমেরিকার সব মাকে একসাথে করতে চাচ্ছিলেন। আর এ কারণেই তিনি আন্তর্জাতিক মা দিবস পালন করতে চাচ্ছিলেন।

এদিকে ভার্জিনিয়ার একটি মহিলাদের দল জুলিয়া ওয়ার্ড হাও-এর প্রস্তাবিত মা দিবসটি পালন করতো বেশ মর্যাদার সঙ্গেই। অ্যানা রিভেস জারভিস তার জীবনের সুদীর্ঘ ২০ বছর কাটিয়েছিলেন ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনের একটি গির্জায়। সেখানে তিনি সানডে স্কুলের শিক্ষকতা করেছেন। তার মৃত্যুর পর তার মেয়ে অ্যানা এম জারভিস মা দিবস ঘোষণা আন্দোলনের হাল ধরে। অ্যানা জীবিত ও মৃত সব মায়ের প্রতি সম্মান জানানোর তথা শান্তির জন্য এই দিবসটি পালন করতে চাচ্ছিলেন। এই লক্ষ্যে তারা ১৯০৮ সালে গ্রাফটনের ওই গির্জার সুপারিনটেনডেন্টের কাছে একটি আবেদন জানায়। তার অনুরোধে সাড়া দিয়ে সে বছরই ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ও পেনসিলভেনিয়ার কয়েকটি গির্জায় মা দিবস পালিত হয়। এভাবে অনেকেই প্রতিবছরই মা দিবস পালন করতে শুরু করে।

এরপর অনেক পথ পেরিয়ে ১৯১৪ সালে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে জাতীয় মা দিবসের মর্যাদা দেয়। আরও পরে ১৯৬২ সালে এই দিবসটি আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

মাকে ইসলাম যত কথা বলেছে, অন্য কোনো ধর্ম তত কথা বলেছে কিনা জানি না। মাকে নিয়ে বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত মাকেই জান্নাত, মাকেই জাহান্নাম বলে বসেছে ইসলাম। মাকে খুশি করলে জান্নাত, কষ্ট দিলে জাহান্নাম।

পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং বল তাদেরকে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা। পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন, আর পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন। নবীজী স. বলেছেন পিতা-মাতা জান্নাতের মাঝের দরজা। যদি চাও, দরজাটি নষ্ট করে ফেলতে পারো, নতুবা তা সংরক্ষণও করতে পারো।

রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন, তিন রকম দোয়া নি:সন্দেহে আল্লাহ নিকট কবুল হয়। মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া আর সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দোয়া। -তিরমিযী।

সনাতন ধর্মে উল্লেখ আছে “দশজন উপাধ্যায় (ব্রাহ্মণ) অপেক্ষা একজন আচার্য্যরে গৌরব অধিক, একশত আচার্য্যরে গৌরব অপেক্ষা পিতার গৌরব অধিকতর; সর্বোপরি,সহস্য পিতা অপেক্ষা মাতা সম্মানার্হ।”(মনু,২/১৪৫)

তাছাড়া, সনাতন ধর্মের পবিত্র উপনিষদে আছে, ‘‘মাতৃ দেব ভব”৷ অর্থাৎ মা দেবী স্বরূপিনী, জীবন্ত ঈশ্বরী৷ তাছাড়া হিন্দুধর্মে মহাশক্তি, আদিশক্তি, রক্ষাকর্ত্রীর ভূমিকায় আমরা যাঁদের পেয়েছি, তাঁদের কিন্তু আমরা মাতৃরূপেই চিনেছি৷ এ জন্য কুসন্তান বলা হলেও, কুমাতা কখনও বলা হয় না৷

কবিরা ভাবপ্রবণ, সাধারণ মানুষের চেয়ে তারা একেবারেই আলাদা। মায়ের প্রতি তারা তাদের শ্রদ্ধা-ভক্তি-ভালোবাসা ব্যক্ত হয়েছে তাদের রচিত কবিতায়। যেমন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘মা’ কবিতায় তিনি মায়ের যে অপরূপ ছবিটি এঁকেছেন তা অতুলনীয় : “যেখানেতে দেখি যাহা/ মা-এর মতন আহা ,প্রখ্যাত কবি কাজী কাদের নেওয়াজ মা সম্পর্কে তাঁর ‘মা’ কবিতায় বলেছেন : “মা কথাটি ছোট্ট অতি কিন্তু জেনো ভাই/ ইহার চেয়ে নাম যে মধুর ত্রিভুবনে নাই।”মুহাম্মদ হাবীব উল্লাহ-মায়ের প্রতি ভালবাসা ,হুমায়ূন আজাদ-আমাদের মা , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-বীরপুরুষ/মনে পড়া/লুকোচুরি ,শামসুর রাহমান-কখনো আমার মাকে , কামিনী রায় -কত ভালবাসি কবিতা লিখেছেন। শিল্পীরা রসপ্রবন। সাধারণ মানুষের চেয়ে তারা একেবারেই আলাদা। মায়ের প্রতি তারা তাদের শ্রদ্ধা-ভক্তি-ভালোবাসা ব্যক্ত করেছেন তাদের গানে। খুরশীদ আলম-মাগো মা ওগো মা, আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা , ফকির আলমগীর-মায়ের একধার দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম , ফেরদৌস ওয়াহিদ-এমন একটা মা দে না ,জেমস-রাতের তারা আমায় কি তুই বলতে পারিস ,রাশেদ-ওই আকাশের তারায় তারায ,নচীকেতা ঘোষ-ছেলে আমার মস্ত বড় মস্ত অফিসার ,হেমন্ত মুখোপাধ্যায়-পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহ ভরা কোলে তব মাগো।

এ দিনে আন্তর্জাতিক মা দিবস হলেও সব দেশ এই দিবসটি পালন করা হয় না। আসলে অনেক দেশেরই আলাদা আলাদা মা দিবস আছে। বাংলাদেশেও দিবসটি আজ নানা আঙ্গিকে পালিত হচ্ছে। ২০০৩ সাল থেকে আজাদ প্রোডাক্টস প্রা. রতœাগর্ভা মায়েদের সম্মাননা জানিয়েও আসছে। অবশ্য কিছু দেশ ব্যতিক্রম রয়েছে এক্ষেত্রে। তবে কিছু দেশে রয়েছে মা দিবস উদযাপনের মজার ব্যতিক্রমধর্মী রীতি।

সুইডেন
সুইডেনে মে মাসের শেষ রবিবার মা দিবস পালিত হয়। মা দিবস উপলক্ষে শিশুরা ছোট প্লাস্টিকের ফুল বিক্রি করে। ফুল বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যায়, তা দিয়ে মাকে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়াও মাকে নিয়ে যাওয়া হয় তার প্রিয় রেস্তোরাঁয়, উপহার দেয়া হয় ফুলের গুচ্ছ।

যুগোস্লাভিয়া
যুগোস্লাভিয়ায় মা দিবস উদযাপন করা হয় ডিসেম্বর মাসে। এখানের মা দিবস উদযাপনের রীতি সম্ভবত সবচেয়ে অদ্ভুত। এ দেশে শিশুরা মা দিবসের সকালে মায়ের বিছানায় উঠে তাকে বেঁধে ফেলে শক্ত করে। সন্তানকে উপহার না দেয়া পর্যন্ত এই বাঁধন থেকে মুক্তি মেলে না মায়ের।

জাপান
মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মা দিবস উদযাপিত হয় জাপানে। এখানে মা দিবসকে বলা হয় ‘হাহা নো হি’ শিশুরা নিজের হাতে চিত্রাঙ্কন করে এবং নাম দেয় ‘আমার মা’ এসব চিত্রাঙ্কনের প্রদর্শনী করা হয় এবং সব চিত্রাঙ্কন বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। অনেক বছর ধরে জাপানে এই রীতি চলে আসছে।

মেক্সিকো
মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মা দিবস পালিত হয় মেক্সিকোতে। এখানে মা দিবস উদযাপিত হয় উৎসবমুখর পরিবেশে। মা দিবসের আগের সন্ধ্যায় সন্তানরা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যায় এবং মাকে হাতে তৈরি কার্ড, উপহার এবং ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়।

তাইওয়ান
তাইওয়ানে মা দিবসের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে, কেননা এ দেশে মা দিবস পালিত হয় মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার, যেদিন বুদ্ধর জন্মদিন। এজন্য তাইওয়ানে মা দিবস একটি অত্যন্ত পবিত্র উৎসব। দেশজুড়ে মহা ধুমধামের সঙ্গে উদযাপিত হয় দিনটি।
আফসোস করে বলতে হয় এতো আয়োজন যে মাকে নিয়ে এমন ‘মা’কেও যারা কষ্ট দেন তারা সত্যিই মানুষ কি না আমার প্রশ্ন জাগে। স্ত্রীর প্ররোচনায় হোক কিংবা অন্য যে কোনো কারণেই হোক, মাকে অনেকেই কষ্ট দিয়ে থাকেন। হাল আমলে ঝামেলা মনে করে অনেকে বাবা-মাকে রেখে আসেন বৃদ্ধাশ্রমে; কিন্তু যারা এ কাজ করেন কখনও কী ভেবে দেখেছেন তারাও একদিন বৃদ্ধ হবেন, তারাও মা-বাবা হবেন? তাদের নিয়তিতেও যে এমন কিছু লেখা নেই, তার নিশ্চয়তা কি? মা তো মা’ই। সন্তানের এমন আচরণও তারা কিভাবে যেন পরম মমতায় ক্ষমা করে দিতে পারেন! ভাবতে পারি না আল্লাহ তাদের হৃদয়ে কী এমন স্নেহের সমুদ্র সৃষ্টি করে দিয়েছেন!

যাদের ‘মা’ আজ বেঁচে নেই, তারা পৃথিবীর সবচেয়ে অমূল্য সম্পদটিই হারিয়েছেন। জন্মান্তরের বাঁধন ছিড়ে ‘মা’ আজ স্রষ্টার সান্নিধ্যে। পৃথিবীর সবাই আপনার কাছে ভালবাসার প্রতিদান চাইতে পারে, এমনকি আপনার স্ত্রীও; কিন্তু একমাত্র মা! মা’রাই পারেন কোন প্রতিদানের আশা না করে আপনাকে ভালোবাসতে। মায়ের অভাব আপনিই হয়তো বুঝতে পারবেন অনেক বেশি (ব্যস্ত এ পৃথিবীতে অনেকের অবশ্য সে বোধ এখন আর নেই)।

মা আমরা আপনার সন্তান। অনেক ভুল, অনেক অপরাধ জেনে হোক বা না জেনে হোক, হয়তো করে ফেলেছি। মা আমরা জানি আপনি দয়ার সাগর। সন্তান যখন আপনার সামনে অপরাধ স্বীকার করে দাঁড়ায় তখন কোন ‘মা’র হৃদয় নরম হয় না বলুন! আপন মহিমায় আপনি আমাদের ক্ষমা করবেন এটাই প্রত্যাশা। ‘মা’ দিবস বলেই নয় শুধু, বছরের প্রতিটি দিনই এ প্রার্থনা আপনার কাছে আমাদের। আর ¯্রষ্টার কাছে প্রার্থনা, ‘হে আল্লাহ ছোট্টবেলায় মা-বাবা আমাদের যেভাবে লালন-পালন করেছেন তুমিও ঠিক সেভাবে তাদের লালন-পালন করো। পৃথিবীর সব মা দের জন্য রইল মা দিবসের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।

লেখক: শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here