বাংলাদেশে রোজা মানেই নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি!

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

সরকারের মন্ত্রীরা এবার বলে আসছিলেন এবারের রোজায় নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। ব্যবসায়ীরাও বলে আসছিলেন এবারের রোজায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে না। কিন্তু শেষপর্যন্ত আমরা কী দেখলাম! এবারও রোজায় বাজার কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি। বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম কোনো অজুহাত ছাড়াই আজ ঊর্ধ্বমুখী। আর গতকাল ঢাকা দক্ষিণের মেয়রও স্বীকার করলেন, ‘বাজারদর ঊর্ধমুখী’। অর্থাৎ, সরকার কিংবা ব্যবসায়ীদের আশ্বাস কোনো কাজে লাগেনি। অথচ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সব পণ্যের মজুদ চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি থাকায় মূল্যবৃদ্ধির কোনো আশঙ্কা নেই। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাজারে সব জিনিসের দামই বেড়েছে। রোজার সময় চিনির ব্যবহার বেড়ে যায়। বাজারে চিনি বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকা কেজি দরে। অথচ আমদানি ক্ষেত্রে গত ডিসেম্বর থেকে চিনির দাম টনপ্রতি ৫০ ডলার কমেছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর ঢাকায় পিঁয়াজের পাইকারি আড়তে অভিযান চালিয়ে বস্তার গায়ে দাম ও পরিমাণ লেখার নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও ব্যবসায়ীরা এ নির্দেশনা তোয়াক্কাই করছে না। কথা ছিল বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, র‌্যাব-পুলিশের ভ্রাম্যমাণ আদালত, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার মনিটরিং টিমসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা আগে থেকে রমজানকেন্দ্রিক পণ্যের বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও জাল-জালিয়াতি নিয়ে নজর রাখবে। কিন্তু বাস্তবে সেটাও হয়নি। ফলে বাজারদরে কোনোই নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। এরকম নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট জিনিসপত্রের দাম যেমনখুশি বাড়িয়ে চলেছে। এক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ কিংবা আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যের ওঠানামা নয়, আমাদের এখানে পণ্যের দাম বাড়ে বাজার সিন্ডিকেটের অদৃশ্য ভেলকিতে।

কেউ মনে করতে পারেন, এই সিন্ডিকেটের কাছে সরকার বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অসহায়। কিন্তু আমাদের মনে হয় তাও নয়। এক্ষেত্রে সরকার বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সদিচ্ছা কতোটা বিশ^স্ততাপূর্ণ সে নিয়ে আমাদের ঘোরতর সংশয় রয়েছে। প্যাকেটজাত পণ্যের ক্ষেত্রে প্যাকেটের গায়ে পণ্যের দাম লেখা আছে কি না, উৎপাদন ও মেয়াদ ঠিকঠাক আছে কি না এসব নিয়ে মোবাইল কোর্ট সর্বশেষ কবে পরিচালিত হয়েছে? এদিকে গত বুধবার আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবি জানিয়েছে, দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া পাস্তুরিত দুধের ৭৫ শতাংশেরও বেশি সরাসরি পানের জন্য নিরাপদ নয়। ওই দুধ বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া এবং পাঁচটি জেলার ১৫টি হিমাগার থেকে সংগৃহীত নমুনায় মলবাহিত কলিফর্ম পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশের নমুনাই কোলাই দ্বারা উচ্চমাত্রায় দূষিত। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, দুগ্ধ খামার থেকে শুরু করে বিক্রির জন্য পাঠানো প্রতিটি পর্যায়ে দুধ ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত। আর রোজায় তো স্বাভাবিকভাবেই এই দুধের চাহিদা বেড়ে যায়। তাহলে আমাদের পাত্রে কী দুধ তুলে দেওয়া হচ্ছে? আর এসব ঘটনা ঘটছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঠিক নজরদারি না থাকার কারণেই। প্রায় প্রতিটি পণ্যে ভেজাল দেওয়া যেন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। যেহেতু অনৈতিকভাবে দাম বাড়ালে কিংবা ভেজাল দেওয়া হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কোনো খবরদারি থাকে না, শাস্তি হয় না। কাজেই ব্যবসায়ীরাও এখন সবক্ষেত্রে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে।

কাউকেই তারা পরোয়া করছে না। যেন তারাই এ দেশের সরকার। তারাই এ দেশকে মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন করেছে। তাই তারা পণ্যের দাম বাড়ানো ও ভেজাল মেশানো ক্ষেত্রে যেমন খুশি তেমন স্বাধীনতা ভোগ করার একমাত্র অধিকারী হয়ে গেছে। সারা বছরের জন্য তাদের যে স্বাধীন চরিত্র তৈরি হয়ে আছে সেটা যেন রোজার মাস এলেই আরো কয়েকগুণ বেশি হয়ে উঠে। এখন আমরা কি সরকারের ওপর এই ভরসা করতে পারি যে, ব্যবসায়ীদের এই ভেজাল মিশ্রণ ও লাগামহীন দাম বৃদ্ধি রোধেও দেশের দৃশ্যমান উন্নয়নের মতো কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে?

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here