বাংলাদেশে অনলাইনে যেভাবে চলছে রমরমা দেহ ব্যবসা

::ভোরের পাতা ডেস্ক::

‘বাসায় কি একা? …করতে অস্থির? কলেজ ও ভার্সিটির ছাত্র? স্বামী কাছে নেই অথবা বিদেশে? তুমি কি তোমার শরীরও…চাও? বিশেষ করে মামা, চাচা, ভাগিনা, ভাইস্তে বা ছোট ভাই বা ছেলে বানিয়ে বাসায় এনে করাতে পারেন। যেভাবে চান, সেভাবেই করা যাবে। আর কষ্ট করার দরকার নাই। এখনই যোগাযোগ করেন। আমি আছি আপনাদের জন্য।’

‘কাজের কথা ছাড়া আজাইরা কথা বলে বিরক্ত করলে ডাইরেক্ট ব্লক মারতে বাধ্য হব। রিয়েল সেক্স ফুল নাইট ১৫০০ টাকা, ভিডিও সেক্স ৫০০ টাকা, ফোন সেক্স ৩০০ টাকা, চ্যাট সেক্স ২০০ টাকা।’

উপরের মন্তব্যগুলো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকের দুটি অ্যাকাউন্টের পোস্ট থেকে নেওয়া। ফেসবুক ছাড়াও এ ধরনের কিছু ওয়েবসাইট রয়েছে। এগুলোতে বিভিন্ন লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে খদ্দের হতে বলা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে এমনটি বেরিয়ে এসেছে। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা না থাকায় এই পেজ ও ওয়েবসাইটগুলো কে বা কারা পরিচালনা করছে, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা যায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনলাইনভিত্তিক এই গ্রুপগুলো বাসায় বা ফ্ল্যাটে যৌনকর্মী সরবরাহ করার কথা বলছে। এমনকি শত ভাগ সততা ও গোপনীয়তার সঙ্গে কাজ করার নিশ্চয়তাও দেওয়া হচ্ছে।

ফেসবুকে কার্যক্রম চালানো গ্রুপগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো ‘…সার্ভিস’। এ ধরনের বাণিজ্য বিশ্বের অন্য অনেক দেশে চালু থাকলেও বাংলাদেশে এর কথা গণমাধ্যমগুলোতে খুব একটা শোনা যায়নি। এই গ্রুপে নারী ও পুরুষ যৌনকর্মী সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি এই গ্রুপের কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

‘কল গার্ল’

ফেসবুকে নারী যৌনকর্মীদের উৎসাহিত করতে বেশ কিছু অ্যাকাউন্ট, পেজ ও গ্রুপ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অন্যতম ‘…কলগার্ল’, ‘…কল গার্ল সার্ভিস’। এগুলোতে নারীদের যৌন আবেদনময়ী ছবি তুলে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। তবে এসব বিজ্ঞাপনে তাদের কোনো যোগাযোগের নম্বর বা ঠিকানা দেওয়া থাকে না। শুধু ইনবক্সে যোগাযোগ করতে বলা হয়।

ইনবক্সে ‘হাই বা হ্যালো’ বললে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ফিরতি বার্তা আসে। উত্তর দিলেই শুরু হয় দরদাম।

‘কল বয়’

দেশে যৌন ব্যবসার সঙ্গে শুধু নারীরা যুক্ত বলে অনেকেরই ধারণা। তবে পুরুষদের এ ধরনের কাজে যুক্ত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে কিছু পেজ, গ্রুপ ও অ্যাকাউন্ট। অনলাইনে পুরুষ যৌনকর্মীদেরও বিজ্ঞাপন পাওয়া যাচ্ছে। তারাও ইনবক্সে যোগাযোগ করতে বলছে।

৬ মে ‘আমি…বয়’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টের পোস্টে লেখা হয়, ‘ডিয়ার লেডিস, আর ইউ লোনলি হাউজওয়াইফ, ডিভোর্সড লেডি, সিঙ্গেল গার্ল, ফরেনার লেডি? লুকিং ফর ফুল বডি ম্যাসেজ, ট্র্যাভেল, ফান সার্ভিস, পাসটাইম? উইথ ফুললি প্রাইভেসি অ্যান্ড সিক্রেসি। প্লিজ কন্টাক্ট মি। হোপ ইউ উইল গেট হাই সেটিসফেকশন উইথ মি। ফিল ফ্রি টু ইনবক্স মি। সো লেডিস…। অনলি ফর লেডিস।’

এস্কর্ট সার্ভিসের নামে সক্রিয় গ্রুপগুলো

যৌন চাহিদা মেটানোর জন্য এস্কর্টস সার্ভিস নামে কিছু গ্রুপ খোলা হয়েছে। এগুলোতে লোভনীয় বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। ফেসবুকে থাকা এমন কিছু গ্রুপ হলো ‘…এস্কর্টস সার্ভিস’, ‘এস্কর্টস…ঢাকা’, ‘মেইল…মোহাম্মদপুর-ধানমণ্ডি’, ‘বিডি…সার্ভিস’, ‘ঢাকা…এজেন্সি’, ‘মেইল…গুলশান…’, ‘বালক…’।

এমন একটি গ্রুপের প্রতিটি পোস্টে একজন করে মেয়ের নাম ও বর্ণনা থাকে। ঢাকা ছাড়াও দেশের আর কোথায় কোথায় সার্ভিসের জন্য যেতে পারবে, তার বর্ণনাও আছে। আর শেষে প্রতি ঘণ্টায় ডলার ও টাকার হিসাব দেওয়া থাকে।

এস্কর্ট সার্ভিসের অপর একটি গ্রুপে দেওয়া একজন পুরুষ এস্কর্টের বর্ণনা পাওয়া গেছে। সেটিতে নারীদের উদ্দেশে লোভনীয় কিছু কথাবার্তা বলা হয়েছে। এরপর দেওয়া আছে মূল্য তালিকা। আর সর্বশেষ দেওয়া আছে, ওই এস্কর্টের নিজস্ব কিছু শর্ত। এই শর্তের অন্যতম হলো, যে নারী খদ্দের এস্কর্ট সার্ভিস নিতে ইচ্ছুক, তার নিজের উদ্যোগেই বাসা বা ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করতে হবে।

‘এস্কর্টদের ওয়েবসাইট’

খদ্দেরদের আকৃষ্ট করতে এস্কর্ট সার্ভিস দেওয়ার দাবি করা কিছু ওয়েবসাইট পাওয়া গেছে। এসব ওয়েবসাইটে বিভিন্ন বয়সী নারী ও পুরুষের বিজ্ঞাপন দেওয়া আছে। তেমনই একটি ওয়েবসাইটের নাম হচ্ছে, ‘বাংলাদেশ…কম’। এই ওয়েবসাইটের পেজগুলোতে ক্লিক করে এস্কর্ট-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।

ইনবক্সে যে বার্তা দেখায়

ফেসবুকে দেওয়া বিজ্ঞাপন দেখে এই প্রতিবেদক একটি পেজের ইনবক্সের অপশনে যান। সে সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিছু বার্তা প্রদর্শন করা হয়। এগুলোর মধ্যে ছিল, ‘হোয়াট সার্ভিস ডু ইউ অফার? হাউ মাচ ডু ইয়র সার্ভিস কস্ট? ডু ইউ হ্যাভ অ্যানি আপয়নমেন্ট এভেইলেবল টুডে? ক্যান আই লার্ন মোর অ্যাবাউট অ্যা সার্ভিস?’

ভাসমান যৌনকর্মীরা সুবিধা নিচ্ছে অনলাইনের

রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, জিয়া উদ্যান, রমনা পার্ক, কারওয়ান বাজারসহ বেশ কিছু এলাকায় সন্ধ্যার পর খদ্দের খুঁজতে দেখা যায় ভাসমান যৌনকর্মীদের। সন্ধ্যা নামলেই তারা সাজগোজ করে কিংবা মুখ ঢেকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে খদ্দেরকে আকৃষ্ট করে। এমন যৌনকর্মীরা অনলাইনের সুবিধা নিচ্ছেন বলে প্রমাণ মিলেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যৌনকর্মী জানান, রাস্তায় দাঁড়িয়ে খদ্দের খুঁজতে হলে কিছু দালালকে টাকা দিয়ে পুষতে হয়। আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও তাদের যখন-তখন ধরে নিয়ে যায়। অনলাইন ব্যবহার করে এসব ঝামেলা থেকে কিছুটা মুক্তি পেয়েছেন তারা।

ওই যৌনকর্মী বলেন, ‘রাস্তায় খাড়াইলে দালালগো টাকা দেওন লাগে। পুলিশ আইস্যা ঝামেলা করে। কিন্তু আমার এক বান্ধবী আমারে ফেসবুকে আইডি করে দিছে। ওহানে ইচ্ছামতো কিছু লিইখা দিলে কাস্টমার পাওন যায়। আমার ওই বান্ধবী আরও কিসের যেন গ্রুপ বানাইছে। ওহান থেইক্যাও কাস্টমার পাওন যায়।’

বৈধতা আছে?

অনুমতি ছাড়া অনলাইনে শারীরিক সম্পর্কের জন্য খদ্দের খোঁজা কিংবা যৌন ব্যবসা বাংলাদেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাসুদ রানা। তিনি জানান, দণ্ডবিধি, সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল ও পুলিশ কমিশনারের অধীনে এ ধরনের অপরাধের মামলা ও বিচার করা যায়। অপরাধ প্রমাণিত হলে বিচারিক হাকিম দণ্ড দিতে পারেন। সাজার মেয়াদ অপরাধের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।

মাসুদ রানা বলেন, ‘জড়িতদের যথাযথ শাস্তি দেওয়া হলে এই অপরাধগুলো কমে যাবে।’

পুলিশের ভাষ্য

ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনলাইন এস্কর্টস সার্ভিস প্রোভাইডার পরিচয় দেওয়া সাতজনকে গত ১৫ এপ্রিল গ্রেফতার করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) সুমন কান্তি চৌধুরী জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ১৫ এপ্রিল সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের ডিজিটাল ফরেনসিক টিম গুলশান ও বাড্ডা এলাকা থেকে ওই সাতজনকে গ্রেফতার করে।

সুমন কান্তি আরও জানান, গ্রেফতারকৃতরা ফেসবুক আইডি, গ্রুপ, পেজ, ইউটিউব চ্যানেলসহ অন্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেদের অনলাইন এস্কর্টস সার্ভিস প্রোভাইডার পরিচয়ে বিভিন্ন বয়সী নারীদের দিয়ে এস্কর্টস সার্ভিসের ব্যবসা করে আসছিল। তারা ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ‘অশালীন ছবি’ ও মোবাইল নম্বর পাঠিয়ে নানা ধরনের প্রচারণা চালাত। গ্রেফতারের পরে তাদের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

পুলিশের এই কর্মকর্তার দাবি, ‘এই ধরনের ব্যবসার সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের খোঁজা হচ্ছে। তাদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত অাছে।’

সূত্র: প্রিয়.কম

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here