বাংলাদেশের প্রমীলাদের এশিয়া জয়

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

ঠিক এর আগের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরটি কী বাজেভাবেই না শেষ করতে হয়েছিল একেবারেই তলানিতে থেকে এই তাদেরকেই! কিন্তু সেই ‘গোহারা’রা তারপরও কী করে এত আত্মবিশ্বাস খুঁজে পেতে পারে? হ্যাঁ, এই আত্মবিশ্বাসের জোরেই ‘আমরা ফাইনাল খেলব’- নারী এশিয়া কাপ খেলতে মালয়েশিয়া যাওয়ার আগে এমন আশার কথাই বলেছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক সালমা খাতুন। হতাশাময় ওই দক্ষিণ আফ্রিকা সফরটি কাটিয়ে আসা দলের অধিনায়কের মুখে এমন কথাকে তখন ‘অতি আত্মবিশ্বাস’ ভেবেছিলেন অনেকে। কেননা, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের ছেলেরা ইতোমধ্যেই ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম সমীহকাড়া শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটালেও প্রমীলা ক্রিকেটে এ ধারা অনেকটাই নিষ্প্রভ ছিল।

ছেলেদের ক্রিকেটে এ দেশে রকিবুল হাসান, আশরাফুল ইসলাম লিপু, আতাহার আলী খান, আকরাম খান, মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, নাঈমুর রহমান দুর্জয়, মোহাম্মদ রফিক প্রমুখ তারকা ক্রিকেটারের ধারাবাহিকতা ধরে অতঃপর একে একে আবির্ভূত হন হাবিবুল বাশার সুমন, খালেদ মাহমুদ পাইলট, সাকিব আল হাসান, তামিম, মুশফিকুর রহিম, মোস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ ক্রিকেটার বিশ^ ক্রিকেটে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আসেন। সে তুলনায় এ দেশের প্রমীলা ক্রিকেটারদের উল্লেখযোগ্য কারো নাম কাউকে বলতে গেলে নিশ্চয়ই অধিকাংশ ক্রিকেটপ্রেমিকই আমতা আমতা করে বড়জোর সালমা পর্যন্তই যেতে পারবেন। সম্ভবত আর তেমন কারো নামই উল্লেখ করতে পারবেন না। তারওপর কেননা ২০১১ সালে ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়ার পর গত কয়েক বছরে সুখবরই দিতে পারেননি সালমা-জাহানারারা। বোধ করি, সে কারণেই মালয়েশিয়ায় এশিয়া কাপ খেলতে যাওয়ার আগে দলটিকে নিয়ে খুব একটা আমলে নেয়নি কেউ। বরং এই প্রমীলা ক্রিকেটের চেয়ে দেশবাসীর চোখ ছিল বাংলাদেশ-আফগানিস্তান সিরিজের দিকেই। কিন্তু রশীদ খান-মোহাম্মদ নবীদের বিপক্ষে ধরাশায়ী হওয়ার পর ফের যেন ক্রিকেট বিমুখই হয়ে উঠেছিলেন ক্রিকেটভক্ত ও সমর্থকরা। অনেকে তো এই হারে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ‘অপমৃত্যু’ পর্যন্ত লিখে ফেলেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের ক্রিকেটের ‘এপিটাফ’ ঘোষণা করেছিলেন অনেকে। সেই ‘এলিজি’র ওপরই এলো গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহের মধ্যে সহসা এক পশলা হিমেল বরিষণের মতো এই শুভবার্তা; ‘বাংলাদেশের প্রমীলা ক্রিকেটারদের প্রথম এশিয়া জয়’।

অর্থাৎ, অবশেষে ভারতের প্রমীলাদের হারিয়ে এশিয়া কাপের শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশের সালমা-রুমানা-শামীমারা। বাংলাদেশের গোটা ক্রিকেট ইতিহাসেই এটি প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা। এর আগেও তিনবার এশিয়ার সাম্রাজ্য পেতে গিয়েও হাতছাড়া হয়েছে বাংলাদেশের। ২০১২ সালের এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২ রানের কান্নাভেজা হার কারোরই ভোলার কথা নয়। এরপর ২০১৬ সালের আসরে ভারতের কাছে হারতে হয় মাশরাফি-সাকিবদের। আর এ বছর সেই ভারতের কাছেই হাতছাড়া হয় নিদাহাস ট্রফির শিরোপা। মাশরাফিদের হারের সেই দুঃস্মৃতিগুলো নিশ্চয়ই মনে ছিল সালমাদের। আর তাই এবার এশিয়ায় প্রমীলা ক্রিকেটের পরাশক্তি সেই ভারতকে মোক্ষমমতো কপোকাত করেই প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা এলো লাল-সবুজের দেশে। ১১৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৭ উইকেট হারিয়ে জয় তুলে নেয় সালমা-রুমানা-জাহানারারা। ভারতের প্রমীলা দলকে ৩ উইকেটে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হলো টাইগ্রেসরা। হারিয়েছে ছয়বারের এশিয়া চ্যাম্পিয়ন ভারতকে। শুধু কি তাই! বাংলাদেশের প্রমীলারা অর্জন করেছে অপরাজিত শিরোপা জয়ের গৗরবও। এই জয়ে বাংলাদেশের প্রমীলা ক্রিকেট দলকে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভিনন্দন জানিয়েছেন। জয়তু বাংলাদেশ।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here