বজ্রপাতে মৃত্যু: রোধের উপায় নির্ধারণই প্রত্যাশিত

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বাংলাদেশের ঋতু চরিত্রে কালবৈশাখী একটি অতি স্বাভাবিক ঘটনা। বৈশাখ মাস আসবে আর ‘কালবৈশাখী’ হবে না, এ যেনো এ দেশের এই ঋতুর সঙ্গেই বেমানান। আর এর সঙ্গে বজ্রপাত তো আছেই। এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে বিগত কয়েক বছর যাবৎ যে হারে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে চলেছে তা দেশের মানুষের মধ্যে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। ইদানীং এর মাত্রা চরম আকারে পৌঁছেছে। বজ্রপাত, বজ্রবৃষ্টি, বজ্রঝড়ের সঙ্গে যেন তাল মিলিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর হার। ফলে মানুষের মধ্যে ভয়-আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। কৃষক মাঠে গিয়ে ফিরে আসতে পারবে কিনা এ নিয়ে আশঙ্কার মধ্যে থাকতে হচ্ছে কৃষকবধূকে। তার সন্তানসন্ততিকে। সাধারণত বাংলাদেশে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রাক-বর্ষা ও বর্ষা মৌসুমে শুষ্ক এবং গরম আবহাওয়ায় হঠাৎ আকাশে মেঘ জমলে বজ্রপাতের ঝুঁঁকি বেশি হয়ে থাকে। গতকালকের গণমাধ্যমে প্রকাশ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একদিনেই বজ্রপাতে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এভাবে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই বজ্রপাতে কারও না কারও মৃত্যু হচ্ছে। বজ্রপাতে মৃত্যুর দিক থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে দেশের হাওরাঞ্চলগুলো। প্রকাশ থাকে যে, বজ্রপাতে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয় বাংলাদেশে। এ জন্য এটা রোধে সরকার দেশে তালবীজ রোপণের উদ্যোগ নেয়। এ উদ্যোগ ছাড়াও অন্য উদ্যোগে আছে, সাইনটিফিক পদ্বতিতে একটি ডিভাইসের মাধ্যমে প্রথমে বজ্রপাত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নিরুপণ করা হবে।

পরে অন্য একটি ডিভাইসের মাধ্যমে বজ্রপাত নিরোধের প্রচেষ্টা চালানো হবে। ইতোমধ্যে দেশের বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করতে আট জেলায় নতুন প্রযুক্তি ‘লাইটেনিং সেন্সর’ লাগানো সম্পন্ন করেছে সরকার। ঝড়-বৃষ্টির সময় কোন জেলায় কখন বজ্রপাত হয়েছে বা কতবার বিদ্যুৎ চমকেছে তার হিসাব নিতেই এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির লাইটেনিং ডিটেকটিভ সেন্সর বসানো হয়। অন্যদিকে, তালগাছ অনেক দীর্ঘ হয় বিধায় এগুলো বজ্রপাত নিরোধী ভূমিকা পালনে সক্ষম বিবেচনায় এই তাল গাছ রোপণ কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। এখন এই উদ্যোগ কতটুকু এগোল তা আমাদের জানা নেই। হঠাৎ করে কয়েকবছরে এভাবে বজ্রপাত বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বায়ুদূষণ, আবহাওয়ার পরিবর্তন ও মোবাইল ফোনের ব্যবহারের উদ্দেশে টাওয়ার বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করেছেন। বজ্রপাতের ঘাত সাধারণত মফস্বল অঞ্চলের ওপর দিয়েই যায়। এর কারণ, গ্রামে অধিকাংশ বাড়ি টিনের তৈরি, খোলা উন্মুক্ত ময়দানে থাকে।

খোলা মাঠে-ময়দানে, বিলে, হাওর-বাঁওড়ে, নদীতে খোলা জায়গায় বজ্রপাত সরাসরি আঘাত করে এবং এতে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। যেকারণে কৃষক-কৃষাণি, জেলে ও মাঝিমাল্লা, শ্রমজীবী, পথচারীসহ খোলা জায়গায় বিচরণকারী মানুষ বজ্রপাতের শিকার হন সবচেয়ে বেশি। তা ছাড়া আমাদের দেশে জনঘনত্বও পৃথিবীর অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি। তার ওপর ভবন নির্মাণের সময় বজ্রপাত-সহায়ক স্থাপনার ব্যবহারও তেমন নেই। যেকারণে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। বজ্রপাত যেহেতু প্রাকৃতিক এবং এর ওপর কোনো রাষ্ট্র বা সরকারের হাত নেই, কাজেই এ জন্য মানুষকে সচেতনতা অবলম্বনের বিকল্প কিছু নেই। তাই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন গুমোট হয়ে এলে কিংবা বৃষ্টির সময় খোলামেলা জায়গা এড়িয়ে নিরাপদ অবস্থান নেওয়া উচিত।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here