বঙ্গবন্ধু এবং তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

তাবলিগ জামাত সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা অস্পষ্ট। তাবলিগ হচ্ছে শেষ নবী হযরত মুহম্মদ (সঃ) যে মিশন নিয়ে দুনিয়াতে এসেছিলেন অর্থাৎ মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, সেই পবিত্র কাজকে কেয়ামত পর্যন্ত জারি রাখার একটি অরাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় যারা জড়িত তাদেরকেই তাবলিগ জামাতের লোক বলে আমরা জানি। বর্তমান ধারায় এই তাবলিগি কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা করেন মাওলানা ইলয়াস (রহ.)। ১৯২০ সালে তিনি এই তাবলীগ আন্দোলন শুরু করেন। এ কর্মপ্রয়াসকে তিনি বলতেন ‘ইসালে নফস’ বা আত্মশুদ্ধির প্রাথমিক পাঠ। প্রথমত, তিনি টেস্ট কেস হিসেবে ভারতের সাহারানপুর ও মেওয়াত এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। তিনি ৬টি বিশেষ গুণ অর্জনের মেহনত করার জন্য মানুষকে বলেন। সেই ৬টি বিশেষ গুণ হলো : কালেমা, নামাজ, এলেম ও জিকির, ইকরামুল মুসলিমিন (মুসলমানদের সেবা), সহিহ নিয়ত ও তাবলিগ।

যখন বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের প্রচেষ্টা শুরু হয়, তখন এর নাম ছিলো শুধুই ইজতেমা। যা অনুষ্ঠিত হতো ঢাকার কাকরাইল মসজিদে। ১৯৬৪ সালে কাকরাইলে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের ইজতেমা শুরু হয়। তারপর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে, তারপর টঙ্গীর পাগারে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৬৭ সালে টঙ্গীর পাগার গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্ব ইজতেমা। স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাবলিগের এই কাজকে কীভাবে একটা স্থায়ী রূপ দিয়ে এগিয়ে নেওয়া যায় সেই চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন। তিনি টঙ্গীর বিভিন্ন মৌজায় বিশ্ব ইজতেমার জন্য ১৬০ একর ভূমি বরাদ্দ দেন। তারই সুযোগ্য কন্যা বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ নির্দেশনায় পরবর্তী উন্নয়ন কাজগুলো সমাপ্ত হয়।

সুদীর্ঘ সাড়ে তিন যুগ ধরে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বিশ্ব ইজতেমা। যে ইজতেমায় অংশগ্রহণ করে বিশ্বের প্রায় দেড়শ রাষ্ট্রের তাবলিগ প্রতিনিধিরা। মুসলিম উম্মাহর সর্ববৃহৎ সম্মিলন পবিত্র হজে যেমন বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের মুসলমানদের সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য আর ঐক্যের অভাবনীয় নজির দেখা যায়, বাংলাদেশের বিশ্ব ইজতেমায়ও দেখা যায় মুসলিম ঐক্যের এক অপূর্ব মিলনমেলা। এর ফলে পুণ্যভূমি মক্কা-মদিনার পর তুরাগ নদীর তীরে অবস্থিত টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা পরিচিতি লাভ করে বিশ্ব মুসলিমের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিলনকেন্দ্র হিসেবে। সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত এই তাবলিগ আন্দোলনকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইসলামি আন্দোলন বলা হয়ে থাকে।

বর্তমানে কাকরাইলের যে মসজিদে কেন্দ্রীয়ভাবে তাবলিগ জামাতের মারকাজ অনুষ্ঠিত হয় এ মসজিদটি ছিল খুবই অপ্রশস্ত। বঙ্গবন্ধু কাকরাইলের তাবলিগ জামাতের মারকাজ মসজিদের জন্য স্থান বরাদ্দ করেন এবং মসজিদটি তারই নির্দেশে সম্প্রসারিত হয়।

এছাড়া রাশিয়া (তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন) ছিল একটি কমিউনিস্ট দেশ। সেদেশে বিদেশ থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য কেউ অনুমতি পেত না। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে রাশিয়া সহযোগিতা করায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সেদেশের নেতৃবৃন্দের একটি সুদৃঢ় বন্ধুত্বের ভিত্তি রচিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে স্বাধীনতার পর প্রথম রাশিয়া তথা সোভিয়েত ইউনিয়নে তাবলিগ জামাত প্রেরণের ব্যবস্থা করেন। বর্তমানে পূর্বের সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে তাবলিগ জামাতের যেসব দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে তার ভিত্তি রচনা করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here