বঙ্গকন্যার প্রত্যাবর্তন, বঙ্গদেশের বদলে যাবার ইতিহাস

::অনিমেষ চক্রবর্তী::

১৭ মে ১৯৮১। এক সুদীর্ঘ মর্মান্তিক প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু কন্যা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। এই দিনটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নরঘাতকেরা ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংসতম হত্যাকান্ডের মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুর দুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ঐসময় বেলজিয়ামে নিযুক্ত বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাসায় অবস্থান করায় সৌভাগ্যক্রমে ঘাতকের নির্মমতার হাত থেকে রক্ষা পান। পরবর্তীতে খোন্দকার মোশতাক গং এবং তৎকালীন অবৈধ রাষ্ট্র নায়ক জিয়াউড় রহমান এর কারণে বিদেশের মাটিতে পালিয়ে ভাসমান দুঃসহ জীবন কাটাতে হয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যাদ্বয়কে। ৬ বছর পশ্চিম জার্মানি, লন্ডন ও দিল্লীতে তাঁদের চরম প্রতিকূল পরিবেশে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে দিয়ে বাঙালি জাতির অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা শুরু করে নানামুখী ষড়যন্ত্র। যে বিশ্বাস আর মূলনীতির উপর দাঁড়িয়ে ৭১ এর মুক্তির সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিল, নিমেষেই পদদলিত করা হয় মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি সমূহ। জাতির পিতা পরিবারের হন্তারকদের পুরস্কৃত করা হয় দেশে এবং বিদেশে বিভিন্ন মিশনে চাকুরীতে পদায়নের মাধ্যমে। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স এর মধ্য দিয়ে জাতির পিতা হত্যার বিচারকে বাধাগ্রস্থ করার মত নেক্কারজনক ঘটনা ঘটানো হয়।
বাঙালি জাতির বুকে চেপে বসে জগদ্দল পাথর। নেমে আসে কাল অমানিশা।

ঠিক এমনি দেশ ও জাতির এক ক্রান্তিলগ্নে ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধুকন্যা দীর্ঘ ছয় বছর নির্বাসন জীবন শেষে ফিরে আসেন এই মাটিতে। এদিন বিকেল সাড়ে ৪টায় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনি ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে তৎকালীন ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। বিমানবন্দরে লাখো মানুষ স্বাগত জানায় পিতৃমাতৃহীন শেখ হাসিনাকে। বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে সারাদেশের গ্রাম, গঞ্জ, শহর, বন্দর হতে লক্ষ লক্ষ মুক্তি পাগল জনতা ছুটে এসেছিল রাজধানী ঢাকায়। “জয় বাংলা” স্লোগানে প্রকম্পিত হয়েছিল ঢাকার আকাশ বাতাস। জনতার কণ্ঠে বজ্রের ন্যায় ঘোষিত হয়েছিল “হাসিনা তোমায় কথা দিলাম-পিতৃ হত্যার বদলা নেব”। “শেখ হাসিনার আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম” ধ্বনিতে মুখরিত হয়েছিল রাজধানী শহর ঢাকা। বস্তুতঃ ১৭ মে ১৯৮১ আরও একবার প্রমানিত হয়েছিল, মুজিব আর বাংলা একাকার। পিতৃ হত্যার বদলা নিতে প্রতিটি মানুষ ছিল এক একটি শেখ মুজিব। লাখো জনতার প্রাণঢালা সম্ভাষণ আর গোটা জাতির ভালবাসা মাথায় নিয়ে প্রিয় স্বদেশের মাটিতে ফিরে এসেছিলেন জনতার আশির্বাদ-ধন্যা শেখ হাসিনা, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিপ্লবী সভাপতি শেখ হাসিনা। সেদিন ঝাঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ প্রকৃতি যেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার বদলা নেওয়ার লক্ষ্যে গর্জে উঠেছিল। অবিরাম মুষল ধারার বর্ষণ যেন ধূয়ে দিয়ে যাচ্ছিলো বাংলার মাটিতে পিতৃ হত্যার জমাট বাঁধা কলঙ্ক দাগ। জনতার আনন্দ অশ্রুতে অবগাহন করে শেরে বাংলা নগরে লাখো জনতার সংবর্ধনার জবাবে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সেদিন বলেছিলেন, “সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির জনক হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই। আমার আর হারাবার কিছুই নেই। পিতা-মাতা, ভাই রাসেল সকলকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি, আমি আপনাদের মাঝেই তাদেরকে ফিরে পেতে চাই। আপনাদের নিয়েই আমি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তা বাস্তবায়ন করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে চাই, বাঙালি জাতির আর্থ-সামাজিক তথা সার্বিক মুক্তি ছিনিয়ে আনতে চাই। বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তির সংগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য এসেছি। আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসাবে, মেয়ে হিসাবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের কর্মী হিসাবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই”।

১৯৮১ সালের ১৪, ১৫, ও ১৬ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে বিপুল আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার, সপরিবারে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার, স্বৈরতন্ত্রের চির অবসান ঘটিয়ে জনগণের হাতে গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সার্বভৌম সংসদীয় পদ্ধতির শাসন ও সরকার প্রতিষ্ঠার বজ্র শপথ নিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তনয়া শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মতৎপরতা, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং গণমানুষের অধিকার আদায়ে সংগ্রামী ইতিহাসের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। দেশে ফেরার পর থেকেই তিনি নিরলসভাবে এদেশের অধিকারবঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরবচ্ছিন্ন ভাবে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। এদেশের অধিকারহারা মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে আন্দোলন সংগ্রাম করার অপরাধে তাঁকে বারবার ঘাতকদের হামলার শিকার ও কারা নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। জনগণের ভালবাসায় অভিষিক্ত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়ে তিনি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষের কল্যাণে যুগান্তকারী অবদান রেখে চলেছেন। দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসন কবলিত জীর্ণ বাংলাদেশকে তিনি একটি উন্নত আধুনিক অসামপ্রদায়িক গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার অহর্নিশ সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। দীর্ঘ ৩৭ বছরের রাজনৈতিক জীবনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বৈরশাসনের অবসান, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বাঙালির ভাত ও ভোটের অধিকার, এদেশের মানুষের জীবনের মান উন্নয়ন করে এক সময়ের মঙ্গা কবলিত বাংলাদেশ আজ সারাবিশ্বে একটি আত্মমর্যাদাশীল ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত হয়েছে। খাদ্যে স্বয়ংস্পূর্ণতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের ও একাত্তরের মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্য সম্পাদন এবং রায় কার্যকর করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সারা বিশ্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। জলে-স্থলে-অন্তরিক্ষে এক অনন্য উচ্চতায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সততা, মেধা, দক্ষতা ও গুণাবলিতে সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম সেরা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আজ স্বীকৃত।

লেখক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপ কমিটির সদস্য

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here