ফের অশান্ত পাহাড় শান্তি ফেরাতে উদ্যোগ নিন

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

পার্বত্য অঞ্চলে অস্ত্রের ঝনঝনানি যেন থামতেই চাইছে না। প্রতিশোধ স্পৃহায় একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে উঠছে থেমে থেমে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে, একটি খুনের রেশ না কাটতেই খুন হচ্ছে আরেকটি। এরই মধ্যে গত সোমবার ফের রক্তাক্ত হলো পাহাড়। এবার রাঙামাটিতে একসঙ্গে খুন হয়েছেন ইউপিডিএফের তিন কর্মী। উপজেলার বাঘাইহাটের করল্যাছড়ি এলাকায় ভোর ৪টার দিকে তাদের হত্যা করা হয় বলে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) বাঘাইছড়ি উপজেলার সংগঠক জুয়েল চাকমা জানিয়েছেন। প্রসঙ্গত, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এবং জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-এমএন লারমার) পাঁচ নেতাকর্মী খুনের এক মাসের মধ্যে সোমবার বাঘাইছড়ি উপজেলায় এই হত্যাকা- ঘটল। গত ৩ মে নানিয়ারচর উপজেলায় নিজ কার্যালয়ে সামনে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেএসএসের (এমএন লারমা) অন্যতম শীর্ষ নেতা শক্তিমান চাকমাকে। এর একদিন পরেই ৪ মে শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়ায় অংশ নিতে যাওয়ার পথে সশস্ত্র হামলায় নিহত হন ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) অন্যতম শীর্ষ নেতা তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা, একই দলের নেতা সুজন চাকমা, সেতুলাল চাকমা ও টনক চাকমা। তাদের বাঙালি গাড়িচালকও ঘটনাচক্রে নিহত হন।

অর্থাৎ এই হত্যাকা- এখন নিজেদের মধ্যেই ঘটছে। একসময় যারা কিছুদিন পর পর পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালিদের ওপর অস্ত্রশস্ত্রসহ চড়াও হতো এখন সেই অস্ত্র তারা নিজেদের মধ্যেই তাক করছে। যাকে গণমাধ্যম বলছে ‘ভ্রাতৃঘাতী লড়াই’। কিন্তু আমরা বলতে চাই, বাংলাদেশ নামক একটি অখ- রাষ্ট্রের যারাই নাগরিক তারা কেউ এই ‘ভ্রাতৃ’ পরিচয়ে আলাদা নাগরিক হতে পারে না। কাজেই এটাকে গণমাধ্যমের ‘ভ্রাতৃঘাতী’ লড়াইও বলা সমীচীন হবে না। যদি গণমাধ্যমের তত্ত্ব অনুযায়ী পাহাড়ি-পাহাড়ি ভাই-ভাই হয়, তাহলে পাহাড়ি জনপদের বাইরে বাকিদের সঙ্গে তাদের কী সম্পর্ক? তারা কি তাদের ’ভাই’ নয়? বরং গণমাধ্যমে তাদের এই লড়াইকে ‘ভ্রাতৃঘাতী’ বলে তাদের বাদবাকি বাংলাদেশি নাগরিকদের থেকে ‘আলাদা’ করে দেওয়ারই প্রচেষ্টা এটা। এটা একটি অখ- রাষ্ট্রের জাতিসত্তার জন্য বিপজ্জনক বলেই মনে করি। কাজেই এটাকে ‘ভ্রাতৃঘাতী’ বলে সমস্যা পাহারের মানুষদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। এটা থামানোর জন্য আমাদের প্রত্যেকের একটা করণীয় বিষয় রয়েছে।

জেএসএস ও ইউপিডিএফ দ্বন্দ্বে ২০১৬ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার নেতাকর্মীর মৃত্যু কতটা ভয়ানক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ ২০১৬ সালে দুই দলের মধ্যে অলিখিত ও অপ্রকাশ্য এক সমঝোতায় এই সশস্ত্র সংঘাত থামাতে পাহাড়িদের মনে একটা স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু এখন সেই একই সংঘাতের বৃত্তে ফিরে আসায় সেখানে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কী কারণে এই সংঘাত এ বিষয়ে নতুন করে গবেষণা করারও কিছু নেই। সব কিছুর মূলেই অর্থনৈতিক। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, স্থানীয় রাজনৈতিক কোন্দলসহ নানা কারণে খুন-খারাবির ঘটনা ঘটছে যা থেমে থেমে গণমাধ্যমে উঠে আসছে। কাজেই এটাকে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া যায় না। কেননা যদি একের পর এক খুন, নৃশংস ঘটনা ঘটতে থাকে তবে তা শুধু বর্তমান নয়, দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যও হবে বিপজ্জনক, যা কিছুতেই উপেক্ষা করা যায় না। এসব অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় পাহাড়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। আমরা মনে করি, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিরসনে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ সমীচীন। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে এভাবে একের পর এক মানুষ হত্যা করা হবে এমনটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা মনে করি, পাহাড়ের এই অশান্তি দূর করতে পাহাড়ি নেতাদের বিশেষ ভূমিকা নিতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসন তথা সরকার ও সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগে পাহাড়ে অচিরেই শান্তি ফিরে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে এমনটিই প্রত্যাশিত।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here