প্রধানমন্ত্রীর চার প্রস্তাব : দায় এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

জি-সেভেন সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে দেওয়া বক্তৃতায় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারো তার চারটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ইতিপূর্বেও বিভিন্ন ফোরামে তিনি যেসব প্রস্তাব ও দাবি জানিয়েছেন, জি-সেভেন সম্মেলনে এটা তারই সমন্বিত রূপরেখা বিশেষ। এতে তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্থায়ী প্রত্যাবর্তনে বাংলাদেশের সঙ্গে হওয়া চুক্তি বাস্তবায়নে যে কোনো মূল্যেই হোক মিয়ানমারকে রাজি করাতে হবে। এ বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন ও মানবাধিকার লংঘনের দায়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গাদের সমস্যার মূল মিয়ানমারেই কাজেই তাদেরকেই এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। রোহিঙ্গাদের অবশ্যই তাদের নিজভূমে ফিরে যেতে হবে, যারা সেখানে শত শত বছর ধরে বসবাস করে আসছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের অধিকার নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি করেছি।

এই প্রক্রিয়া যাতে স্থায়ী ও টেকসই হয় সে জন্য আমরা এতে ইউএনএইচসিআরকে অন্তর্ভুক্ত করেছি।’ এটা ঠিক যে, রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে সদিচ্ছার সর্বোচ্চ নিদর্শন হিসেবে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছিল। যার নেপথ্যে ছিল মূলত চীনের দূতিয়ালি। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা দেখলাম যে, এ সংকট উত্তরণে তৃতীয় পক্ষ বিশেষত, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অন্তর্ভুক্তির যে কোনো বিকল্প হয় না, সেটা আবারো প্রমাণিত হলো। মিয়ানমার ও তার নেত্রী অং সান সু চি বাংলাদেশের সদিচ্ছার কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তাও ইতোমধ্যে পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। কাজেই সংকটের এহেন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবগুলো আরো বেশি ন্যায্যতা পাচ্ছে। সে মোতাবেক মিয়ানমারকে নিঃশর্তভাবে রাখাইন পরামর্শক কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। আর এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে ওই কমিশন মিয়ানমারই প্রথম গঠন করেছিল। কমিশনের সুপারিশগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে প্রশংসিতও হয়েছিল। কিন্তু যেদিন কমিশন মিয়ানমারের নেত্রীর কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়, তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাখাইন প্রদেশে নির্যাতন ও নৃশংসতা শুরু হয়েছিল। শুরুতে সে ঘটনায় একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে দায়ী করা হলেও পরবর্তীতে সেটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, ওটা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীরই বানোয়াট কল্পকাহিনি বিশেষ। যা তারা বরাবরই করে আসছিল।

ফলে শেখ হাসিনা তার তৃতীয় প্রস্তাবে যথার্থই বলেছেন যে, রাখাইনে নির্যাতন ও নিপীড়নের ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব গ্রহণে কাজ করতে হবে। আমরাও তার চতুর্থ প্রস্তাবের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত যে, রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো অমানবিক নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহি ও বিচার নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে যদিও আমরা দেখছি যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র হওয়ায় শুরুতে মিয়ানমারের প্রতি বাংলাদেশ সরকার কতকটা নমনীয়তা প্রদর্শন করলেও রাখাইনে নির্যাতন ও নৃশংসতার জন্য দায়ীদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের দাবি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল থেকে প্রায় শুরু থেকেই উঠেছে। উপায়ান্তর না দেখে এখন বাংলাদেশ সরকারও সে বিচারের দাবির পক্ষে সুর মেলাতে শুরু করেছে এখন।

কাজেই আমরা মনে করি, প্রভাবশালী এই ফোরামে প্রধানমন্ত্রীর চার প্রস্তাব এর বাইরেও আন্তর্জাতিক মহল গুরুত্বের সঙ্গে নেবে। রোহিঙ্গা সমস্যা শুধু বাংলাদেশেরই না, এটা এখন আন্তর্জাতিক সমস্যা হয়ে উঠছে। কাজেই যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিজ দেশেই সম্মানজনকভাবে প্রত্যাবাসন করাতে হবে। যেহেতু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনুরোধেই এবং মানবিকতার নিদর্শন হিসেবে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে কাজেই যতক্ষণ না তাদের সকলের প্রত্যাবাসন হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেই এর যাবতীয় সমস্যার সমাধানে নিয়োজিত থাকতে হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here