প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান: ত্যাগের মানসিকতা অর্জন করুক ছাত্রলীগ

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজহাতে গড়া ছাত্রলীগ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অবিসংবাদিত নাম। কি বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, কি বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, কি ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান বা মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনসহ বহু আন্দোলন-সংগ্রামের কোথায় না ছিল এই ছাত্রসংগঠনটি। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী এ ছাত্র সংগঠনটির এতসব গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় ও পর্ব থাকার পরও এ ছাত্রসংগঠনটির বিভিন্ন সময়ে নানা অপ্রীতিকর ঘটনার জন্য সমালোচনার ও অভিযোগেরও কিন্তু কমতি নেই। তবে এই অভিযোগ গোটা ছাত্রলীগের ওপর দোষারোপ না করে বরং কিছু নেতাকর্মীর আদর্শবিমুখ, অনৈতিক ও সন্ত্রাসী কর্মকা-কেই দায়ী করা সমীচীন।

এসব আদর্শবিচ্যুতিকে সামনে রেখেই গত শনিবার বিকেল পৌনে ৪টায় এ ছাত্রসংগঠনের ২৯তম জাতীয় সম্মেলন শেষ হলো। আর এবারের সম্মেলনের বিশেষ তাৎপর্য হলো এই ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটির নেতৃত্ব ঘোষণা না করেই সম্মেলন শেষ করা। কেননা, বছরটি জাতীয় নির্বাচনের। কাজেই নেতৃত্ব নিয়ে যাতে কোনো অনাকাক্সিক্ষত বিতর্কের সৃষ্টি না হয় এ নিয়ে অত্যন্ত সচেতন আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। বিশেষ করে দলটির সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্মেলন শেষ হওয়ার আগের দিন শুক্রবার বিকেলে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনিই ছাত্রলীগের অভিভাবক। এ জন্য ছাত্রলীগের সম্ভাব্য নতুন কমিটি এখন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেবিলে। সংগঠনের সভাপতি পদে ১১১ জন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ২১২ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এদের মধ্য থেকে নির্বাচন কমিশন যাচাই-বাছাই করে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা শেখ হাসিনার কাছে জমা দিয়েছে। ওই তালিকা থেকেই ঘোষণা করা হবে নতুন শীর্ষ নেতৃত্ব। অর্থাৎ চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঠিক করা হবে যোগ্য নেতৃত্ব।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈরাজ্য সৃষ্টির কোনো ঘটনা বরদাশত করা হবে না। তিনি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আদর্শভিত্তিক রাজনীতি করার এবং দেশের জন্য আত্মত্যাগের মানসিকতা নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। অনেকের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য ছাত্রলীগের রাজনীতিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সময়োপযোগী একটি বার্তা। কেননা, সাম্প্রতিককালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খুনাখুনি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো অনেক ঘটনাই ঘটেছে। যেখানে ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীরও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে, বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও হয়েছে কারো কারো। এখন প্রধানমন্ত্রীর এমন হুঁশিয়ারি ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দেশের জন্য আরো বেশি আত্মত্যাগের মানসিকতা অর্জনে কার্যকর হবে বলে আমাদের বিশ^াস। আর ছাত্রলীগ যদি এ ধরনের নেতিবাচক কর্মকা- থেকে বিরত থাকে তাহলে অন্যরাও আর সাহস করবে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধ্বংসাত্মক তৎপরতায় লিপ্ত হতে। প্রধানমন্ত্রী এবার ছাত্রলীগে ‘মেধাবী’দের অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আর প্রধানমন্ত্রীর এ কথার মধ্য দিয়ে সম্প্রতি কোটা সংস্কার আন্দোলনে ‘মেধাবীদের অগ্রাধিকার’ দাবির প্রতিই যেন সমর্থন ব্যক্ত হলো।

প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা চাই শিক্ষাঙ্গনে শান্তিপূর্ণ ও শিক্ষার পরিবেশ বজায় থাক।’ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘তোমাদের ভবিষ্যৎ কীভাবে আরো ভালো হবে, সে ব্যাপারে আমরা কাজ করছি। নীতিমালা হচ্ছে। তোমাদের কাজ হলো শিক্ষায় মনোনিবেশ করা।’ আমরাও চাই, শিক্ষাঙ্গন এমনভাবে গড়ে উঠুক যা হয়ে উঠবে বিদ্যাচর্চার অনুকূল পীঠস্থান। মারামারি, খুনাখুনি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ভাঙচুরমুক্ত শিক্ষাঙ্গনই এখন সময়ের দাবি। যা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেরও প্রধান সুর। আর এই সুরই প্রতিফলিত হোক ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতাকর্মী ও সমর্থকের মধ্যে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here