নিবিড় পর্যবেক্ষণ চায় এফবিসিসিআই

ব্যাংকঋণের সুদের হার এক অংকে বেঁধে দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন

:: অর্থনৈতিক প্রতিবেদক ::

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকের সুদের হার একক অংকে অব্যাহত রাখা এবং টেকসই করার ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার জন্য আহ্বান জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই)।

পাশাপাশি ব্যাংকঋণের সুদের হার এক অংকে বেঁধে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ায় এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। গতকাল সোমবার ব্যাংকঋণের সুদের হার হ্রাসের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এফবিসিসিআই সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এ আহ্বান জানান। রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআইয়ের সম্মেলনকক্ষে এ সংবাদ সম্মেলন হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘গত ৯ জুন ২০১৮ তারিখে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ওপর এফবিসিসিআই আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্বার্থে ব্যাংকের সুদের হার একক অংকে (ঝরহমষব উরমরঃ) নামিয়ে আনার বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য এফবিসিসিআই থেকে মতামত ব্যক্ত করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ ব্যাংকের সুদের হার একক অংকে নামিয়ে আনে যা ১ জুলাই ২০১৮ তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের নেতৃবৃন্দ, অর্থনীতিবিদ, বাণিজ্যিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সাংবাদিক ভাই ও বোন এবং সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’

সরকারের পক্ষ থেকে কয়েক দফা ছাড় দেয়ার পর গত ২০ জুন এক বৈঠক থেকে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয় বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। ব্যাংক মালিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ১ জুলাই থেকে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ এবং ছয় শতাংশ সুদে তিন মাস মেয়াদি আমানত নেওয়া হবে। সুদহার কমানোর বিষয়ে গত ২৭ জুন বৈঠকে বসেন ব্যাংকের এমডিরা। তারা সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে রাজি আছেন। এ সিদ্ধান্ত নিয়েই ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনটির গতকালের সংবাদ সম্মেলন। এ সময় এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দীন, ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. মুনতাকিম আশরাফ, চেম্বার গ্রুপের পরিচালক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক এ কে এম শাহীদ রেজা, অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপের পরিচালক ড. কাজী এরতেজা হাসান, খন্দকার রুহুল আমিন, ইউসুফ আশরাফ, হাফেজ হারুন ও আবু নাসের উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এফবিসিসিআই সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দীন বলেন, আমদানি-রফতানি কার্যক্রমকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে ঋণের সুদহার হ্রাস বিশ্ব বাণিজ্যের প্রেক্ষাপটে সময়োচিত পদক্ষেপ। তবে এই সুদের হার একক অংকে অব্যাহত রাখা এবং টেকসই করার ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ নজর রাখবে। তিনি বলেন, ১ জুলাই থেকে ব্যাংকের সুদের হার একক অংকে নামানোর কথা থাকলেও এখনও কোনো ব্যাংক এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেননি। ব্যাংকের কোনো সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমাদের জানানো হয়নি। যেহেতু এক তারিখে ব্যাংক বন্ধ ছিল, আশা করছি, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম সম্পন্ন করে দেশের প্রত্যেকটি ব্যাংক সরকারের দেওয়া নির্দেশে সুদের হার একক অংকে নামিয়ে আনবেন।

সুদের হারের বিষয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, গত ৯ জুন ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ওপর প্রতিক্রিয়া জানাতে এফবিসিসিআই আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্বার্থে ব্যাংকের সুদের হার এক অংকে নামিয়ে আনার বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ব্যাংক মালিকদের সমিতি সুদের হার ৯ শতাংশে বেঁধে দিয়েছে, যা ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। যেসব ব্যাংক তাদের সুদের হার এখনো একক অংকে নামিয়ে আনতে পারেনি, তাদের অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সুদের হার কমিয়ে আনার আহ্বান জানায় এফবিসিসিআই।

এফবিসিসিআই সভাপতি লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘বর্তমানে জাতিসংঘের মহাসচিব এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেছেন যে, বিশ্বব্যাংকে ট্রিলিয়নস মার্কিন ডলার বিনিয়োগের অপেক্ষায় পড়ে আছে। এ অর্থ বিনিয়োগের জন্য বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন দেশে সুযোগ খুঁজছে। আমরা জানি বাংলাদেশ ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে একটি ভালো অবস্থানে রয়েছে যা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত। স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে দরকষাকষির মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক থেকে অর্থায়ন গ্রহণের ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যবহার করা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বেসরকারি খাতও এ অর্থ ব্যবহার করার সুযোগ পেলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে এফবিসিসিআই মনে করে।’

বর্তমানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরো দক্ষ এবং বিনিয়োগবান্ধব করতে খেলাপি ঋণ কমানোর প্রচেষ্টা বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরো জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বড় অংকের ঋণগুলো কমিয়ে আনার বিষয়ে অধিকতর জোরালো ও কাঠামোগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত জরুরি। ঋণ খেলাপিদের শাস্তির বিষয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনের এই নেতা বলেন, নন-পারফর্মিং লোন সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে আমরা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব করছি। টাস্কফোর্স নন-পারফর্মিং লোনজনিত সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে তা সমাধানে সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদন প্রণয়ন করবে। এ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জাতীয় স্বার্থে এ সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন ব্যাংক কমিশন গঠনের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াধীন উল্লেখ করে শফিউল ইসলাম বলেন, ‘এফবিসিসিআই তথা, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আশা করে অর্থমন্ত্রী দ্রুত একটি স্বাধীন ব্যাংক কমিশন গঠন করবেন।’
ব্যাংকের সুদের হার টেকশই করা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পরিবেশ নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা এবং ব্যাংক ও আর্থিক থাকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন ব্যাংক কমিশন গঠনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন এফবিসিসিআই সভাপতি।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here