ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বাংলাদেশ এখন মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। কিন্তু এই ভূখ-ে একটা সময় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। সপ্তম শতাব্দীতে কিছু আরব মুসলিম ব্যবসায়ী ও সুফি ধর্ম প্রচারকদের মাধ্যমে এই ভূখ-ে প্রথম ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছিল। দ্বাদশ শতকে মুসলমানরা বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করেন। সেই সুফি-দরবেশদের মধ্যে অন্যতম হলেন হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহঃ)। তিনি ১৪৬৩ সালে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সুদূর ইরাক থেকে বঙ্গদেশে আসেন। হযরত বায়েজিদ বোস্তামীর (রহঃ) সফরসঙ্গীদের মধ্যে শেখ আউয়াল ছিলেন অন্যতম। যিনি পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে ধর্ম প্রচারের জন্য থেকে যান এবং নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে বসবাস শুরু করেন। অনেক বছর পর তার তৃতীয় প্রজন্মের বংশধর শেখ বুরহানুদ্দিন ব্যবসার উদ্দেশে গোপালগঞ্জে যান এবং সেখানকার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেন তার চতুর্থ প্রজন্মের বংশধর শেখ লুৎফর রহমানের সন্তান। আর শেখ হাসিনা হলেন শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম সন্তান। সুতরাং, জন্মগতভাবে শেখ হাসিনা ইসলামি শিক্ষা ও আদর্শে গড়ে উঠেছেন তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ১৯৭৪ সালে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশনের (ওআইসি) সদস্য হন। ১৯৭৫ সালের ২২ মার্চ বঙ্গবন্ধু ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। জাতির পিতার সুযোগ্য উত্তরাধিকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইসলামি মূল্যবোধকে সুসংহত ও আরও বেগবান করার লক্ষ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিধি ও কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

ইসলাম প্রচারে নিবেদিত তাবলিগ জামাতের সদস্যদের স্থান সংকুলানের কথা চিন্তা করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা কাকরাইল মসজিদের জায়গা বাড়িয়েছেন এবং সেখানে ভবন নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন। তাবলিগ জামাতের জন্য টঙ্গী ইজতেমা ময়দান বরাদ্দ দিয়ে সেখানে সরকারিভাবে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেছেন। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ হাসিনা বায়তুল মোকাররম মসজিদকে একসঙ্গে পাঁচ হাজার ছয়শ জন মহিলা ও বিশ হাজার পুরুষ মুসল্লির নামাজ আদায়ের স্থান সম্প্রসারণ করেন। সেই সঙ্গে বায়তুল মোকাররম মসজিদ কমপ্লেক্সকে পাঁচ তলাবিশিষ্ট ইসলামিক ফাউন্ডেশনের লাইব্রেরি করে দিয়েছেন। চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক আন্দরকিল্লা শাহী মসজিদের উন্নয়নের জন্য ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সকল বিভাগ, জেলা, উপজেলায় একটি করে মডেল মসজিদ নির্মাণের জন্য সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা ইসলামি শিক্ষার প্রসার ঘটানোর লক্ষ্যে প্রথম ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। স্বতন্ত্র মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন করেন। সেই সঙ্গে মাদরাসাগুলোতে অনার্স কোর্স চালু করার অনুমতি দিয়েছেন। শেখ হাসিনার সরকারই দীর্ঘ সময় পর কওমি সনদের স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১০১০ জন কওমি মাদরাসা শিক্ষার্থীকে সরকারি চাকরি দিয়েছেন। শেখ হাসিনার সরকার দীর্ঘদিন জরাজীর্ণভাবে পড়ে থাকা মাদরাসা ভবনগুলোর মধ্যে ১০০০টি মাদরাসার একাডেমিক ভবন নির্মাণের জন্য ৭৩৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ এবং তার দ্রুত বাস্তবায়ন করে। কালের আবর্তে হারিয়ে যাওয়া মক্তব শিক্ষার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য শেখ হাসিনার সরকার ইতোমধ্যে ১০১০টি দারুল আরকাম মাদরাসা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো সঠিকভাবে বর্ণনা ও পালন করার লক্ষ্যে দেশে ৭টি ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও গঠন করেছে।

২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত ৩০ কোটি ৪০ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে মঞ্জুর করে ‘ইমাম-মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্ট’ গঠন করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যেটা আগে ছিল না। ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা সারাজীবন মসজিদে খেদমত করেন কিন্তু শেষ বয়সে এসে তারা কিছুই পান না। বরং সবসময় তারা তাদের চাকরি চলে যাওয়ার আতঙ্কে থাকতেন। ধর্মীয় শিক্ষাদানের পাশাপাশি আলেম-ওলামাদের কর্মসংস্থানের কথা চিন্তা করে শেখ হাসিনা মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের ষষ্ঠ পর্যায় ১৫০০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। যার ফলে ছিয়াত্তর হাজার এবং আটান্ন হাজার আলেম-ওলামার কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। যেটি পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য নজিরস্বরূপ।

বাংলাদেশের ফতোয়া নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা মতবিরোধ দেখা দেয়। এমনকি দ্বন্দ্বেরও সৃষ্টি হয়। শেখ হাসিনা সেই মতবিরোধ দূর করার পাশাপাশি সঠিক ফতোয়া প্রস্তুত করার জন্য ৫ জন আলেমকে এমিকাস কিউরি মনোনীত করে তাদের মতামতের ভিত্তিতে ফতোয়া প্রদানের আইনগত অধিকার সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।

শেখ হাসিনা আল-কুরআন নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ, পঠন ও অনুশীলনের জন্য ৭৪ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে আল-কুরআন ডিজিটালাইজেশন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পবিত্র কুরআন মুদ্রণ, প্রচার ও অনুবাদে সহযোগিতা করা, হিফজ, ক্বিরাত প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান, মসজিদ নির্মাণ ও সংস্কারের ক্ষেত্রে কারিগরি ও স্থাপত্যের বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময়সহ আরও কিছু বিষয়ে সৌদি সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে।

শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নির্দেশনায় ২০১০ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি হজনীতি প্রণয়ন করা হয়। ২০১০ সালে আশকোনায় হজক্যাম্পের ডরমিটরিতে দুই কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি লিফট স্থাপন করা হয়। হজযাত্রীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে ২০১১ সালে জেদ্দা হজ টার্মিনালে প্লাজা ভাড়া নেওয়া হয়েছে। যার জন্য ২০১০-১১ সালে বাংলাদেশ হজ ব্যবস্থাপনায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম হয়েছে।

এছাড়াও কন্যাশিশু ও বয়স্ক নারীদের ধর্মীয় শিক্ষাদানের জন্য ছয় হাজার ধর্মপরায়ণ নারীর কর্মসংস্থান করেছেন। ইসলামের দাওয়াতি কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চল্লিশটি মিশনের পাশাপাশি আরও সাতটি মিশন কেন্দ্র স্থাপন করেছেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন, তাই ইসলামি মূল্যবোধের ব্যাপারে তিনি সচেতন। শেখ হাসিনা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন, রোজা রাখেন, পবিত্র হজব্রত পালন করেন। নিজ নিজ ধর্ম পালনের সুরক্ষাসহ সকল প্রতিকূলতা দূর করে ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসারে শেখ হাসিনার অবদানকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ রাখবে বলেই মনে করেন এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ। (চলবে)

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here