দ্বিতীয়বারের মতো কারাপ্রকোষ্ঠেই খালেদার ঈদ!

:: রেজাউল করিম ভূঁইয়া ::

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিন বাতিলে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদকের করা আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। কিন্তু এই মামলায় খালেদা জিয়া জামিন পেলেও এখনই যে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না তা মোটামুটিভাবে নিশ্চিত।

কারণ, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে পেট্রল বোমা হামলায় আটজন হত্যা ও কাভার্ডভ্যান পোড়ানোর পৃথক দুটি মামলাতেও খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আগামি ৭ জুন এই মামলায় শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। কারাগার থেকে মুক্তি পেতে এই মামলাতেও জামিন পেতে হবে খালেদা জিয়াকে। রয়েছে ঢাকায় যুদ্ধাপরাধীদের মদদ দেওয়ার একটি মানহানির এবং ১৫ আগস্ট ভুয়া জন্মদিন পালনের অভিযোগের মামলায় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে কটাক্ষপূর্ণ মন্তব্যের অভিযোগে নড়াইলে করা মামলা।

ফলে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় জামিন পেলেও বাকি মামলাগুলোর জামিন না হওয়া পর্যন্ত কারামুক্তি মিলছে না খালেদা জিয়ার। এরকম বাস্তবতায় রমজান এবং ঈদের আগে খালেদা জিয়ার কারামুক্তি নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন দলের নেতাকর্মীরা। শুধু তাই নয়, রোজা ঈদের পরেও মুক্তি মিলবে কি-না তাও নিশ্চিত হতে পারছেন না তারা। অর্থাৎ, এর মধ্যদিয়ে দ্বিতীয় বারের মতো খালেদা জিয়াকে কারাপ্রকোষ্ঠের ভিতরেই ঈদ উদ্যাপন করতে হচ্ছে।

এর আগে সেনা শাসিত ওয়ান ইলেভেনের সরকারের সময় তাকে (খালেদা জিয়া) ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দুই ঈদই কারাপ্রকোষ্ঠে (বিশেষ কারাগার) ঈদ উদ্যাপন করতে হয়। এভাবেই সরকার চাইছে বিএনপির নেতাকর্মীদের মনোবল চিড়েচ্যাপ্টা করে দিতে। যাতে আর কখনোই দলটি ঘুরে দাঁড়াতে না পারে। আর এ অবস্থার মধ্যদিয়েই চলে আসবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণের জোর প্রস্তুতি। ক্ষমতাসীনরা চাইবেই যে প্রকারেই হোক জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে আটকিয়ে রেখে জয় নিশ্চিত করতে। ফলে খালেদা জিয়া সহসা কারামুক্তি পাচ্ছেন না বলে নেতাকর্মীরা সংশয় প্রকাশ করছেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বুধবার (১৬ মে) খালেদা জিয়াকে জামিন দিয়েছেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে সঙ্গে নিম্ন আদালত কর্তৃক জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা বাতিল চেয়ে খালেদা জিয়া যে আবেদন করেছেন তা বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ।

আপিল বিভাগের এ রায়ের পর বুধবার খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ জানান, এ রায়ের পরও খালেদা জিয়ার মুক্তিতে কিছুটা বাঁধা আছে। কারণ কুমিল্লা, নড়াইল ও ঢাকায় যে মামলাগুলো আছে, সেগুলোতেও জামিন নিতে হবে। এখন আমরা দ্রুত চেষ্টা করবো আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার। তবে খালেদা জিয়ার হাইকোর্টের জামিন আপিল বিভাগ বহাল রাখায় নিম্ন আদালতে অন্যান্য মামলায় মুক্তি পেতে আর বাধা হবে না। আইনী পথে তিনি মুক্তি পেয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন।

আরেক আইনজীবী ও সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবি সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, সরকার তো সব সময় বাধা দেয়। এখন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অন্য যেসব মামলা আছে, আমরা সেগুলোতে দ্রুত হাইকোর্ট থেকে জামিন নেয়ার চেষ্টা করবো। আশা করছি আইনি প্রক্রিয়ায় সব বাধা দূর করা হবে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালত বেগম খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেন। এ মামলায় খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অপর চার আসামিকেও ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। রায় ঘোষণার পরপরই বেগম খালেদা জিয়াকে আদালত থেকে গ্রেফতার করে পুরান ঢাকার সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি কারাগারে আছেন। এরপর গত ১২ মার্চ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে ৪ মাসের অন্তবর্তীকালীন জামিন দেন হাইকোর্ট।

অপরদিকে দুদকের এক আবেদন আমলে নিয়ে গত ১৯ মার্চ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একই সাথে খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টেও দেয়া জামিন আদেশের বিরুদ্ধে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের অনুমতি দেন আদালত। অপরদিকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় হাইকোর্ট খালেদা জিয়াকে ৪ মাসের অন্তবর্তীকালীন জামিন দেওয়ার পর পরই কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপে আটজনকে হত্যার মামলা, ঢাকার তেজগাঁও ও শাহবাগ থানার দুটি মামলায় খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

এদিকে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে আরও ৩৬টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ীতে নাশকতার মামলা, গ্যাটকো দুর্নীতি, নাইকো দুর্নীতি, ভুয়া জন্মদিন পালন-সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এসব মামলা বর্তমান মহাজোট সরকার ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দায়ের করা হয়। এসব মামলার মধ্যে ১১টি উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। কিছু মামলা দায়েরের পর আদালতের নির্দেশে প্রাথমিক তদন্ত চলছে। এ ছাড়া কয়েকটি মামলা চার্জ গঠনের ওপর শুনানির জন্য দিন ধার্য রয়েছে।

বিএনপি অভিযোগ করে আসছে, খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার জন্য মামলা দায়ের করছে সরকার। এ বিষয়ে তৃণমূল নেতা ও দলের কেন্দ্রীয় সদস্য সাবেক এমপি খুররম খান চৌধুরী বলেন, নেত্রীর মুক্তির বিষয়টিই তাদের কাছে এখন মুখ্য বিষয়। তবে সরকার চাইলেও আমাদের নেত্রীকে বেশি দিন আটকে রাখতে পারবে না। কারণ, যে মামলায় সাজা হয়েছে সে মামলায় হাইকোর্টে আপিল করলে তিনি জামিন পাবেন। আর অন্য যেসব মামলা রয়েছে সবগুলোই জামিনযোগ্য মামলা। তাই শিগগিরই জামিন পেয়ে বেরিয়ে আসবেন খালেদা জিয়া।

জানতে চাইলে খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য অত্যন্ত খারাপ। খালেদা জিয়াকে নিয়ে সরকার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে জামিন দিয়েছিল হাইকোর্ট। কিন্তু এর পরই সুপ্রিম কোর্ট জামিন স্থগিত করে রাষ্ট্রপক্ষের দায়ের করা আপিলের শুনানির তারিখ ঘোষণা করেন।

তিনি বলেন, সরকার সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। মুখে বলছে যে, আদালত নিরপেক্ষ হয়ে কাজ করছে। আসলে সরকার আদালতকে নিরপেক্ষ হয়ে কাজ করতে দিচ্ছে না। যে কোনো ভাবেই হোক তারা আদালতকে প্রভাবিত করছে। তারপরও আশা করছি সার্বিক দিক বিবেচনা করে অসুস্থ বেগম জিয়াকে জামিনে মুক্তি দিবে। কারণ তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। সবচেয়ে বড় হচ্ছে, চেয়ারপারসনের ফিজিওথেরাপি করা দরকার জরুরীভিত্তিতে। জেলখানায় ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা নেই।

জানা গেছে, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে পেট্রল বোমা হামলায় আটজন হত্যা ও কাভার্ডভ্যান পোড়ানোর পৃথক দুটি মামলায় হুকুমের আসামি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদনের পরবর্তী শুনানি ৭ জুন নির্ধারণ করেছেন আদালত। একই সঙ্গে এ দুই মামলার আদেশ দেওয়া হবে। গত ২৩ এপ্রিল কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ জেসমিন আরা বেগম উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শোনার পর এ আদেশ দেন। এর আগে গত ১০ এপ্রিল কুমিল্লার ৫ নং আমলি আদালতের বিচারক মুস্তাইন বিল্লাহ এ মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। পরবর্তীতে তার আইনজীবীরা ১৬ এপ্রিল জেলা ও দায়রা জজ আদালতে জামিন আবেদন করলে ২৩ এপ্রিল শুনানির দিন ধার্য করেন।

এর আগে ২০১৫ সালের ২৩ জানুয়ারি চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার হায়দারপুরে একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। এ ঘটনায় খালেদা জিয়াসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয় আদালতে। অপর মামলাটি করা হয় একই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি ভোরে চৌদ্দগ্রামের জগমোহনপুরে বাসে পেট্রোল বোমা হামলায় আটজন হত্যার ঘটনায়। এ মামলায় খালেদা জিয়াসহ ৭৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়।

এছাড়া স্বীকৃত স্বাধীনতাবিরোধীদের গাড়িতে জাতীয় পতকা তুলে দিয়ে খালেদা জিয়া দেশের মানচিত্র এবং জাতীয় পতাকার মানহানি ঘটিয়েছেন মর্মে ২০১৬ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে একটি মামলা করা হয়। এই মামলায় সমন জারির পরও খালেদা জিয়া হাজির না হওয়ায় মহানগর হাকিম নূর নবী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। আদালতের নির্দেশে তেজগাঁও থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এ বি এম মশিউর রহমান গত ২৫ ফেব্রুয়ারি এই মামলায় প্রতিবেদন দাখিল করেন। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বির্তকিত মন্তব্যের মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে নড়াইলের একটি আদালত।

এর আগে ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধা দলের সমাবেশে খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়ে বির্তক আছে বলে মন্তব্য করেন।

এছাড়া ১৫ আগস্ট ‘ভুয়া’ জন্মদিন পালনের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন একটি আদালত। এর আগে ২০১৫ সালের ৩০ আগস্ট খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়।

ভোরের পাতা/ই

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here