দেশে ফেরা নির্যাতিতা নারীরা এখন কী করবেন?

::ভোরের পাতা ডেস্ক::

সৌদি-ফেরত নারী গৃহকর্মীদের অনেকের জীবনই এখন অমানিশায় ঢেকে গেছে। কপালে জুটেছে অপবাদ আর নিন্দা; ভেঙেছে ঘর-সংসার; গ্রামবাসীর অসহনীয় কুৎসা-অপবাদের ভয়ে রাতের অাঁধারেই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে অনেককে। আবার সূর্য ওঠার আগেই গ্রাম থেকে দূরে কোথাও চলে যেতে হচ্ছে কাউকে। এ অবস্থায় তাদের অনেকেই মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব। দেশটিতে কয়েক বছর থেকে বাংলাদেশ সরকার নারী গৃহকর্মী পাঠাচ্ছে। ব্র্যাকের এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত এক বছরে প্রায় এক হাজার নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। আর গত তিন বছরে ফিরেছেন প্রায় পাঁচ হাজার নারী। এদের মধ্যে অনেকের ঘর-সংসারও ভেঙেছে। কারো স্বামী অপবাদ দিয়ে তালাকও দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ স্বামীর মেনে নেওয়া-না-নেওয়ার সিদ্ধান্তের তীরে বসে বাকি জীবনের হিসাব কষছেন।

দেশে ফেরার পর ঘর-সংসার হারানো এবং স্বামী ঘরে তোলেননি—এমন তিন নারীর সঙ্গে কথা হয়। তাদের কথায় উঠে এসেছে তাদের বিদেশ যাওয়ার গল্প, দেশে ফিরে বাঁচার সংগ্রাম ও ঘরসংসার হারানোর যন্ত্রণা।

স্বামীর অপবাদে ঘর ভাঙল

শিমু বেগম (ছদ্মনাম)—দুই মেয়ে ও স্বামী নিয়ে ছিল তার অভাবের সংসার। স্বামী গ্রামে টুকটাক কাজ করতেন। তার আয়ে সংসার ভালোভাবে চলছিল না। ২০১৭ সালের শুরুর দিকে গ্রামের এক দালালের বুদ্ধিতে ৩৫ হাজার টাকা খরচ করে বিদেশ পাড়ি জমান তিনি। বিদেশ যাওয়ার সময় স্বামী বেশ খুশিও ছিলেন। কিন্তু দেশে ফিরে স্বামীর সেই হাসিমাখা মুখ আর দেখতে পাননি তিনি। এমনকি স্বামীর বাড়িতেও উঠতে পারেননি তিনি।

সাজানো-গোছানো যে সংসার রেখে গিয়েছিলেন, তা এখন শুধুই কল্পনা। শুধু বিদেশে গিয়ে নির্যাতিত হয়ে ফেরত আসার কারণে স্বামী তাকে ‘খারাপ মেয়ের’ অপবাদ দিয়েছেন। অপবাদ দিয়েই ক্ষান্ত হননি সেই স্বামী, সঙ্গে ধরিয়ে দিয়েছেন তালাকনামার কাগজটিও।

শিমু বলেন, ‘আমার হাসবেন্ড (স্বামী) আমারে ডিভোর্স দিছে। ওই একই কথা কয়, তুমি বিদেশ গেছো, খারাপ কাজ করেছো। আমি তোমারে নিমু না। এখন দুইটা বাচ্চা নিয়া কী করমু। কই যামু কিচ্ছু কইতে পারি না।’

স্বামী তালাক দেওয়ার খবরটি ইতোমধ্যে পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে গেছে। এ কারণে গ্রামে আর মুখও দেখাতে পারেন না শিমু। বাধ্য হয়ে সাত সকালে উঠে দূরের গ্রামে কাজে যান এবং বিকেলে তার বোনের বাসায় কিছু সময় কাটান। পরে অন্ধকার নেমে এলে রাতে বাবা-মায়ের ঘরে ফেরেন তিনি।

দুই মেয়েকে নিয়ে এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন শিমু। সামনের দিনগুলো তার কীভাবে কাটবে আর স্বামী ও সংসার ফিরে পাবেন কি না, তার বিরুদ্ধে স্বামীর দেওয়া অপবাদ ফিরিয়ে নেওয়া হবে কি না— তাও জানেন না তিনি।

তালাকের পর আবারও স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন শিমু। কিন্তু তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন স্বামী রিটু। বিয়ের সময় শিমুর বাবা-মা যৌতুক বাবদ যে এক লাখ টাকা দিয়েছিলেন, তা-ও ফেরত দেননি তার স্বামী, এমনকি দেনমোহরও দেননি। তবুও দেশের আইনের প্রতি আস্থা রেখে অধিকারটুকু আদায়ে লড়ে যেতে চান তিনি। বাধ্য হয়ে সংসার আর স্বামীকে ফিরে পেতে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন তিনি। রাজশাহী আদালতে মামলা করেছেন।

কিন্তু আইনের আশ্রয় নিয়েও কি তার শিমুর ঘর টিকবে? তিনি কি কখনো তার স্বামীর সাজানো সংসারে আর ফিরতে পারবেন? এমন সব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে শিমুর মনে। তিনি বলেন, ‘ভাব্বাইর পারি নাই স্বামী আমাকে তালাক দেবে।’

দেশে ফেরাই কাল হলো নাজমার

নওগাঁর নাজমা বেগম (ছদ্মনাম)। তার স্বামী পেশায় একজন ট্রাকচালক। দুই মেয়ে তার। এর মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন কিন্তু সংসার টেকেনি। ছোট মেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে ভালো চলছিল সংসার। কিন্তু বছরখানেক ধরে স্বামী সংসারের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। বিষয়টি তখনো আঁচ করতে পারেননি তিনি। সংসারের খরচাপাতি ও মেয়ের পড়ালেখার খরচ বন্ধ করে দেন স্বামী। বাধ্য হয়ে বড় মেয়ের ভাড়া বাসায় ওঠেন তিনি। মেয়ের সংসারে বোঝা হয়ে থাকতে চাননি। বাড়তি কিছু টাকা আয়-রোজগার করে ছোট মেয়েকে পড়াশোনা করাবেন এবং বিয়ে দেবেন—এই স্বপ্ন ছিল তার। আর সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য এক দালালের মাধ্যমে তিন মাস আগে গৃহকর্মী হিসেবে যান সৌদির রিয়াদে। কিন্তু সেখানে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে মাত্র এক মাসের মাথায় দেশে ফিরতে বাধ্য হন তিনি। আর দেশে ফেরাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। দেশে ফিরেই জানতে পারেন যে, তার স্বামী ঝিনাইদহ জেলায় দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তাকে আর সংসারে তুলবেন না।

প্রায় দুই মাস হতে চলেছে সৌদি থেকে ফিরেছেন নাজমা। কিন্তু আজও তার স্বামী তাকে ঘরে তোলেননি। এমনকি তার সঙ্গে সংসার করবেন কি না, তাও স্পষ্ট করে কিছুই বলছেন না। অথচ এই স্বামীই তাকে বিদেশ যাওয়ার সময় উৎসাহ দেখিয়েছেন। বিমানবন্দর পর্যন্ত তাকে এগিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। আর সেই স্বামী এখন তাকে বলছেন, তিনি তাকে কিছুতেই ঘরে তুলবেন না।

স্বামীর এমন আচরণের মুখে নাজমা বেগম তার ছোট মেয়েকে নিয়ে গত দুই মাস থেকে বড় মেয়ের ভাড়া বাসায় উঠেছেন। এরই মধ্যে স্বামীর সঙ্গে তার কথাও হয়েছিল। কথামতো স্বামী প্রতি মাসে তাকে দুই মেয়ের খরচ বাবদ পাঁচ হাজার টাকা দেবেন, কিন্তু আর কোনো খোঁজখবর রাখছেন না। এমনকি স্বামী তার সঙ্গে যোগাযোগও করছেন না।

নাজমার বড় মেয়ে রুবিনা বলেন, ‘বিদেশ যাওয়াই মায়ের বিপদ ডেকে আনল। তিনি দেশে ফেরার পর থেকে বাবা তাকে মেনে নিচ্ছেন না। এমনকি বাড়িতে তুলছেন না। বিষয়টি আমরা দাদা-দাদিকে জানিয়েছি, কিন্তু তারাও কোনো গুরুত্ব দিচ্ছেন না। আমি গার্মেন্টসে চাকরি করে কয় টাকাইবা বেতন পাই। মা ও বোনকে নিয়ে সংসার চালানো কঠিন। বাবা কোনো টাকা-পয়সাও দেয় না। তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই বললেই চলে। ফোন করলেও কোনো সাড়া দেয় না। সবার কাছে একটাই চাওয়া, আমার বাবাকে যেন তারা বোঝান। তিনি যেন ফিরে আসেন, আমার মাকে সংসারে তোলেন।’

২০ দিনেও স্বামীর বাড়িতে আশ্রয় হয়নি

গেল বছরের ১৬ ডিসেম্বর সৌদিতে যান মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার চুন্নুর স্ত্রী জেসি আক্তার (ছদ্মনাম)। সেখানে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন গত ২০ মে। ফেরার ২০ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো স্বামীর ঘরে উঠতে পারেননি তিনি।

অবশ্য দেশে ফেরার পর জেসি পাঁচ দিন ছিলেন শ্বশুরের বাসায়। সেখানে যাওয়ার পর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের তোপের মুখে পড়েন তিনি। তাকে ভাসুররা গালিগালাজ শুরু করেন; তিনি বিদেশ গিয়েও কেন দেশে ফিরলেন? সৌদি গিয়ে তিনি যে নির্যাতিত হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন, সে গল্প আর বলা হয়নি তার।

শুধু এখানেই শেষ নয়, শ্বশুরবাড়ির পর বোনের বাসায় আশ্রয় হলেও স্বামীর ঘরে এখনো আশ্রয় পাননি তিনি। স্বামীকে জানাতে পারেননি তিনি দেশে ফিরেছেন। আর সেই কথাটা স্বামীকে জানানোর পর তার সংসার টিকবে কি না এবং দুই ছোট মেয়েকে নিয়ে কোথায় উঠবেন—সে চিন্তা প্রতিনিয়ত তাড়া করছে তাকে।

জেসি জানান, সৌদিতে যাওয়ার পর বিভিন্ন বাসার মালিকের মাধ্যমে তিনি তিনবার বিক্রি হয়েছিলেন। পাঁচ মাস ছিলেন বিভিন্ন বাসাবাড়িতে। কিন্তু বেতন বাবদ তাকে কোনো টাকা-পয়সা দেওয়া হয়নি। সর্বশেষ দেড় মাসেরও বেশি সময় বাংলাদেশি আশ্রয় কেন্দ্রে থাকার পর গত ২০ মে দেশে ফেরেন তিনি। এরপর পাঁচ দিন ছিলেন শ্বশুরবাড়িতে। এরপর তার আশ্রয় হয় জুরাইনের বোনের বাসায়। গত ২০ দিন থেকে বোনের বাসাতেই আছেন। কিন্তু স্বামীর বাড়িতে তার আর কোনোদিন আশ্রয় হবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান তিনি।

কাঁদতে কাঁদতে জেসি বলেন, ‘সৌদিতে গিয়া অনেক কষ্ট করছি, তারা বেতন দিত না। খাওন চাইল শুধুই মারতো। প্রথমে রিয়াদের এক বাসায় ২০ দিন থাকার সময় আমার নাক-মুখ দিয়া রক্ত পড়তেছিল। কফিলরে কইলাম আমারে দেশে পাঠাও। হেয় কয়, তোমারে তিন লাখ টাকা দিয়া কিইনা আনছি। তোর মউত এইখানেই। দেশে ফেরত আইছি, এটাই ভাগ্য। কিন্তু এখন স্বামীর ঘরে আর ফিরতে পারছি না। শ্বশুরবাড়ির লোকজনও মেনে নিচ্ছে না।’

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here