তিনবিঘা করিডোর হয়ে ছিটমহল দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতায়

:: আবু আফজাল মোহাঃ সালেহ ::

একটি দেশের অভ্যন্তরে অন্য দেশের ভূ-খন্ডকে ছিটমহল বলে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ছিটমল সংখ্যা ১১১ টি আর ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ছিটমহল সংখ্যা ৫১ টি। লালমনিরহাট জেলা সীমান্তে ৩৩ টি আর কুড়িগ্রাম সীমান্তে ১৮ টি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ছিটমহল হচ্ছে দহগ্রাম ও আঙ্গোরপোতা ব্যাপক পরিচিত যা ১৯৮৫ সালে পাটগ্রাম উপজেলার স্বতন্ত্র “দহগ্রাম” ইউনিয়ন হিসাবে মর্যাদা পায়। এর তিন দিকে ভারতের কুচবিহার জেলা, একদিকে তিস্তা নদী- নদীর ওপারেও ভারতীয় ভূ-খন্ড। আর সেস্থানে যেতে কেমন রোমাঞ্চ লাগবে? ভাবতে পারেন! একাধিকবার যাওয়ার অভিজ্ঞতা আর তার ইতিহাস নিয়েই কথা বলব।

দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতায় যেতে হলে প্রায় ১৭৮ মিটার ভারতীয় ভূ-খন্ড পার হয়ে যেতে হয়। দারুন রোমাঞ্চকর নয়? ব্রিটিশ র‍্যাডক্লিফ কমিশনের বিতর্কিত ও উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে সীমান্ত বিভক্তের কারণে ১৯৪৭ সালের পর দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতা মূল ভূ-খন্ডের বাইরে ছিল। তখন বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থান) থেকে দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতায় যেতে হলে একটি “প্যাসেস ডোর” পার হয়ে যেতে হত। এই প্যাসেস ডোর এখনকার “তিনবিঘা করিডোর”। এখন ২৪ ঘন্টা তিনবিঘা করিডোরের প্রবেশ পথ খোলা থাকে। তবে এর প্রেক্ষাপট এত সহজ ছিল না!

১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দারা চুক্তি হলেও ১৯৯২ সালের ২৬ জুন মুল ভূ-খন্ড থেকে বিছিন্ন দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতা যুক্ত হয় দেশের সাথে। ১৯৯২ সালের পর প্রথম দিকে দিনে ছয় ঘন্টা, পরে ১২ ঘন্টা খোলা থাকত এ করিডোর।

বাংলাদেশের অব্যাহত চাপে ১৯১১ সালে ভারত এ করিডর সার্বক্ষণিক ব্যবহারের জন্য খুলে দেয়। তবে এ করিডরের প্রবেশ পথ নিয়ন্ত্রণ করে ভারত। ১৯১১ সালের পূর্বে দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতা জনগণের ইচ্ছামত সবসময় যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় বিশেষ করে চিকিতসার জন্য অবর্নণীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হয়। পরে ১৯ অক্টোবর, ১৯১১ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দশ শয্যার একটি হাসপাতাল ও এ করিডরটি উন্মুক্ত ঘোষণা করেন।

এরকম বহু ত্যাগ তিতিক্ষার ভূ-খন্ডে যাওয়ার পথে ১৭৮ মিটার ভারতীয় ভূ-খন্ড মাড়িয়ে যেতে শিহরণ জাগবেই নিঃসন্দেহে! ভেবে দেখুন তো – একই পথে বাংলাদেশ-ভারতের জনগন একটি পথ ব্যবহার করছে! তিন বিঘাকরিডরের প্রবেশ পথ পেরিয়ে চৌমুহনীতে আপনার সামনে দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের গাড়ী আর মানুষ যাচ্ছে! কথাও বলতে পারেন অন্য দেশের বাসিন্দাদের সাথে। বিনা পাসপোর্ট আর বিনা ভিসায় এ মূহুর্ত স্বরণীয় হয়ে থাকবে!

বাংলাদেশের এক ভূ-খন্ড থেকে অন্য ভূ-খন্ডে (দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতায়) যেতে ১৭৮ বাই ৮৫ মিটার ভারতীয় ভূ-খন্ড ব্যবহার করতে হয়। যার আয়তন প্রায় তিন বিঘার মতো। যা ভারত বাংলাদেশকে ইজারা দেয়। আর একারণে এ প্রবেশ পথের নাম তিনবিঘা করিডর। এ করিডরের চারপাশে লোহার বেষ্টনী দেয়া আছে।

পাটগ্রাম উপজেলার কুচলীবাড়ী ইউনিয়ন ও দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতা ইউনিয়নের সংযোগ স্থাপন করেছে ঐতিহাসিক এ করিডরটি। এখানে বি এস এফ ক্যাম্প ও বিজিবি ক্যাম্প আছে। ইতিহাসের অংশ হতে আসুন না ঐতিহাসিক ও মনোরম তিনবিঘা করিডর মাড়িয়ে দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতায়।

পার্স্ববর্তী পর্যটন স্পটঃ পাটগ্রাম থেকে ১৪ কিমি দুরের বুড়িমারী স্থল বন্দর দেখতে পারেন মূল ভ্রমণের আগে-পরে। এবন্দর দিয়ে ভারত, ভুটান আর নেপালের মালামাল পারাপার হয়। প্রধানত পাথর আমদানী হয় । বাংলাদেশের শেষ প্রান্ত যা ঢাকা থেকে ৪৫৭ কিমি দূরে অবস্থিত এ বন্দরটি দেখতে প্রতিদিনই পর্যটকের ঢল নামে। এছাড়া পাটগ্রাম থেকে প্রায় ৩৫ কিমি দুরের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প ও মনোরম স্পট ডালিয়া পয়েন্টের তিস্তা ব্যারেজও উপভোগ করতে পারেন।

যাতায়াতঃ পাটগ্রাম উপজেলা থেকে এ ছিটমহলের দুরত্ব প্রায় ১০ কিমি। যেতে হবে অটো-রিক্সা বা নিজস্ব ব্যবস্থায়। বাংলাদেশের যে কোন প্রান্ত থেকে বা ঢাকা থেকে এসি/নন এসি বাসে রংপুর হয়ে লালমনিরহাট আসতে হবে। তবে বেশির ভাগ বাস পাটগ্রাম হয়ে বুড়িমারী স্থলবন্দর যায়। হানিফ, শ্যামলী, নাবিল, এস এ পরিবহণ, মানিক, শাহ আলী ইত্যাদি বাসে গাবতলী থেকে ঊঠতে পারেন। ভাড়া পরবে ৮০০-১২০০ টাকা। ঢাকা থেকে ট্রেনেও আসা যায় লালমণি এক্সপ্রেসে। শ্রেণিভেদে ভাড়া ৪২০-১৫১০ টাকা। শুক্রবার বাদে ঢাকার ট্রেন ছাড়ার সময় রাত ১০-১০ টা এবং লালমনিরহাট পৌঁছায় সকাল ০৮-২০ টায়। এরপর ট্রেন বা বাসে পাটগ্রাম যেতে হবে। এ ট্রেনটি শনিবার বাদে প্রতিদিন সকাল ১০-৪০ টায় লালমনিরহাট ছেড়ে যায়।

আবাসন ব্যবস্থাঃ দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতায় আবাসন ব্যবস্থা নেই। থাকা বা খাওয়ার জন্য আপনাকে পাটগ্রাম বা লালমনিরহাট বেছে নিতে হবে। কম খরচে থাকতে পারবেন। অথবা রংপুরে বিভিন্ন দাম-মানের হোটেল পাবেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here