জেলখানায় খালেদার তৃতীয় ঈদ, প্যারোলে মুক্তি দাবি বিএনপির

:: রেজাউল করিম ভূঁইয়া ::

দলের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভাকাঙ্খীর অভাব নেই। রয়েছে ভালবাসাও তার জন্য। কিন্তু এতকিছুর পরও নিজ সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনের সংস্পর্শ থেকে বঞ্চিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে এবার তৃতীয়বারের মতো ঈদ পালন করতে হবে জেল খানায়।

কারণ গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দুর্নীতির মামলায় ৫ বছর কারাদণ্ডের সাজা ভোগ করছেন। এর আগে খালেদা দুটি ঈদ জেলখানায় কাটিয়েছেন। এদিকে ঈদের দিন খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি দাবি করেছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। এছাড়া ঈদের দিন বিএনপির শীর্ষ নেতারা জেলগেটে গিয়ে বেগম জিয়ার সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন বলেও জানা গেছে।

ওয়ান ইলেভেনের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ওই সময় তার বড় ছেলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোও গ্রেফতার হন। ৩৭২ দিন সংসদ ভবন এলাকায় বিশেষ কারাগারে আটক থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মুক্তি পান খালেদা জিয়া। ওই সময় ২০০৭ সালের দুটি ঈদ কারাগারে কেটেছে তার। পরে তারেক রহমান প্যারোলে মুক্তি নিয়ে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। তিনি এখন সেখানেই আছেন। সঙ্গে আছেন স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান।

পরবর্তীতে বিদেশ থাকা অবস্থায় ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জুন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তখন থেকে মা খালেদা জিয়া পুরোপুরি নি:সঙ্গ হয়ে ঈদ পালন করছেন। ২০০৭ সালের পর থেকেই কখনো দুই ছেলেকে একসঙ্গে পাশে পাননি বেগম জিয়া। বরং পুত্র, পুত্রবধূ ও নাতনিদের বিদেশে রেখেই একাকী দলীয় নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের নিয়ে একাকী প্রতিটি ঈদ কাটিয়েছেন তিনি। কিন্তু সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের (২০০৭ ও ২০০৮ সাল) পর জেলখানায় এবারের ঈদ হবে খালেদা জিয়ার তৃতীয় ঈদ।

জানা গেছে, ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাসভবন থেকে গ্রেফতারের পর সোজা নিয়ে যাওয়া হয় সিএমএম আদালতে। আদালতে জামিন না মঞ্জুর হলে তাকে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত সাব জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সাব জেলে থাকার সময় প্রথম পালিত হয় রোজার ঈদ, ২০০৭ সালের ১৪ অক্টোবর।

জানা যায়, ওই দিন সাব জেলের নিয়মিত রুটিনের মতোই জেল জীবনের প্রথম ঈদের দিনটিও শুরু হয়েছিল খালেদা জিয়ার। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে তিনি ফজরের নামাজ আদায় করেন। এরপর নফল ইবাদত করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর সকালে কারা কর্তৃপক্ষের দেওয়া রুটি, সবজি, ডিম ও সেমাই দিয়ে নাস্তা করেন তিনি। তবে, খেয়েছিলেন খুব অল্প পরিমাণ। ওইদিন খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানের স্ত্রী ও তাদের সন্তানরা দেখা করেন। তার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোও তখন জেলে ছিলেন। দুই দফায় পাঁচ জন করে ১০ জন আত্মীয় তার সঙ্গে দেখা করেন।

সাক্ষাতের সময় পরিবারের পক্ষ থেকে তার জন্য ঈদের নতুন কাপড়, উন্নত খাবার ও ফুল নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ২০০৭ সালের ২১ ডিসেম্বর কোরবানির ঈদও ওই সাবজেলেই পালন করেন। ওই সময় কারাগারে ৩৭২ দিন কাটানোর পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তি পান। সাবজেলে কারাবন্দি থাকাকালেই ২০০৮ সালের ১৮ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার মা বেগম তৈয়বা মজুমদার দিনাজপুরে নিজ বাসভবনে মারা যান। তার লাশ হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। পরদিন (১৯ জানুয়ারি) খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি পেয়ে মইনুল রোডের বাসায় গিয়ে মায়ের লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ বিচার শেষে ৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন। রায়ের পর পরই খালেদা জিয়াকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। অদ্যবধি তিনি জেলখানাতেই আছেন।

ঈদ শুভেচ্ছা জানাতে জেলগেটে যাবেন নেতারা : এদিকে দলীয় প্রধান কারাগারে, আর তাই ঈদুল ফিতরের দিনে তাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রীকে দেখতে ও ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে জেলগেটে যাবেন বিএনপি নেতারা। মূলত পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডে কারাগারে বন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতেই সেখানে হাজির হবেন সিনিয়র নেতারা। দলীয়ভাবে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে বিএনপির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

দলীয় সূত্র বলছে, প্রতি বছর খালেদা জিয়া নিজেই ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান করতেন। ঈদের দিন রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তিনি ঈদের শুভেচ্ছা আদান-প্রদান করতেন। তিনি জেলে থাকায় এ বছর আর এই অনুষ্ঠান করা হচ্ছে না।

তবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন এরই মধ্যে দাবি করেছেন, ঈদের আগে খালেদা জিয়াকে যেন প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, এখনও আমরা আশা করি আমাদের ম্যাডাম মুক্তি পাবেন। তাকে নিয়েই ঈদ করতে পারব। তবে আমাদের কপাল খারাপ থাকলে যতটুকু করা সম্ভব করব।

তিনি আরও বলেন, ঈদের দিন নামাজ আদায় করে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত ও দোয়া করার পর আরাফাত রহমান কোকোর মাজার জিয়ারত কওে জেলগেটে চেয়ারপারসনকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে যাবেন সিনিয়র নেতারা। সরাসরি দেখা করা বা না করার বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত না হলেও সিনিয়র নেতারা সবাই যাবেন জেলগেটে।

ভোরের পাতা/ই

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here