কোরীয় উপদ্বীপ (শোল্ডার) এই মিলন অমলিন থাকুক

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

গত শুক্রবারটি ছিল সারা দুনিয়ার মানুষের জন্যই একটি অভাবিত চমকপ্রদ দৃশ্য। কালের ফ্রেমে বন্দি হয়ে গেল কয়েকটি উজ্জ্বল মুহূর্তের ছবি। প্রায় সাত দশকের বৈরিতা পেরিয়ে যাওয়া এই কালের ব্রিজে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া নামক দুটো বিবদমান রাষ্ট্রের নেতা দুই বিপরীতমুখী অবস্থান থেকে যখন এগিয়ে আসছিলেন করমর্দনের উদ্দেশে, সে ছিল সারা দুনিয়াবাসীর জন্যই এক অভাবিত দৃশ্য। এমন উদার হাস্যোজ্জ্বল দুটো মুখ দেখে কে বলবে, এই দেশ দুটো মাত্র কয়েকমাস আগেই তৃতীয় বিশ^যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেয়ার মতো অবস্থানে ছিল? যে উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং-উন ধারাবাহিক একের পর এক পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করে উপদ্বীপটিতে তো বটেই সারা দুনিয়ার জন্যই উত্তেজনা সৃষ্টিতে মদমত্ত ছিলেন, যখন কিনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের মধ্যে একের পর এক উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের ফাঁকে পরমাণু হামলার শঙ্কাও তৈরি করেছিল সেই তিনিই কিনা এদিন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইনের সঙ্গে বৈঠক করে বিশ্ববাসীকে চমকে দিলেন!

চমকে দেওয়া এই ঘটনায় উল্লাস প্রকাশ করেছে দুই কোরিয়ার মানুষ। সন্তোষ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, জাপানসহ অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একে বিশ্বের জন্য এক অভাবনীয় সুখবর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি সুখবরের অপেক্ষায় ছিল। দুই নেতার বৈঠক ও যৌথ ঘোষণার মধ্য দিয়ে সেই অপেক্ষার অবসান হলো। এশিয়ার অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সব কিছু ঠিকঠাক মতো এগোলে এই সমঝোতা এশিয়ার জন্য একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবেও বিবেচিত হবে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে এই প্রথম বিরল এক দৃশ্য দেখল দুনিয়াবাসী যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন তিন পরাশক্তি একই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে দুই কোরীয় নেতাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। আর এই ঘটনা নিয়ে ইতোমধ্যেই চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়ে গেছে যে, এমন একটি বিরল ঘটনা কী করে সম্ভব হলো। কী আছে এর নেপথ্যে? কারই বা ভূমিকায় এমন অভাবিত বৈঠক সম্ভব হলো! নেপথ্যে যাই থাকুক, যিনিই থাকুন এটা যে এই শতাব্দীর সবচেয়ে একটি মহৎ কাজ এতে কোনোই সংশয় নেই।

আমরা দুই কোরীয় নেতা কিম জং উন ও মুন জে-ইনকে তো বটেই যিনি বা যারা এই মিলনের নেপথ্যে আছেন তাদেরও ধন্যবাদ জানাই। যে ঘটনার মধ্য দিয়ে ১৯৫৩ সালে কোরীয় উপদ্বীপ দু’ভাগে বিভক্ত হওয়ার পর এই প্রথম উত্তরের কোনো নেতা দক্ষিণের মাটিতে পা রাখার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে দৃশ্যমান স্বস্তি বয়ে আনল। এই স্বস্তিও যেন চিরস্থায়ী হয়। আমরা দু’নেতার যে হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখেছি তা যেন নিছক রাজনৈতিক বাতাবরণে ঝাপসা না হয়ে যায়। কোনোই সংশয় নেই যে, এ জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইন এর ভূমিকাই অগ্রগণ্য। এ জন্য তিনি তো সাধুবাদ পেতেই পারেন সেইসঙ্গে এই যে কিম জং উন এতে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসলেন সেজন্য তিনিও সকলের সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। মুন জায়ে ইন ২০১৭ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণাতেই তিনি বলেছিলেন যে, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন এমনকি ‘পুনরেকত্রীকরণ’ হবে তার প্রধান লক্ষ্য।

সেটা যদি সম্ভব হয় তাহলে তো কোনো সন্দেহ নেই যে, সেটা সারা দুনিয়ার জন্যই একটা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। যেমন আমরা দেখেছি সাবেক পূর্ব জার্মানি ও পশ্চিম জার্মানির ক্ষেত্রে। যেটার প্রতীক হিসেবে এখানে দুই কোরীয় নেতা দু’দেশের মাটি পানি মিশিয়ে ‘পাইন চারা’ রোপণ করেছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন, আমরা একই মাটি ও পানিই সন্তান। যা বারবার শুধু তাতে অতি স্বার্থবুদ্ধির রাজনৈতিক প্রলেপ দেওয়াতেই নষ্ট হয়ে যায়।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here