কারাগারে বসে অপরাধ সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারে তৎপর সেই বাবুল চিশতী!

হাসপাতালে ছেলের আয়েশী জীবন, নিরাপত্তায় বহিরাগতরা

::সিনিয়র প্রতিবেদক::

দেশের আলোচিক এক ব্যক্তির নাম মাহবুবুল হক চিশতী (বাবুল চিশতী)। একাত্তরে ছিলেন যুদ্ধাপরাধী, তারপর নানাভাবে ম্যানেজ করে হয়েছেন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। অবৈধ ব্যবসা আর ব্যাংক লুটেরাদের মধ্যে তিনি অন্যতম একজন। ফারমার্স ব্যাংকের ১৬০ কোটি টাকা আত্নসাতের অভিযোগে কারাগারের বন্দিশালায় হাঁপিয়ে ওঠেছেন ব্যাংকটির অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী (বাবুল চিশতী)। কেরাণীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার হাসপাতালের কর্ণফুলি-৩ ওয়ার্ডে থেকে অতি গোপনে নিজের হারানো সাম্রাজ্য ফিরে পেতে এবং জামিনে মুক্ত হতে নানা চেষ্টা-তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

আপাতত জালিয়াতির ঘটনায় তাঁর সঙ্গেই আটক একমাত্র ছেলে রাশেদুল হক চিশতীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চোখের চিকিৎসার অজুহাতে ‘আয়েশী জীবন’ নিশ্চিত করে বেশ নির্ভার প্রতারণা ও জালিয়াতিতে পূর্ণ এ ব্যাংক লুটেরা। তবে জামিনে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছেন না তিনি।

নিজের মানসিক শান্তির জন্য নানান জায়গায় লবিইং-তদবির করতে বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে পাঠাচ্ছেন নিজের ‘গুণধর’ শ্যালক ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তফা কামালকে। তবে সরকারি কোন পর্যায় থেকে আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় বিরক্ত হয়েই এবার বিএনপি নেতা ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমেদের দ্বারস্থ হয়েছেন তারা। ক’দিন আগে হাইকোর্টে চিশতীর জামিন আবেদনের পক্ষে শুনানিতে অংশও নিয়েছেন এই নেতা।

সূত্র মতে, শ্যালক মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে ফারমার্স ব্যাংকের নিজের হিসাব থেকে মোটা অঙ্কের টাকা অবৈধ লেনদেনের অভিযোগের তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুলাভাই এই ব্যাংকের দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে মোস্তফা ব্যাংকটির সাজসজ্জার কাজের নামে ভূয়া বিল করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

বাবুল চিশতীকে মুক্ত করতে তার কাছে চিশতীর থাকা নগদ কোটি কোটি টাকা লবিইং-তদবিরে ব্যয় করা হচ্ছে বলেও কানাঘুষা হচ্ছে। তবে এখনো ‘অধরা’ থেকেই এ বিতর্কিত ইউপি চেয়ারম্যান ব্যাংক জালিয়াতির মূল হোতাকে রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে ওঠেছেন। এমনকি জামালপুর ও শেরপুরসহ বিভিন্ন জেলায় একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধী হিসেবে বাবুল চিশতীর ফাঁসি দাবিতে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম ও ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি বেশ কয়েকবার মানববন্ধন করে। পরবর্তীতে চিশতীর অ্যাসাইনমেন্টে তাদেরকেও ম্যানেজ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন আলোচিত এ শ্যালক।

জানা যায়, ফারমার্স ব্যাংকের অডিট কমিটির চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে বাবুল চিশতী গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব থেকে নিজের ও তার পরিবারের সদস্যদের হিসাবে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা স্থানান্তর করে আত্মসাত করেন। এ অভিযোগেই বাবুল চিশতীসহ ছয়জনকে আসামি করে গত ১০ এপ্রিল দুদক ঢাকার গুলশান থানায় মামলা দায়ের করে।

ওই দিনই চিশতী ও তাঁর ছেলে রাশেদ চিশতীসহ চার আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। তবে এই মামলার অন্যতম আসামি তাঁর স্ত্রী রুজী চিশতী হাইকোর্ট থেকে ছয় মাসের আগাম জামিন নিয়েছেন। বাবা-ছেলে কয়েক মাস একসঙ্গে কেরাণীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকলেও সপ্তাহ দুয়েক আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ৩০১ নম্বর ওয়ার্ডে আয়েশী জীবন কাটাচ্ছেন ছেলে রাশেদ চিশতী। সেখানে দুইজন কারারক্ষীর পাশাপাশি নিজের ভাড়াটে ক্যাডাররা নিরাপত্তার পাশাপাশি যত্ন-আত্তি করছেন।

গত বুধবার (০৭ জুন) রাতে এ হাসপাতাল গিয়ে দেখা যায়, কক্ষের বিছানা ছেড়ে পেছনের বারান্দায় গদী আঁটা রিভলবিং চেয়ারে বসে তিনটি স্ট্যান্ড ফ্যানের বাতাস খাচ্ছেন আর আয়েশী মুডে সিগারেট ফুঁকছেন রাশেদ চিশতী। সামনা সামনি আরেকটি একই রকম চেয়ারের মাঝখানে দু’টি প্লাস্টিকের মোড়া। সেখানে রাখা এয়ারফ্রেশনার ও কোকের বোতল। ইচ্ছামতো হাতের হ্যান্ডকাপ খুলছেন-লাগাচ্ছেন জুনিয়র চিশতী।
তাকে সেখানে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দিচ্ছেন বহিরাগত সাইফুল ইসলাম সবুজ, হীরণ, বাবুসহ ৪ জন। ৮ শয্যার এই কক্ষে আর কোন রোগী না থাকলেও শয্যাগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছেন এসব লোকজন। তাদের সঙ্গে বসে খোশ গল্প করছেন শফিকসহ আরো দুই কারারক্ষী।

অভিযোগ রয়েছে, এই চারজন চিশতী পুত্রের ভাড়াটে ক্যাডার হিসেবে সার্বক্ষণিক কক্ষে অবস্থান করছেন।
এ বিষয়ে কারারক্ষী শফিকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে আগ বাড়িয়ে বাঁধা দেন সাইফুল ইসলাম ওরফে সবুজ। তিনি দাবি করে বলেন, ‘আমরা স্যারের (রাশেদ চিশতী) কোম্পানির কর্মচারী। স্যারের সেবা-যত্ন করতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই আমরা এখানে আছি।’

সূত্র মতে, ক’দিন আগে রাশেদ চিশতীর জামিনের আবেদন না মঞ্জুর করেছে উচ্চ আদালত। কিন্তু এ বিষয়টি গোপন করে ৬ মাসের আগাম জামিনে থাকা মা রুজী চিশতী সর্বত্রই প্রচার করছেন কারাগার থেকে মুক্ত হয়েই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন রাশেদ। ছোট ভাই’র পাশাপাশি তিনি নিজেও বিভিন্ন জায়গায় দেন-দরবার করে স্বামীকে মুক্ত করতে ব্যর্থ হয়ে রাজধানীর নিকুঞ্জর বাসভবনে অবস্থান করে নতুন নতুন ছক কষছেন। স্বামী-সন্তানের ‘বন্দি’ জীবনের অবসান ঘটাতে না পারছেন কোন উদ্যোগ ফলপ্রসু করতে আবার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকায় বিদেশেও যেতে পারছেন না।
কারা হাসপাতালের বাইরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিশতী’র ছেলের ‘জামাই আদর’ প্রসঙ্গে জানতে কেরাণীগঞ্জস্থ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবিরের সরকারি (০১৭৬৯-৯৭০১১০) নম্বরে একাধিকবার ক্ষুদে বার্তা ও কল দিলেও তিনি সাড়া দেননি।

তবে এ কারাগারের একজন ডেপুটি জেলার নাম প্রকাশে আপত্তি জানিয়ে বলেন, চিশতীর ছেলের চোখের সমস্যার কারণে তাকে ওই হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। তবে ভাড়াটে ক্যাডার দিয়ে পাহাড়া দেয়ার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। খোঁজ খবর নিয়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ঋণ কেলেঙ্কারীর মামলায় কারাগারে থাকা বাবুল চিশতীর উত্থান বিস্ময় জাগানিয়া। একটি সিনেমা হলের সহকারী হিসেবে জীবন শুরু করে রাখি মালের ব্যবসাও করেন। একেক সরকারের সময় একেক জার্সি পড়ে অবৈধ বিভিন্ন ব্যবসার মাধ্যমে অঢেল বিত্ত-বৈভবের মালিক বনে যান। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১৩ সালে ফারমার্স ব্যাংকে মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করে প্রথমে পরিচালক ও পরবর্তীতে অডিট কমিটির চেয়ারম্যান হন। কিন্তু ব্যাংকের টাকা আত্নসাতের অভিযোগে তাকে সব পদই ছাড়তে হয় এবং দুদকের মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যেতে হয়।

সূত্র মতে, বাবুল চিশতীর ঋণ জালিয়াতির শিকার হয়ে অনেকেই নি:স্ব হয়েছেন। একইভাবে প্রতারিত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ময়মনসিংহ মহানগর যুবলীগ সভাপতি মোহাম্মদ শাহীনুর রহমান স্থানীয় দুদকে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই সময় বাবুল চিশতীর গ্রেফতারের দাবিতে দুদক কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে স্থানীয় হাজারো সাধারণ মানুষ।
অভিযোগ রয়েছে, বাবুল চিশতী বরাবরই ক্ষমতার অপব্যবহার করে ময়মনসিংহ মহানগর যুবলীগ ও জামালপুর ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সংবাদকর্মীদেরও মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করেন। আর এসব নির্যাতনে ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করেন তার সঙ্গে ব্যাংক কেলেঙ্কারীতে জড়িত একজন সাবেক আমলা, পরবর্তীতে শীর্ষ ব্যাংক কর্মকর্তা ও একজন শীর্ষ সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা।

অবশ্য দুদকের মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাবরণের পর তাদের কোন তদবির-কৌশলই কাজে আসছে না বাবুল চিশতীর জন্য। ফলে নিজের ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে এবং বিএনপি’র আইনজীবীকে দিয়ে জামিনে বেরিয়ে দুদকের মামলাকে প্রভাবিত করতে কারাগারে বসেই ফন্দিফিকির আঁটছেন চিশতী।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here