একজন মাহাথিরের সাফল্যগাথা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক আরও গভীর হবে

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

এ এক অভূতপূর্ব চমক-জাগানিয়া সাফল্যগাথার গল্প। যা বর্তমান তো বটেই অনাগত আরো যুগ যুগ পেরিয়ে যাবে, তারপরও এ সাফল্যগাথার গল্প ফুরাবে না। বিশ্ব এমনই নেতৃত্বের গুণ পেল ড. মাহাথির বিন মোহাম্মদের মধ্যে। যাঁকে আধুনিক মালয়েশিয়ার প্রধান স্থপতি ও রূপকার হিসেবে গণ্য করা হয়। একজন সুযোগ্য, সাহসী, দূরদর্শী ও যোগ্য নেতৃত্বই যে একটি দেশ ও জাতির ইতিহাস সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে, ড. মাহাথির বিন মোহাম্মদ তারই উদাহরণ। ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর বিপুল জনপ্রিয়তার সঙ্গেই দেশটির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।

এ সময়ে তিনি মালয়েশিয়াকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের জন্য একটি অনুকরণীয় ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন তিনি। এককালের হতদরিদ্র মালয়েশিয়াকে বিশ্বের ১৪তম অর্থনৈতিক শক্তিতে উন্নীত করেছিলেন তিনি। কারো একক নেতৃত্বে একটি অনুন্নত ও পশ্চাৎপদ দেশ যে এতদূর পৌঁছাতে পারে সেক্ষেত্রে তিনি, মাহাথির বিন মোহাম্মদ যে একমেবাদ্বীয়ম্ তা বলাই বাহুল্য। এক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্বের মানুষের মানুষের সামনে তিনি ছিলেন প্রকৃত বাতিঘর, আলোকবর্তিকা। যাদের তিনি দেখিয়েছিলেন আশার আলো। যে মালয়েশিয়ানদের তিনি আত্মনির্ভরশীল জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও উজ্জীবিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেজন্য তৃতীয় বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রপ্রধান যদি তার নিজ দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য কাজ করেন তখন তাকেও তেমন দেশ তাকে এই মাহাথির বিন মোহাম্মদের সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে। যেমন, আজকে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগরি জন্য প্রধানমন্ত্রী অনুরূপ নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন সেজন্য আজ তাকেও এই মাহাথির বিন মোহাম্মদের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন অনেকে। কি কথায়, কি বক্তৃতায়, কি কারো কারো লিখনিতে। সেই মাহাথির বিন মোহাম্মদও এক সময় বিপুল জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও স্বেচ্ছায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছেড়ে দেন তারই সুযোগ্য উত্তরসূরি আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে। কিন্তু এরপর থেকেই মাহাথির বিন মোহাম্মদের রেখে যাওয়া মালয়েশিয়া যেন তার আপন গন্তব্য ভুলতে থাকে।

যে মালয়েশিয়াকে তিনি বিশ্বের ১৪তম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে রেখে যান সেই অর্থনৈতিক শক্তি আর অগ্রসরই হতে পারছিল না। দেশটির জনগণ বুঝল এ সময়ে মাহাথির বিন মোহাম্মদ থাকলে ১, ২, ৩ নাম্বারে উঠতে না পারলেও প্রথম ১০ এ থাকত, এ নিশ্চয়। এরকম অবস্থায় দীর্ঘদিন রাজনীতির বাইরে থাকার পর নতুন করে আবার রাজনীতিতে আসেন তিনি। তাও আবার যেনতেন রাজনীতিতে নয়। এক্ষেত্রে তিনি বিশ্বের অন্যসবের মতো দলকানাও নন। অন্যের গড়া দল বা নিজ দল বারিসান ন্যাসিওনাল (বিএন) এর বাইরে থেকেও যে জনগণের ওপর নিজের একক ব্যক্তিত্বের সম্মোহনের মাধ্যমে ভিন্ন দল থেকে নির্বাচিত হওয়া যায় বিশ্বে তারই প্রথম নজির গড়লেন মাহাথির বিন মোহাম্মদ। সেই নজির হিসেবে বুধবার মালয়েশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয়ে পেয়েছে ৯২ বছর বয়সী মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট।

বৃহস্পতিবার বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়সী নির্বাচিত নেতা হিসেবে শপথ নেন মাহাথির। এর মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়ায় বারিসান ন্যাসিওনাল (বিএন) জোটের ৬১ বছরের শাসনের অবসান হলো। এবারের নির্বাচনে বিরোধী জোটের নেতা হিসেবে সে দলেরই প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে ক্ষমতা থেকে টেনে নামালেন তিনি। ১৯৫৭ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর যে জোট একটানা ৬১ বছর দেশ শাসন করেছে; বলা চলে, সেই জোট পরাজিত হয়েছে ৯২ বছর বয়সী মাহাথির মোহাম্মদের কাছে। আর এর মধ্যদিয়ে তিনিই হয়ে উঠলেন, বিশ্বের কোনো দেশের সবচেয়ে বয়সী নির্বাচিত সরকারপ্রধান। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত পরিশ্রমী ও শৃঙ্খলাপরায়ণ মাহাথির শুধু তার দেশের উন্নয়নই করেননি, দেশটিতে নবজাগরণেরও জন্ম দিয়েছেন। তাই তিনি শুধু আজ মালয়েশিয়াই নয়, বিশ্বের সব অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের জন্য অনুপ্রেরণা। নিছক রাজনৈতিক চাপাবাজি বা গলাবাজিতে নয়, বরং নিতান্ত এক সাধারণ অবস্থা থেকে কীভাবে উন্নয়নের অভীপ্সা ও অনুপ্রেরণা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়, তাই শেখানোর রূপকার ড. মাহাথির বিন মোহাম্মদ।

একসময় যখন বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রায় একই সমান্তরালে ছিল সেই তখন থেকেই দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বের সম্পর্ক। পরে মালয়েশিয়া অনেকদূর এগিয়ে গেলেও পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার সেই বন্ধুত্বের সম্পর্কে হেরফের হয়নি। বরং আরো বহুগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের জনশক্তি কাজ করছে। মাহাথির মোহাম্মদ নিজেও বাংলাদেশের একজন শুভাকাক্সক্ষী। আমরা আশা করি, তার এই নায়কোচিত ফিরে আসার মধ্য দিয়ে উভয় দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো গাঢ়তর হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here