এই মৃত্যুর মিছিলে কারোই কি মাথাব্যথা নেই!

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

একপ্রকার প্রতিযোগিতা করেই যেন তারা এই মৃত্যুর পরোয়ানা ঝুলিয়ে একের পর মানুষ ‘বধ’ করে চলেছে। এরা আর কেউ নয়। পরিবহনের ‘চালক’রূপী ঘাতক। এই ঘাতকদের হাতে আরো একটি জীবন পিষ্ট হলো। এবার রাজধানীতে চলাচলকারী যাত্রীবাহী বাসগুলোর প্রতিযোগিতার বলি হয়েছেন একটি ইংরেজি দৈনিকের বিজ্ঞাপন কর্মকর্তা নাজিম উদ্দিন। ৩৫ বছরের ওই তরুণ মাত্র তিনদিন আগে দ্বিতীয় সন্তানের বাবা হন। রাজধানীর হানিফ ফ্লাইওভারে যাত্রীবাহী দুই বাস কে কার আগে যাবে, সেই প্রতিযোগিতায় বেপরোয়া ছিল। এমনই পরিস্থিতিতে একটি বাস হামলে পড়ে নাজিম উদ্দিনের মোটরসাইকেলে। তৎক্ষণাৎ তিনি ছিটকে পড়ামাত্র আরেকটি বাসের চালক যেন পরম উল্লাসে তার ওপর চাপা দিয়ে চলে যায়। ফলে যা হওয়ার তা-ই হলো। আরো একটি মৃত্যুর ঘটনা লেখা হয়ে গেল এদেশের বেপরোয়া সড়ক দুর্ঘটনার দিনলিপিতে।

মাত্র কিছুদিন আগেই রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দুই বাসের প্রতিযোগিতায় একটি হাত হারিয়ে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব। যা গোটা দেশকেই নাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তাতেও ঘাতকরূপী চালকদের মধ্যে কোনো সংযম নেই। ফলে থেমেও নেই তাদের হাতে ঘটা এই মৃত্যুর মিছিল। ঝরছেই একের পর এক তরতাজা প্রাণ। ওই হানিফ ফ্লাইওভারেই একজন গাড়িচালকের ওপর দিয়ে বাস উঠিয়ে দিয়েছিলেন একটি আন্তঃজেলা বাস কোম্পানির চালক। এই একই ফ্লাইওভারে বাসের ধাক্কায় কমিউনিটি পুলিশের সদস্য আলাউদ্দিন সুমনের পা হাঁটুর নিচ থেকে থেঁতলে গিয়েছিল। পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় যমে-মানুষে টানাটানির শেষে তারও মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে। কিন্তু এসবে কি সরকারের কারো মধ্যে কোনো মাথাব্যথা আছে? বরং সরকারের এক মন্ত্রী এমন ভাষায় কথা বলেন মনে হয় তিনিও যেন এই চালকদের একপ্রকার ছাড় দিতেই এমন কথা বলেন। তিনি আবার পরিবনের মালিক সমিতির নেতাও! জানা যায়, তারা নাকি আবার একেকজন শতশত পরিবহনের ‘মালিক’ও! এখন তারা তো তাদের বাসের চালকদের প্রতি ‘চোরের মায়ের বড় গলা’মতো করবেনই। তখন চালকরা মনে করবেন, এমন দু-চারজনের ওপর দিয়ে বাস উঠিয়ে দিলে কী এমন ক্ষতি। তার ওপর ওয়ালা বাস মালিক তো আছেনই। তার ওপর তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিরাট দানবজাতীয় কিছু! এখন সুমনকে যে বাস চাপা দিয়েছিল, সেই বাসের চালক এখন কারাগারে। যে দুই বাসের প্রতিযোগিতায় নাজিম উদ্দিন নিহত হলেন, উভয় বাসের চালককে আটক করা হয়েছে। এতে কীই বা কার আসে-যায়। একজন রাজীব, নাজিম উদ্দিন, সুমনের পরিবার যে অসহায় অবস্থায় পড়েছে তার দায় বাস মালিক বা চালক কেউ কি নেবে? আপাতত থানায় একটি মামলা হবে। তারপর? সাক্ষীর অভাবে একদিন মামলা খারিজ হয়ে যাবে। শুধু নিহতদের পরিবারের কান্না থামবে না কোনো দিন। নাজিমের নবাগত সন্তানের মতো আরো অনেক সন্তান ফিরে পাবে না তাদের বাবাকে।

জরিপ অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০টি প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে এমন অনেক দুর্ঘটনা ঘটে, যেগুলোকে দুর্ঘটনা না বলে বরং ঠা-া মাথায় ‘হত্যাকা-’ই বলা চলে। রাজীব, সুমন কিংবা সর্বশেষ নাজিম উদ্দিনের ঘটনাকে তো ‘হত্যাকা-’ বলা যেতেই পারে। ফলে এই ঘাতকরূপী চালকদের হাতে মানুষের জীবন একেবারেই নিরাপদ নয়। নিরাপদ তাদের হাত থেকে দেশও যারা এই চালকদের অভিভাবকরূপী নেতা। যারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্বেও সকল দ-মু-ের অধিকারী। যাদের স্বার্থে সামান্য টোকা পড়লেই অচল করে দেওয়া হয় পরিবহন ধর্মঘটের নামে গোটা দেশ। তারাই পরিবহনখাতকে বানিয়েছে টাকা বানানোর হাতিয়ার। আর এটার জন্যই তাদের মনমর্জিমতো নানা বাহারি ‘সিটিং সার্ভিসে’র নামে চালুকরা বাসগুলোকে জনসাধারণ নাম দিয়েছে ‘চিটিং সার্ভিস’। এই ‘চিটিং’ আজ শুধু ‘ভাড়া’ আদায়ের ক্ষেত্রেই নয়, মানুষ হননের ক্ষেত্রেও সব দায় তারা জনসাধারণের ওপর চাপিয়ে আরেক ‘চিটিং’ করে যাচ্ছে। বলছে, দুর্ঘটনায় যাত্রী বা পথচারীদেরও ‘দায়’ আছে। তাদের কাছে ‘দায়’ নেই শুধু চালকদেরই। খোদ দায়িত্বশীল মন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ের কর্তারাই যখন তাদের পরম আশ্রয়স্থল তখন এদের থেকে যাত্রীসাধারণের উদ্ধার পাওয়া যাবে কীভাবে। জনসাধারণের শেষ ভরসা সরকার কি এ নিয়ে কোনো বাস্তব কর্মপরিকল্পনার উদ্যোগ নেবে?

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here