ঈদের আগে তৃণমূলে নির্বাচনী হাওয়ায় সরব আ’লীগ

::উৎপল দাস::

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের পূর্ণ মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি। এর আগে তিন মাসের মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে হিসেবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনো প্রায় মাস ছয় সময় বাকি। তবে নির্বাচনের ঘিরে ঈদের আগে ভোটকে সামনে রেখে সরগরম হয়ে উঠছে পুরো দেশ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি হতে আওয়ামী লীগের নবীন-প্রবীণ ও উচ্চ শিক্ষিত প্রার্থীরা মাঠ-ঘাট চষে বেড়াচ্ছেন। নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচনী শোডাউন দিচ্ছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তৃণমূলে মেলবন্ধন সৃষ্টি করতে ‘উঠান বৈঠক’ করছেন অনেকে। আবার কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আর্কষণে মেহনতি মানুষের সাথে মাটি কাটতেও দ্বিধাবোধ করছেন না। এককথায় বলতে গেলে যেকোনোমূল্যে আগামী নির্বাচনে নৌকার মাঝি হয়ে এমপি হতে চান সবাই। আর দীর্ঘ দিন ধরে সাধারণ মানুষের সাথে দূরত্ব তৈরী হওয়ার নির্বাচন কেন্দ্রিক তা কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছে হাইকমান্ড।

জানা গেছে, বিভিন্ন আসনের বর্তমান ও সাবেক এমপি-মন্ত্রীদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নবীন-প্রবীণ নেতাদের আগাম নির্বাচনী প্রচারণায় সরব হয়ে উঠেছে ‘একাদশ নির্বাচনী’ মাঠ। দলীয় কর্মসূচির পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন নেতারা। কিছু এলাকায় জাতীয় পার্টি ও জাসদের বর্তমান সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি দলের অন্য নেতারাও মাঠে নেমে পড়েছেন। সে সুবাদে তৃণমূলের রাজনীতিতে বইতে শুরু করেছে আগাম নির্বাচনী হাওয়া। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেও আগামী নির্বাচন নিয়ে চলছে নানামুখী আলোচনা। তবে কিছু জেলায় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা থাকলেও প্রচার বা জনসংযোগের চিত্র এখনো সেভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রীরা নিজ এলাকায় দলের সাংগঠনিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করছেন। তাঁদের অনুসারী নেতাকর্মীরাও মাঠে কাজ করছে। তাঁদের পাশাপাশি সক্রিয় হয়েছেন বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী স্থানীয় নেতারাও। নগরের চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে বন্দর-পতেঙ্গায় আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য এম এ লতিফের পাশাপাশি সক্রিয় রয়েছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন। নগরের কোতোয়ালি-বাকলিয়া আসনে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার চৌধুরী মহীবুল হাসান নওফেল বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষের কাছাকাছি যাচ্ছেন। লক্ষ্মীপুর : জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনের বর্তমান এমপি ও তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব লায়ন এম এ আউয়াল প্রকাশ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভোটারদের সহযোগিতা কামনা করছেন। পাশাপাশি জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সফিকুল ইসলাম, রামগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. শাহজাহান ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক এম এ মমিন পাটওয়ারী এলাকায় যোগাযোগ রাখছেন। লক্ষ্মীপুর-২ কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক হারুনুর রশিদ সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিজ নিজ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনের বর্তমান এমপি এ কে এম শাহজাহান কামাল নির্বাচনী এলাকায় নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। এ আসনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকু আগাম নির্বাচনী গণসংযোগ করেছেন।
লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি ও কমলনগর) আসনে বর্তমান এমপি আবদুল্লাহ আল মামুনের পাশাপাশি এ আসনের সংরক্ষিত সাবেক মহিলা এমপি ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলি দলীয় কর্মকাণ্ডে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হকের বিকল্প হিসেবে অন্য কাউকেই আপাতত ভাবছে না স্থানীয় আওয়ামী লীগের কেউ। মহেশখালী-কুতুবদিয়া (কক্সবাজার-২) আসনে আওয়ামী লীগের এমপি আশেক উল্লাহ রফিক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। কক্সবাজার চকরিয়া-পেকুয়া (কক্সবাজার-৪) আসনে আওয়ামী লীগ নেতা ও চকরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আলম, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আহমদ সিআইপি মাঠে রয়েছেন। কুষ্টিয়া-৪ আসনের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী মিজানুর রহমান বিটু। তিনি সারা বছর মানুষের কাছাকাছি থাকেন। তাদের সুখ-দুঃখে পাশে দাড়ান। আগামী নির্বাচনে নৌকার মাঝি হতে তিনিও এলাকাবাসীর সাথে আরো বেশি সখ্যতা গড়ে তোলছেন। নোয়াখালী-১ (চাটখিল-সোনাইমুড়ি) আসনের বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের এইচ এম ইব্রাহিম নিয়মিত এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। নোয়াখালী-২ (সেনবাগ-সোনাইমুড়ি) আসনের বর্তমান এমপি মোরশেদ আলমের পাশাপাশি মাঠে কাজ করছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও তমা গ্রুপের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জামাল উদ্দিন ভূঁইয়া। নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনে গণসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন বর্তমান এমপি মামুনুর রশিদ কিরন। সিলেট-১ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এ কে আব্দুল মোমেন, মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও বদরউদ্দিন আহমদ কামরান আগাম নির্বাচনী প্রচার নিয়ে মাঠে সক্রিয়। সাবেক সংসদ সদস্য খন্দকার আব্দুল মালিকের ছেলে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীরও এলাকায় সভা-সমাবেশ ও সামাজিক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। সিলেট-৩ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী নিয়মিত এলাকায় সভা-সমাবেশ করছেন। সিলেট-৪ (জৈন্তাপুর-গোয়াইনঘাট-কোম্পানীগঞ্জ) আসনে বর্তমান এমপি ইমরান আহমদ, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমদ প্রচারণা চালাচ্ছেন। সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনে জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনে বর্তমান এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী ছাড়াও আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেতে মাঠে নেমেছেন পুলিশের সাবেক মহাপরির্দশক মতিউর রহমান। রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে বর্তমান এমপি আয়েন উদ্দিনের পাশাপাশি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ প্রচারণায় নেমেছেন। রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে বর্তমান এমপি আব্দুল ওদুদ দারা ছাড়াও মনোনয়ন পেতে এরই মধ্যে মাঠে নেমেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনের জন্য বর্তমান এমপি মো. গোলাম রাব্বানী। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস গণসংযোগে নেমে পড়েছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের জন্য বর্তমান এমপি আব্দুল ওদুদ বিশ্বাস, আওয়ামী লীগ নেতা বেনজুর রহমান মাঠে নেমেছেন। নওগাঁ-১ আসনের জন্য জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাধন চন্দ্র মজুমদার, নওগাঁ-২ (পত্নীতলা-ধামইরহাট) আসনে বর্তমান জাতীয় সংসদের হুইপ শহিদুজ্জামান সরকার প্রচার শুরু করেছেন। জয়পুরহাট-১ আসনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সামছুল আলম দুদু, জয়পুরহাট-২ আসনের এমপি ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এরই মধ্যে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে পড়েছেন। সাতক্ষীরা ২ আসনে তরুণ ও ক্লিন ইমেজের প্রার্থী হিসাবে নিজের অবস্থান জানান দিয়েছেন এফবিসিসিআই পরিচালক ও আওয়ামী লীগের শিল্প-বাণিজ্য এবং ধর্ম বিষয়ক উপকমিটির সদস্য, ভোরের পাতা সম্পাদক ড. কাজী এরতেজা হাসান। নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি নিয়মিত এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন এবং সাতক্ষীরার মানুষের যেকোনো সমস্যায় পাশে দাঁড়াচ্ছেন নিয়মিত। আগামী নির্বাচনে সৎ, যোগ্য, মেধাবি এবং ক্লিন ইমেজের তরুণ প্রার্থী হিসাবে নিজের অবস্থান ইতিমধ্যেই সুদৃঢ় করেছেন।

সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনের এমপি জগলুল হায়দার শ্রমিকদের সাথে ঝুড়ি-কোদাল নিয়ে রাস্তাঘাট সংস্কার করছেন। ঝুড়িতে করে মাথায় মাটি বইছেন। জনপ্রিয়তায় এগিয়ে থাকা এমপি জগলুল নিয়মিত ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন এবং নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত করতে কাজ করছেন।

নারায়ণগঞ্জ ৩ আসনে (সোনারগাঁও) পরিচ্ছন্ন ও ক্লিন ইমেজের তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা এ এইচ এম মাসুদ দুলাল দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তৃণমূল আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করতে কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সাধারণ ভোটারদের কাছে পৌঁছে দিতে নিয়মিত উঠান বৈঠকও করছেন।

ঢাকা-৫ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ও বর্তমান এমপি পুত্র মশিউর রহমান মোল্লা সজল প্রতিটি ওয়ার্ডে ‘উঠান বৈঠকে’ প্রতিদিনই জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস ও মাদক প্রতিরোধে সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছেন। কিশোরগঞ্জ-২ আসনে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এলাকাবাসীর কাছে তুলে ধরে সভা-সমাবেশ করে আসছেন প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা কমাণ্ডার বজলুর রহমানের ছেলে ড. জায়েদ মোহাম্মদ হাবিবুল্লা। একাদশ নির্বাচনে তিনিও নৌকার হাল ধরতে চান। ময়মনসিংহে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল, শেরপুরে জেলার তিনটি আসনেই আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে প্রচারণায় নেমেছেন। শেরপুর-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী মাঠপর্যায়ে নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল হক চান আগামীতেও দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী। জামালপুর-১ আসনে সাবেক তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ এমপি, বকশীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুর মোহাম্মদ গণসংযোগ চালাচ্ছেন। জামালপুর-২ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি ফরিদুল হক দুলালকে চ্যালেঞ্জ করে গণসংযোগ ও উঠান বৈঠক করছেন সংরক্ষিত আসনের এমপি মাহজাবিন খালেদ বেবী ও জিয়াউল হক জিয়া। জামালপুর-৪ আসনে গণসংযোগে নেমেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতি সানোয়ার হোসেন বাদশাও। জামালপুর-৫ প্রচারণায় নেমেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট মুহাম্মদ বাকীবিল্লাহ ও ইঞ্জিনিয়ার মোজাফফর হোসেন। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম এনামুল হক শামীম বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে দলকে আরো বেশি সুসংগঠিত করা এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করতে দীর্ঘদিন ধরে মাঠে আছি। রমজান মাসে ইফতারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ও দলের এমপি-মন্ত্রীরা নিজ নিজ এলাকায় যাবো। দলকে আরো বেশি সুসংগঠিত করবো।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here